ঢাকা মঙ্গলবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৯ আশ্বিন ১৪২৬
২৭ °সে


অর্থনীতির উন্নয়নের সঙ্গে মানবিক উন্নয়ন দরকার

অর্থনীতির উন্নয়নের সঙ্গে মানবিক উন্নয়ন দরকার

আমাদের দেশ একটা সময় সব কিছুতেই পিছিয়েছিল; কিন্তু এখন আর এটি বলার সুযোগ নেই। সবক্ষেত্রেই দেশ এখন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। তারপরও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের যেভাবে কাজ করার কথা ছিল, সেভাবে এখনো হয়ে ওঠেনি। এ প্রসঙ্গে আমার গবেষণালব্ধ ‘সক্ষমতা বা কমপিটেন্সি থিউরি’ এর বিষয়টি উল্লেখ করতে পারি। এই থিওরিতে বলা হচ্ছে ‘কোনো একটি দেশ, সমাজ কিংবা মানুষ কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্যদেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে থাকতে পারে। এটি অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয় বরং এটিই স্বাভাবিক। যদি উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরশীলতা কোনো একটি দেশের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তবে তারা যে বিষয়গুলোতে অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে আছে সেগুলো বিশ্লেষণ করে দেখবে। এই ক্ষেত্রে যে দুর্বলতাসমূহ আছে তা চিহ্নিত করবে এবং সেগুলোকে দূর করার কৌশল গ্রহণ করবে। এভাবে এই বিষয়গুলোর উন্নয়ন ঘটিয়ে নিজের দেশের মধ্যে তার অবকাঠামো গড়ে তুলবে। এগুলোর প্রয়োগ ঘটাতে হবে এবং অন্য দেশগুলোর উপর এ ক্ষেত্রগুলোতে নির্ভরশীলতা কমিয়ে ক্রমান্বয়ে একটি দেশ আত্মনির্ভরশীল ও স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। তবে উন্নয়নের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো বা এডাপটেশনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে ও এর ক্রমাগত উন্নয়ন ঘটাতে হবে।’ আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এই থিওরির কিছু বাস্তব উদাহরণ উল্লেখ করা যেতে পারে।

এক সময় মহাকাশে বাংলাদেশের বিন্দুমাত্র আধিপত্য ছিল না। একটা দীর্ঘসময় ধরে আমাদের উন্নত দেশগুলোর উপর এই বিষয়ে নির্ভরশীল থাকতে হয়েছে। ২০১৮ সালের ১১ মে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল দিন। এ দিন দেশের প্রথম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উেক্ষপণ করা হয়। বাংলাদেশ এখন মহাকাশে নিজের স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সক্ষমতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এরফলে পরনির্ভরশীলতা কমেছে। একসময় আমরা খাদ্য উত্পাদনের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিলাম না; কিন্তু এখন খাদ্য উত্পাদনে আমরা নিজেরাই শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণ নই বরং এখন আমরা খাদ্য রপ্তানি করছি। এই সক্ষমতা অর্জনের পিছনে কাজ করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কৌশল। আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলছে, একটি দেশ যখন অন্য একটি দেশের তুলনায় উন্নত হয় তখন উন্নত দেশটির কৌশলই থাকে কীভাবে পিছিয়ে থাকা দেশটির উপর আধিপত্য বিস্তারে অব্যাহত রাখা যায়। এর মাধ্যমে তারা পিছিয়ে পড়া দেশটিকে বিভিন্নক্ষেত্রে তাদের উপর নির্ভরশীল করার কৌশল গ্রহণ করে। তাহলে আমাদের কী করতে হবে? পিছনেই পড়ে থাকতে হবে না কি নিজেদের উন্নয়ন ও অগ্রগতি ঘটিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। অমর্ত্য সেন তাঁর উন্নয়ন ও স্ব-ক্ষমতা বইটিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশে বিষয়টি সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে পদ্মা সেতুর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এক সময় বিশ্ব ব্যাংকের শর্তারোপ ও বিরূপ মনোভাবের কারণে পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়টিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ তাদের আরোপিত কৌশলের কাছে নতি স্বীকার না করে নিজেদের স্বাধীন মনোভাবের প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়। এরফলে পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়টি থেমে থাকেনি বরং বাংলাদেশ নিজেদের অর্থায়নের উপর ভিত্তি করে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে চলেছে। এর অর্থ হচ্ছে উন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্যের উপর নির্ভরশীলতা অনেক সময় প্রচ্ছন্ন পরাধীনতা সৃষ্টি করতে পারে। এখান থেকে বেরিয়ে এসে আমরা এখন স্বাধীনভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশের জায়গাটি তৈরি করতে পারছি এবং এর কৌশলগত দিকগুলোও ধীরে ধীরে সক্রিয় ও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের সক্ষমতা ধীরে ধীরে গড়ে উঠলেও মানবিক উন্নয়নের জায়গাটিতে আমাদের তেমন কোনো অগ্রগতি নেই; কিন্তু আধুনিক অর্থনীতির মতবাদগুলো বলছে মানবিক উন্নয়ন ঘটাতে না পারলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিপন্ন হতে পারে। আমাদের অর্থনীতিতে উন্নয়ন ঘটেছে। এর সঙ্গে মানুষের আয় বেড়েছে; কিন্তু এরমধ্যেও দুর্নীতি হচ্ছে। তার প্রভাব বিরূপভাবে সারা দেশে পড়ছে।

অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরি হলেও মানুষ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছে। দুর্নীতি এমনভাবে বিস্তার লাভ করছে যে, মানুষ এটাকে তার অধিকার বলে মানতে শুরু করেছে; কিন্তু কেন এমনটা হচ্ছে? এটা নিয়ে মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিজ্ঞানীদের গবেষণার অনেক ফলাফল ও উপাদান থাকলেও তা মানুষের ওপর প্রয়োগের কোনো কৌশল কিংবা নীতি নেই। মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিজ্ঞানীরা মনে করছেন- দুর্নীতির পিছনে কাজ করছে মানুষের অতিরিক্ত লোভ। এই লোভ অন্যকে পরাধীন করে নিজের উন্নয়ন ঘটানো। যার ফলে সমাজের উঁচুস্তরের মানুষের জীবনযাত্রার মান ঠিক থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। আবার মানুষ ভাবছে টাকার সঙ্গে ক্ষমতার একটা যোগসূত্র আছে।

একজন রাজনীতিবিদের কাছে সত্ ও নীতিবান মানুষের পরিবর্তে দুর্নীতিবাজ মানুষরা অনেক টাকার মালিক হবার কারণে বেশি মূল্যায়িত হচ্ছে। এভাবে রাজনীতিবিদদের কাছাকাছি এসে এক সময় দুর্নীতিবাজরা রাজনীতিবিদদের পিছনে ফেলে রাজনীতিতে তাদের প্রভাব বিস্তার করছে। এই কৌশল অবলম্বন করে তারা রাজনীতিকে অর্থ উপার্জনের কৌশল হিসেবে গ্রহণ করছে। রাজনীতিতে অর্থের প্রভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এই মানুষগুলো নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে আছে বলে ভেবে নিচ্ছে। এই কল্পিত ভাবনা যখন বাস্তব ভাবনায় রূপান্তরিত হচ্ছে তখন স্বয়ং তাদের কিংবা তাদের অর্থে প্রতিপালিত দুর্বৃত্তদের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। পুরো বিষয়গুলোকে ভোগবাদী দর্শনের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সত্ মানুষকে সরিয়ে সুবিধাবাদী মানুষকে বসানো হচ্ছে। সত্ মানুষ থাকলে চোর-বাটপার সবার সমস্যা হয়। অশান্তি আর অশান্তি। সুবিধাবাদী মানুষ থাকলে আর কোনো ভয় নাই। সব অনিয়ম নিয়ম হয়ে যায়। শান্তি আর শান্তি। আমরা দুষ্টের দমন না করে শিষ্টের দমন করছি। ভালো কাজের জন্য তিরস্কার করছি। তাহলে কীভাবে দেশ দুর্নীতিমুক্ত হবে। সব চোর-বাটপাররা সুরক্ষিত আর সত্ ও যোগ্য মানুষ নির্বাসিত। এমনটা হলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়তো হবে, কিন্তু সেটা দীর্ঘ সময় ধরে রাখা যাবে না। এ জন্য দরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানবিক উন্নয়নের সক্ষমতা অর্জন। মানবিক উন্নয়নে বিদেশিদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির সুযোগ নেই যেটা অর্থনৈতিক উন্নয়নে আছে। তাহলে যে বিষয়টা আমাদের হাতে সেটার সক্ষমতা আমরা কেন অর্জন করতে পারবো না। আমাদের এজন্য মানবিক উন্নয়নের উপাদানগুলো প্রথমে চিহ্নিত করতে হবে। এরপর এই বিষয়গুলোতে মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করতে হবে। এগুলোর লালন, পালন ও যত্ন করে এক সময় মানবিক মূল্যবোধের সংস্কৃতিকে সার্বজনীন সংস্কৃতির রূপ দিতে হবে। তবেই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে।

n লেখক :অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও

প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন