ঢাকা মঙ্গলবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৯ আশ্বিন ১৪২৬
২৭ °সে


উচ্চশিক্ষা :কি পড়ছি, কি শিখছি

উচ্চশিক্ষা :কি পড়ছি, কি শিখছি

‘গণচীনে মাও সে তুং এর অবদান বর্ণনা কর’ অনার্স চতুর্থ বর্ষের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ফাইনাল পরীক্ষার একটি প্রশ্ন। প্রশ্নের মান ১০ নম্বর। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষে নয়টি বিষয় পড়ানো হয়। উপরোক্ত প্রশ্নটি ফাইনাল পরীক্ষায় এসেছে দুটি বিষয়ে। বলা যেতে পারে, ঘটনাটি দুর্ভাগ্যক্রমে ঘটে গেছে। ২০১৮ সালের তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় ‘ম্যাক্সওয়েবারের আমলাতন্ত্র’ প্রশ্নটি যথাক্রমে ‘রাজনৈতিক সমাজতত্ত্ব’ ও ‘বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র’ বিষয়ে করা হয়েছে। আবার ‘রাজনৈতিক সমাজতত্ত্ব’ ও ‘রাজনীতি অধ্যয়ন পদ্ধতি’ দুটি বিষয়ে করা হয়েছে ‘এলিট আবর্তন তত্ত্ব’ প্রশ্নটি। একই বছর ‘বিশ্বায়নের প্রভাব ও শান্তি রক্ষায় জাতিসংঘের ভূমিকা’ এই দুটি প্রশ্ন এসেছে ‘শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিচিতি’ এই দুটি বিষয়ে। এই বিভাগের প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় ‘সমাজকর্ম পরিচিতি ও অর্থনীতির মূলনীতি’ দুটি বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে ‘পুঁজিবাদ’ নিয়ে। ‘আমলাতন্ত্র’ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে ‘লোক প্রশাসন পরিচিতি ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান’ দুটি বিষয়ে। এছাড়া বিশ্বায়নের প্রশ্নটি করা হয়েছে আরো দুটি বিষয়ে। একই চিত্র দ্বিতীয় বর্ষেও। ‘কার্ল মার্ক্সের শ্রেণি তত্ত্ব’ ৩য় বর্ষের ‘রাজনৈতিক সমাজতত্ত্ব’ ও চতুর্থ বর্ষের ‘আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা’ বিষয়ে করা হয়েছে। ‘বিশ্বায়নের প্রভাব’ প্রশ্নটি প্রথম বর্ষের ‘সমাজ বিজ্ঞান পরিচিতি’, চতুর্থ বর্ষের ‘বিশ্বায়ন, রাজনৈতিক তত্ত্ব’, তৃতীয় বর্ষের ‘শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি’ বিষয়গুলোতে করা হয়েছে। ‘শান্তি রক্ষায় জাতিসংঘের ভূমিকা’ প্রশ্নটি চতুর্থ বর্ষের ‘বৈদেশিক সম্পর্ক’, তৃতীয় বর্ষের ‘আন্তর্জাতিক রাজনীতি, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন’, দ্বিতীয় বর্ষের ‘নারী ও রাজনীতি’, প্রথম বর্ষের ‘রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান’ বিষয়ে করা হয়েছে। এমনি করে জাতীয়তাবাদ, আমলাতন্ত্র, ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ, এলিট শ্রেণি, বিশ্বায়ন, জাতিসংঘ, ওআইসি, পুঁজিবাদ, নারী উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার; এইগুলোর উপরে একি প্রশ্ন প্রথম বর্ষ থেকে শেষ বর্ষ পর্যন্ত করা হয়। অবাক করার আরো বিষয় আছে। ‘বিশ্বায়ন’ প্রশ্নটি তৃতীয় বর্ষের ‘শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন‘ ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮ সালসমূহে ফাইনাল পরীক্ষায় আসছে। এমনি চিত্র অন্যান্য প্রশ্নগুলোর ক্ষেত্রেও। মানে শিক্ষার্থী অনেকটাই নিশ্চিত থাকে তার আগামী পরীক্ষায় কোন কোন প্রশ্নগুলো আসবে। এছাড়া একজন শিক্ষার্থী বিগত সালের প্রশ্ন আসা ১০টি প্রশ্ন পড়েই তার একটি বইয়ের সিলেবাস শেষ করতে পারছে! এবার আসা যাক শিক্ষার্থী প্রশ্নগুলোর উত্তর করছে কিভাবে সেই বিষয়ে। এই বিষয়টা বেশ মজার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। এখানে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার জন্য উত্তর পুরোপুরি পড়তে বা মুখস্থ করতে হয় না। তারা মুখস্থ করে কোটেশন বা ছোট ছোট শিরোনামগুলো। উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা ক্লিয়ার করা যাক। ধরুন প্রশ্ন আসলো, ‘বাংলাদেশের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা আলোচনা কর’। শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করবে, ‘অর্থনীতির ক্ষেত্রে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, নারী উন্নয়নে, অবকাঠামো নির্মাণে, কৃষি উন্নয়নে’। এমন ১০-১২টি ছোট শিরোনাম মুখস্থ করবে। তারপর শিরোনামের অনুসারে আলাদা আলাদা লিখবে, ‘এই খাতে বিশ্বব্যাংকের অবদান অস্বীকার করার মতো নয়, ঐ খাত টিকিয়ে রেখেছে বিশ্বব্যাংক ইত্যাদি ইত্যাদি’। এমনিভাবে বিশ্বব্যাংক, ওআইসি, জাতিসংঘ, এডিবি, বিশ্বায়নের অবদানসমূহ লেখা হয়। দুঃখের বিষয় হলো, অনেক শিক্ষার্থীরই জানা নেই বিশ্বব্যাংক কোন খাতে, কবে, কি শর্তে, কত টাকা বাংলাদেশকে অনুদান বা ঋণ প্রদান করেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা ইনিয়েবিনিয়ে লিখে পৃষ্ঠা সংখ্যা বৃদ্ধি করে। ফলাফলের দিন গর্ব করে ঘরে তুলে কাঙ্ক্ষিত ফার্স্ট ক্লাস। এর দায় কোনোক্রমেই শিক্ষার্থীদের দেওয়া যায় না। কারণ শিক্ষাব্যবস্থাটাই গড়ে উঠেছে এভাবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা ও সমাজ বিজ্ঞান অনুষদে যে বিষয়গুলোর উপর পড়ানো হয়, তা সবগুলোই একি রকম। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়ানো হয় ‘সমাজ বিজ্ঞান পরিচিতি, সামাজিক তত্ত্ব বাংলাদেশের সমাজ বিজ্ঞান‘ এসব বিষয়। আবার সমাজ বিজ্ঞানে পড়ানো হয় ‘রাষ্ট্রবিজ্ঞান পরিচিতি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়। এমনি করে সমাজ বিজ্ঞান , কলা অনুষদে দুই একটা কমন ব্যতিত সবাইকে একই বিষয় পড়তে হচ্ছে। প্রশ্নের উদাহরণ হিসেবে কেবল রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ের কথা বললাম। এমন চিত্র জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি বিভাগে। সকল বিভাগের শিক্ষার্থীরা এভাবেই করছে অধ্যয়ন। এভাবে অধ্যয়ন করে দ্রুত পাস করে বের হচ্ছে। আর নাম লিখাচ্ছে বেকারের খাতায়। কিন্তু অনার্স শেষ করে একজন শিক্ষার্থী একটি কাগজে সার্টিফিকেট ব্যতিত আর কিছুই পায় না। পায় না বেকারত্ব গোছানোর মতো কোনো কর্মমুখী শিক্ষা। এভাবেই উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার শ্লোগানে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে দেশ।

n লেখক : শিক্ষার্থী, ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, কুমিল্লা।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন