ঢাকা শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬
২৮ °সে


বিভ্রান্ত হওয়া না হওয়া

বিভ্রান্ত হওয়া না হওয়া

যতই আমার বয়স বাড়ছে আমি ততই নিজের ভিতর একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। যখন বয়স কম ছিল তখন দুনিয়ার সব বিষয়েই আমার নিজস্ব মত ছিল। কোন্টা ভুল আর কোন্টা শুদ্ধ আমি সেটা একেবারে নিশ্চিতভাবে জানতাম এবং নিজের ধারণাটাকে একেবারে গলার রগ ফুলিয়ে ঘোষণা করে অন্যদের জানিয়ে দিতাম। এখন যখন বয়স হয়েছে তখন আবিষ্কার করছি কোনো বিষয়েই আর পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারি না। কোনো কিছুর পক্ষে যখন কেউ কিছু বলে তখন মনে হয় এটাই ঠিক আবার যখন বিপক্ষে কেউ যুক্তি দেয় তখন নিজের মাথা চুলকাই এবং মনে হয় নাহ্ এটাই মনে হচ্ছে ঠিক! কোন্টা ঠিক আর কোন্টা বেঠিক সেটা নিয়ে নিজের ভেতরেই তালগোল পাকিয়ে যায়। কয়েকটা উদাহরণ দিলে মনে হয় ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার হবে।

যেমন ধরা যাক গণতন্ত্র নামের বিষয়টা। সারা জীবন শুনে এসেছি, জেনে এসেছি এবং বিশ্বাস করে এসেছি যে, দেশ চালাতে হয় গণতন্ত্র দিয়ে। আমাদের পাশেই বিশাল ভারতবর্ষ কী চমত্কার গণতান্ত্রিকভাবে বছরের পর বছর চলে আসছে। সারা পৃথিবীর মাঝে সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র। তার পাশেই আমরা, বাংলাদেশ হওয়ার পরও জোড়াতালি দিয়ে চলছে। মাঝখানে বড় একটা সময় মিলিটারী শাসন করে দেশের বারোটা বাজিয়ে দিল। শেষ পর্যন্ত যখন গণতন্ত্র এসেছে তখন একটা নড়বড়ে গণতন্ত্র। এখনো নির্বাচন নিয়ে কতো রকম অভিযোগ। যখন ভারতবর্ষের গণতন্ত্র নিয়ে তাদের হিংসা করে এসেছি তখন হঠাত্ করে নরেন্দ্র মোদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলেন। সন্ত্রাসী হিসেবে আমেরিকায় যে মানুষটি নিষিদ্ধ ছিলেন হঠাত্ করে আমেরিকার প্রেসিডেন্টরা সেই নিষিদ্ধ মানুষের সঙ্গে গলাগলি করার জন্য ছোটাছুটি করতে শুরু করে দিলেন। ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতবর্ষে এখন গরুর সম্মান রক্ষা করার জন্য নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে ফেলা প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আমি ভাবলাম, ঠিক আছে ভুলেভালে একবার এই দুর্ঘটনা ঘটে গেছে পরের নির্বাচনে ভারতবর্ষের মানুষ নিজেদের ভুল শুধরে নেবে, ঠিক মানুষকে দেশের প্রধানমন্ত্রী বানাবে। কিসের কী? আমি অবাক হয়ে দেখলাম এবারে নরেন্দ্র মোদি আগের থেকে বেশি ভোট পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এবারে নির্বাচনের আসল শক্তিই হলো ধর্মীয় উন্মাদনা। শুধু তাই নয়, এবারে নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ- প্রশাসনকে পুরোপুরি ব্যবহার এবং টাকার খেলা। গণতান্ত্রিক একটা পদ্ধতিতে একটা দেশ চোখের সামনে এভাবে পাল্টে যাচ্ছে দেখতে কেমন লাগে? দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে কি জার্মানী এভাবে আস্তে আস্তে নাত্সী জার্মানী হয়ে গিয়েছিল? এতোদিন বলে এসেছি, গণতন্ত্র খুবই ভালো। আজকাল বলি, গণতন্ত্র খুবই ভালো। কিন্তু তারপর থেমে গিয়ে মাথা চুলকাই বাক্যটা কীভাবে শেষ করব বুঝতে পারি না।

সারা পৃথিবীর গণতন্ত্রের মোড়ল হচ্ছে আমেরিকা। মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র সাপ্লাই করতে গিয়ে সেখানে কী অবস্থা করেছে সেটা আমরা চোখের সামনে দেখছি। খবরে দেখলাম বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বিশুদ্ধ এবং পরিশীলিত করার জন্য তারা একটা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। এই দেশের মার্কিন কূটনীতিকদের সঙ্গে আমার কোনোদিন দেখা হয় না, দেখা হলে জিজ্ঞেস করতাম সৌদি আরবের রাজা-বাদশাহদের সরিয়ে সেখানে গণতন্ত্র ফিরিয়ে নিয়ে আসার ব্যাপারে তাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কী না। পৃথিবীর যাবতীয় সমস্যা সমাধান নিয়ে তাদের নিজস্ব প্রস্তাব থাকে। আমাদের রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান নিয়ে তাদের একজন কংগ্রেসম্যানের প্রস্তাব সবচেয়ে চমকপ্রদ, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশটি দখল করে বাংলাদেশকে দিয়ে দেওয়া। গুরুতর বিষয় নিয়ে হাসাহাসি করা ঠিক না কিন্তু এই প্রস্তাবটি শুনে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গিয়েছিল। এই আমেরিকার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প। যাই হোক ধরে নিই গণতন্ত্র অনেক বড় ব্যাপার, আমার মতো আদার ব্যাপারি এই জাহাজের খবর বুঝবে না। কিন্তু আমাদের সমাজের চারপাশের দৈনন্দিন ঘটনাগুলো নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে। আজকাল খবরের কাগজ মানেই হচ্ছে খুনখারাবির খবর। কিছুদিন হলো খুনের খবরের সঙ্গে শুরু হয়েছে ধর্ষণের খবর। শুধু ধর্ষণ নয়, অনেক সময় গণধর্ষণ (ইস! কি ভয়ংকর একটা শব্দ!) সেখানেই শেষ নয়, ধর্ষণ, গণধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ড। খবরের কাগজ পড়তে হলে নয়মাসের বাচ্চা থেকে শতবর্ষী বৃদ্ধাকে ধর্ষণের খবর পড়তে হয়। আজকাল ধর্ষক হিসেবে শিক্ষকরাও এগিয়ে এসেছেন, বিশেষ করে মাদ্রাসার শিক্ষক। আমাদের দেশে স্কুল-কলেজে ছেলেমেয়েদের ঠিক করে বড়ো করি না, পরিবার ছেলেমেয়েদের ঠিক করে মানুষ করতে পারে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও অনেক কিছু গোলমাল করে, বিচার করা যায় না, শুধু তাই নয়, বড়ো বড়ো মাস্তান এবং গড ফাদাররা নয়ন বন্ডদের পুষে পুষে বড়ো করে, রাজনীতির মানুষরা এদের ব্যবহার করে, কাজেই আমাদের সমস্যার শেষ নেই। খুন, ধর্ষণ যদি ভয়ংকর রোগ হয়ে থাকে তাহলে আমরা শুধু রোগাক্রান্তদের চিকিত্সা করার চেষ্টা করছি কিন্তু দক্ষ দেশগুলো নিশ্চয়ই এই রোগটি ছড়িয়ে পড়তেই দিচ্ছে না।

আমাদের দেশ এই দেশের স্টাইলে সমস্যাটা সমাধানের চেষ্টা করছে। সেই সমাধানের চেষ্টা করার প্রক্রিয়াটার নাম ক্রসফায়ার। ক্রসফায়ার একটা ইংরেজি শব্দ এবং ডিকশনারিতে নিশ্চয়ই তার আসল অর্থ দেওয়া আছে। আমাদের দেশে ক্রসফায়ারের অর্থ হচ্ছে অপরাধী সন্দেহে বিনাবিচারে মেরে ফেলা, এই পদ্ধতি কাজ করে কী না আমি জানি না। শুনেছি কোনো কোনো দেশে এটা কাজ করেছে এবং সেইসব দেশ এখন খুবই আইন মেনে চলা শান্তিপূর্ণ দেশ। বরং আমরা দেখতে পাচ্ছি ফিলিপাইনে এটা কাজ করছে না। সেখানে সাত হাজার থেকে বেশি মানুষকে মেরে ফেলেছে কিন্তু তাদের মাদকের সমস্যা মিটেছে সে রকম নিশানা নেই। আমাদের দেশে ক্রসফায়ার যথেষ্ট জনপ্রিয় পদ্ধতি বলে মনে হয়। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোও আজকাল বেশি উচ্চবাচ্য করে না। বিভ্রান্ত হয়ে যাই।

সবগুলো এক ধরনের জটিল উদাহরণ। আরো মাটির কাছাকাছি উদাহরণ দেওয়া যাক। প্রথম যখন শুনেছি গ্যাসের দাম শতকরা তিরিশভাগ বেড়ে গেছে আমি রীতিমতো আঁতকে উঠেছি, এক ধাক্কায় ত্রিশ শতাংশ? সর্বনাশ। বিষয়টা নিয়ে অনেকদিন পর দেশে হরতাল হলো মোটামুটি উত্তপ্ত পরিবেশ। তখন হঠাত্ একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ জানালেন- দেশের মাত্র বিশ শতাংশ মানুষ সরাসরি রান্নাঘরে গ্যাস ব্যবহার করার সুযোগ পায়। আশিভাগ মানুষের কাছে গ্যাস পৌঁছায়নি। তাহলে হঠাত্ করে পুরো বিষয়টাকে আমি আর একটা জাতীয় ব্যাপার ভাবতে পারছি না। দেশের শতকরা বিশ ভাগ সুবিধাভোগী মানুষের জীবনযাত্রার জন্য আমার কী দুর্ভাবনা করার প্রয়োজন আছে? (আমি নিজে সেই সৌভাগ্যবান বিশ ভাগের একজন) বাম রাজনৈতিক দল আর সরকার মিলে দেন-দরবার করে কোনো একটা সমাধানে পৌঁছে যাক, আমি দর্শক হয়ে ব্যাপারটা দেখি, বোঝার চেষ্টা করি।

আরো মাটির কাছাকাছি উদাহরণ দিই। যখন ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেয়া হলো তখন আমার মনে হলো কাজটা ঠিকই হয়েছে। ঢাকা এত বড়ো একটা মেট্রোপলিটান শহর, তাকে একটা আধুনিক শহর হিসেবে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে হলে আসলেই তো বড়ো বড়ো রাস্তা থেকে রিকশা তুলে দিতে হবে। তারপর যখন দেখলাম রিকশাওয়ালারা সব পথে নেমে এসেছে তাদের রুটি-রুজি বন্ধ হওয়ার প্রতিবাদ করার জন্য, তখন আমার মনে হলো, সত্যিই তো রিকশা চালানোর মতো কঠিন আর অমানবিক ব্যাপার কী হতে পারে? সেই কষ্ট করে বেঁচে থাকা মানুষের আয়-উপার্জন কেন আমরা বন্ধ করতে চাইছি? তাদের জন্য সত্যিকার আয়-উপার্জনের ব্যবস্থা না করে হঠাত্ করে রিকশা বন্ধ করে দেওয়ার আমাদের কী অধিকার আছে? তাদের কি ঘর-সংসার নেই? স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নেই? তাদের ছেলেমেয়েরা স্কুল, কলেজে যায় না? মোটকথা আমি বিভ্রান্তিতে ভুগতে শুরু করেছি।

গত রাতে একটা খবর পড়ে আবার বিভ্রান্ত হয়ে গেছি। সারাজীবন শুনে এসেছি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হয়, ধোয়া কাপড় পরতে হয়। গত রাতে দেখলাম খবর বের হয়েছে জামা-কাপড় ধুতে নেই। জামা-কাপড় ধুলে পরিবেশের ক্ষতি হয়। যত কম ধোয়া যায় তত ভালো। কথাগুলো হেঁজিপেঁজি পাগল-ছাগলের মুখ থেকে আসতো তাহলে সেটা হেসে উড়িয়ে দিতাম। কিন্তু এগুলো গুরুত্বপূর্ণ মানুষের কথা— জিনসের প্যান্ট নির্মাতা লিভাইয়ের সিইও বলেছেন- জিনস কখনো ধুতে হয় না। তিনি যে জিনসটা পরে আছেন সেটা তিনি দশ বছর থেকে পরে আসছেন, একবারও ধুয়ে পরিষ্কার করেননি!

২.

সেদিন খবরের কাগজে একটা খবর পড়ে আমি মেরুদণ্ড সোজা করে বসেছি। জামায়াত সম্পর্কে বলতে গিয়ে অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে কর্ণেল অলি আহমদ বলেছেন, “তারা দেশপ্রেমিক লোক”। না, এবারে আমি এতটুকু বিভ্রান্ত হইনি, আমি খুব ভালো করে জানি দেশটির নাম যদি হয় বাংলাদেশ তাহলে তারা দেশপ্রেমিক না। লন্ডন টাইমস লিখেছিল, রক্ত যদি স্বাধীনতার মূল্য হয়ে থাকে তাহলে বাংলাদেশ অনেক মূল্যে স্বাধীনতা কিনেছে। সেই রক্তের দাগ জামায়াতে ইসলামীর হাতে লেগে আছে এবং সেটা তারা কোনোদিন মুছে ফেলতে পারবে না। তারা বাংলাদেশ চায়নি, একাত্তরে তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে। বদরবাহিনী তৈরি করে দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে, লেখকের হাত কেটেছে, চোখের চিকিত্সকের চোখ তুলে নিয়েছে, হূদরোগ চিকিত্সকের বুক চিরে হূিপণ্ড বের করে নিয়েছে। প্রায় অর্ধশতাব্দী পার হয়ে গেছে কিন্তু তারা একবারও নিজেদের দোষ স্বীকার করেনি, দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চায়নি। একাত্তর আমাদের কাছে পুরোনো ইতিহাস নয়, একাত্তরের ইতিহাস আমাদের বুকের রক্তক্ষরণ।

আমি অনেক সহজে বিভ্রান্ত হয়ে যাই, কিন্তু এই একটি ব্যাপারে আমার কোনো বিভ্রান্তি নেই। কখনো ছিল না, কখনো থাকবে না।

n লেখক :শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২০ জুলাই, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন