ঢাকা সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯, ১১ ভাদ্র ১৪২৬
৩০ °সে


রাজনীতিতে জ্যামিতিক ত্রিকোণ অবস্থার অবসান

রাজনীতিতে জ্যামিতিক ত্রিকোণ অবস্থার অবসান

দশ দিগন্তে g আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

জেনারেল এরশাদের মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা জ্যামিতিক ত্রিকোণ-অবস্থার অবসান হতে চলেছে বলা চলে। রাজনীতির এই ত্রিকোণের মধ্যে বড়ো কোণটি আওয়ামী লীগের। বিপরীত কোণের একদিকে বিএনপি এবং অন্যদিকে এরশাদ সাহেবের জাতীয় পার্টি। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি টিকে গেছে, কিন্তু জেনারেল এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টি ‘কোন্দলের ঘর’ হিসেবে কিছুদিন টিকে থাকলেও শেষ পর্যন্ত তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে কি না তাতে সন্দেহ রয়েছে।

আওয়ামী লীগ একটি মধ্য বাম দল ছিল। সেখান থেকে দলটি মধ্যডানে চলে এসেছে। বিএনপি জিয়াউর রহমানের আমলে ছিল একটি মধ্য ডানপন্থি দল। খালেদা-তারেকের নেতৃত্বে সেই দল কট্টর ডানে (সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদীদের সহযোগে) চলে এসেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পোলারাইজেশন ঘটেছে দুই ভাগে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ধর্মনিরপেক্ষ দল বা দলসমূহ, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-বিরোধী সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী দলসমষ্টি।

এই বিভাজনের এক দিকের নেতা আওয়ামী লীগ এবং অন্য দিকের নেতা বিএনপি। জামায়াত এবং সহিংস ও অহিংস মৌলবাদী দলগুলোর অধিকাংশই বিএনপির সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে। এরশাদ সাহেব বিএনপিকে উত্খাত করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন বলেই বিএনপির নেতৃত্বের সঙ্গে তার বিবাদ ছিল। কিন্তু বিএনপির আদর্শের সঙ্গে তার বিবাদ ছিল না। তিনি জিয়াউর রহমানের একই সামরিক ঘরানার ডিক্টেটর-কাম-পলিটিকাল নেতা। জিয়াউর রহমানের কায়দায় ক্ষমতা দখল করে একই কায়দায় একই লক্ষ্যে রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘তিনি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী এবং আদর্শে বিএনপির কাছাকাছি।’

এরশাদ সাহেব হয়তো ভেবেছিলেন, ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হওয়ায় বিএনপি বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং বিএনপির শূন্য স্থানটি পূরণ করবে জাতীয় পার্টি। এজন্য মওদুদ আহমদসহ বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে মন্ত্রিত্ব দিয়ে দলে টানা ছাড়াও সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে তিনি জিয়াউর রহমানকেও ছাড়িয়ে যান। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা এবং রবিবারের বদলে শুক্রবারকে ছুটির দিন করা ছিলো স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল আদর্শের ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানা।

প্রতি শুক্রবার তিনি ঢাকার কোনো একটি মসজিদে জুম্মার নামাজে আকস্মিকভাবে হাজির হয়ে ঘোষণা করতেন, তিনি আগের রাত্রে আল্লাহ কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে এই মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে এসেছেন। মানুষ তার কথা বিশ্বাস করতো না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও সেক্যুলার রাজনীতির বিরোধী শিবিরের নেতৃত্বের আসনটিও তিনি দখল করতে পারেননি। লোকে বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে ক্যান্টনমেন্টের এ টিম ও বি টিম বলেছে। কিন্তু গুরুত্ব দিয়েছে বিএনপিকে। আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী রয়ে গেছে বিএনপি। জাতীয় পার্টি নয়।

এরশাদ সাহেব অতীতের ত্রিশঙ্কু মহারাজের অবস্থা থেকে বাঁচার জন্যই তার সরকারে স্বাধীনতা যুদ্ধের শত্রু, কট্টর পাকিস্তানপন্থি রাজাকার মওলানা আব্দুল মান্নানের মতো ব্যক্তিদের স্থান দেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ থেকে মিজানুর রহমান চৌধুরী, শেখ শহীদুল ইসলাম প্রমুখ, বিএনপি থেকে ব্যারিস্টার মওদুদ, বাম শিবির থেকে আনোয়ার জাহিদ ও কাজী জাফরকেও দলে টেনে আনেন।

তিনি হয়ত আশা করেছিলেন, আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগ বিরোধী এই দুই শিবিরের মাঝখানে তিনি একটি তৃতীয় ধারা তৈরি করে ক্ষমতায় স্থায়ী হতে পারবেন। তিনি তা পারেননি। বিলাতের রাজনীতিতে আশির দশকে লেবার পার্টির ডানপন্থি গ্রুপের একদল নেতা সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট পার্টি (এসডিপি) নামে একটি নতুন দল গঠন করে ভেবেছিলেন তারা ব্রিটেনের দ্বি-দলভিত্তিক রাজনীতির ‘মোল্ড’ ভেঙে দেবেন এবং তৃতীয় ধারা সৃষ্টি করে ক্ষমতায় যাবেন।

তাদের স্বপ্নবিলাস স্বপ্নই থেকে গেছে। দ্বি-দলভিত্তিক ব্রিটিশ রাজনীতির ‘মোল্ড’ ভাঙেনি। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট পার্টি ভেঙে গেছে। তারা লিবারেল পার্টির মধ্যে মিশে গিয়ে কোনো রকমে টিকে আছে। লিবারেল পার্টির নাম এখন লিবারেল ডেমোক্র্যাট পার্টি। তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার একমাত্র আশা, যদি ব্রিটেনের কোনো সাধারণ নির্বাচনে হাঙ পার্লামেন্ট হয়। সার্কাসের গাধা যেমন অপেক্ষা করেছিল, কবে সার্কাসের নাচের দড়ি ছিঁড়বে এবং সুন্দরী নর্তকী মাটিতে পড়ে গেলে তার সঙ্গে শাদি হবে।

তবে ব্রিটিশ রাজনীতিতে তৃতীয় ধারা সৃষ্টি করতে না পারলেও একটি দুর্বল এবং প্রায় দৃশ্যগোচর নয় এমন একটি ত্রিকোণ সৃষ্টি করে রেখেছে লিবারেল ডেমোক্র্যাট পার্টি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ ধরনের একটি ত্রিকোণ সৃষ্টি করে এরশাদ তা দীর্ঘকাল ধরে রাখতে পেরেছেন, এটাই তার রাজনীতির বড়ো সাফল্য। তবে ধরে রাখতে পারেননি জাতীয় পার্টির ঐক্য এবং তাতে বহিরাগত নেতাদের।

ব্যারিস্টার মওদুদ বহু আগে ফিরে গেছেন বিএনপিতে। কাজী জাফর তো মৃত্যুর আগে পালটা জাতীয় পার্টি গঠন করে বিএনপি শিবিরে ফিরে গেছেন। আনোয়ার জাহিদও শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে ছিলেন না। তিনি রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে ছিলেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির এক বিশালসংখ্যক নেতা ও এমপি এরশাদ সাহেবের রাজনীতিতে আস্থা হারিয়ে দল থেকে বেরিয়ে আসেন এবং শেখ হাসিনাকে প্রথম জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনে সাহায্য দেন। তাদের মধ্যে শেখ শহীদুল ইসলামও ছিলেন। তাদের নতুন দল জেপি। তারা মহাজোটে আছেন।

জাতীয় পার্টির শিব রাত্রির শেষ সলতে ছিলেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। এরশাদ সাহেব ক্ষমতা হারিয়ে জেলে আটক হলে তিনি জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনিও আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন। এরপর এরশাদ সাহেব তার ভাই জি এম কাদের ও পত্নী বেগম রওশন এরশাদকে প্রধান সাথী করে জাতীয় পার্টি টিকিয়ে রাখেন। তার সাফল্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্রিটিশ লিবারেল পার্টির মতো একটি সুযোগসন্ধানী ত্রিকোণ তিনি তৈরি করতে পেরেছেন। কিন্তু রাজনীতির দ্বিদলীয় ‘মোল্ড’ তিনি ভাঙতে পারেননি।

এই ‘মোল্ড’ ভাঙার চেষ্টা করেছেন ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী (তার দলের নামই হলো বিকল্প ধারা), কর্নেল (অব) অলি আহমদ, ড. কামাল হোসেন, ড. ইউনুস প্রমুখ। কেউ পারেননি কিন্তু জেনারেল এরশাদ প্রধান দুটি দলের পরেই তার একক নেতৃত্বাধীন দলের জন্য একটি দুর্বল ত্রিকোণ সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। এটা তার সাফল্য। আর ব্যর্থতা হলো, তিনি তার দল এবং ত্রিকোণের জন্য রাজনৈতিক লক্ষ্যের ও ঐক্যের ভিত্তি তৈরি করে যেতে পারেননি অথবা চাননি। তার দল জন্ম থেকে রয়েছে এক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল। এই এক ব্যক্তির তিরোধানে দল কোথায় আশ্রয় নেবে? ত্রিকোণের এক কোণের শূন্যাবস্থা পূরণ করবে কে?

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি বেঁচে গেছে তার নেতৃত্ব ও অবস্থানের পরিবর্তনে। জিয়াউর রহমানের পর বিচারপতি সাত্তারের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতা ধরে রাখে। তারপর আসেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জেনারেল এরশাদের গণআন্দোলনে যোগ দেওয়া ও নেতৃত্ব দেওয়ার কোনো ইতিহাস নেই। নেই তার পত্নী, ভাই ও তার দলের। এক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও কর্তৃত্বের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভারশীল দলের অবস্থা হয় হক সাহেবের কৃষক প্রজা পার্টি ও মওলানা ভাসানীর ন্যাপের মতো। দলের নাম ও ভৌতিক অবস্থান থাকে। আর কিছু থাকে না।

এখন প্রশ্ন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জ্যামেতিক ত্রিকোণের একটি কোণ যে এরশাদ সাহেবের মৃত্যুতে শূন্য হলো তা আগামীতে পূর্ণ হবে কিনা? যদি না হয়, তাহলে বিএনপির ভাগ্য আবার ফিরবে কি? নাকি রাজনীতিতে আবার অস্থিরতা?

[ লন্ডন ২০ জুন, শনিবার, ২০১৯ ]

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৬ আগস্ট, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন