ঢাকা সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯, ১১ ভাদ্র ১৪২৬
৩১ °সে


পৃথিবীর আধিপত্যবাদ এবং মানব সংঘাত

পৃথিবীর আধিপত্যবাদ এবং মানব সংঘাত

প্রথমদিকে আমাদের দ্বন্দ্ব মূলত ছিল, রাজ-রাজাদের মধ্যে, অর্থাত্ কে কত বেশি রাজ্য জয় করতে পারে। পৃথিবীর এক প্রান্তের কেউ, অন্য প্রান্তের রাজ্যের জন্য কত যুদ্ধ-বিগ্রহ, মনুষ্য প্রজাতি নিজেদেরকেই হত্যা করতে শুরু করেছে। এরপর আমাদের মাঝে এসেছে আইডোলজিগত দ্বন্দ্ব। কে কোন আদর্শের, কে কোন মতবাদী, কে কোন ধর্মের! আদর্শগত দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ার পর পৃথিবী যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এর পতন, আর পশ্চিমাদের বিজয় পৃথিবীকে দিয়েছে নতুন ধারা। পৃথিবী কিভাবে চলবে, এ আদর্শ নিয়ে কত বিগ্রহ! কার মতবাদ অধিকসংখ্যক মানুষ মেনে নেবে, তা যেন হয়ে উঠেছে মুখ্য, এতে পুরো মানব প্রজাতির ওপর কি প্রভাব, তা নিজেরাই ভুলে গেছি আমরা। আদর্শের জায়গা থেকে আমাদের আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা। কার চেয়ে কে কত বড় সে প্রতিযোগিতায় এখন পৃথিবী, কিন্তু প্রান্তিক মানুষগুলো যেমন ছিল, তেমনই থেকে গেছে, পৃথিবীর আধিপত্যকে কেন্দ্র করে কিছু মানুষ ক্ষমতার মহড়া দেখাতে পারলেও, সেই ক্ষমতার নিচে চাপা পড়ছে অসহায় মানুষেরা, ক্ষতিটা হচ্ছে পৃথিবীর ক্ষমতা না বোঝা মানুষগুলোরই।

বাংলাদেশের প্রিয়া সাহার কথা যদি বলি, পৃথিবীর ক্ষমতাবান মানুষ ট্রাম্পের কাছে তার নালিশ ধর্ম নিয়ে! নিজের অস্তিত্বের বিলীনের কথা বলেছেন, বাংলাদেশকে করেছেন প্রশ্নবিদ্ধ! আসলে এভাবেই হয়ত ছড়িয়ে যাচ্ছে বিষবাষ্প, যার পরিণাম হবে ভয়াবহ। প্রিয়া সাহা তার ক্ষুদ্র স্বার্থে বলেছেন, কিন্তু এর প্রভাবটা পড়বে বৃহত্ স্বার্থের ওপর। সংখ্যালঘু হিসেবে তার নির্যাতনের কথা আমলে নিয়ে, পৃথিবীর ক্ষমতাধর মানুষগুলো হয়ত আরো বেশি মানুষের জীবনের হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হবে। কোনো ধরনের শান্তিপূর্ণ আলোচনা না হয়ে, তাতে সংঘাত আরো বাড়বে, নিজেদের জন্য নিজেরাই হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছি না তো আমরা?

পৃথিবীর ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো, এমন ইস্যুই খুঁজে থাকে, যার মাধ্যমে কোনো জাতিকে নিজের নিঃশেষ করা যায়, পরাভূত করা যায়। যার মধ্য এই ধর্ম হলো অন্যতম। বর্তমান বিশ্বের সংঘাতগুলোর দিকে তাকালে এমন সব উপাদানই চোখে পড়ে, ক্ষমতাধর মানুষ এসব সংঘাতপূর্ণ দিকগুলোর দিকেই মাছরাঙ্গার মতো চোখ রাখে, যার প্রেক্ষিতে করাল থাবায় প্রাণ যায় নিরীহ মানুষের, আর তারা নিজেদের আরো ক্ষমতাধর মনে করতে থাকে।

নিজেদের দুর্বলতাগুলো নিজেরাই প্রকাশ করে দেই আমরা, একই সীমানায় বাস করে, সেই সীমানার বিরুদ্ধেই আঙুল তুলি, যার কারণে আমাদের দুর্বল ভিত্তি জেনে আঘাত করা সহজ হয়ে যায় প্রতিপক্ষের। পুঁজিবাদ একই রাষ্ট্রের ভেতর একাধিক গোষ্ঠী সৃষ্টি করছে, কাউকে কেউ নিজের মনে করতে পারে না, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যতা বোধ পিছিয়ে দিচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোকে, আর ফায়দা লুটছে হর্তাকর্তারা।

ধর্ম নিয়ে সংঘাত পৃথিবীতে আরো হবে, কেননা উপনিবেশবাদের সময়ই তারা আরো ১০০ বছর দূরদর্শী চিন্তা করেই নিজেদের ক্ষমতা ছেড়েছে। বিরোধের জায়গাগুলো চিহ্নিত করেই, যাতে সেখানে বিরোধ লেগেই থাকে এমন কলাকৌশলে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছেই রেখেছে, পরোক্ষভাবে এখনো এই পৃথিবী উপনিবেশবাদের মধ্যেই রয়েছে। এক ধরনের জালে আটকে আছে ক্ষমতাহীন মানুষরা, যেভাবে টেনে তুলবে ঠিক সেভাবেই উঠতে হচ্ছে সবাইকে।

বিশ্বায়নের যুগে পৌঁছালেও, মুক্তির যুগে আমাদের এখনো প্রবেশ করিনি। সমাজ, দেশ, সভ্যতার পায়ে এখনো শেকল, এই শেকলের প্রতিটি জোড়ায় আছে, ধর্ম, বর্ণ, আধিপত্য, সম্পদ। এই শেকল যতদিন না খুলবে, মানবজাতির বৃহত্ একটি অংশ রয়ে যাবে অন্ধকারে, আর রাজত্ব করবে অল্পসংখ্যক কিছু মানুষ। কে জানে আজ থেকে হাজার বছর পর হয়ত, সেই আধিপত্যবাদ মানুষের বংশধররাই নতুন নামে টিকে থাকবে, আর ক্ষমতাহীন মানুষগুলোর কাঠামোই থাকবে জাদুঘরে, তখন তারা ইতিহাসের বিষয়বস্তু করবে আমাদের, যে এই নামে কিছু একটা পৃথিবীতে ছিল। এখনই সচেতন হওয়া উচিত, না হয় যে আমাদের ভুলেই, আমরা বিলীন হয়ে যাবো।

n লেখক :শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৬ আগস্ট, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন