ঢাকা শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬
৩৩ °সে


কোথায় যাচ্ছে কাশ্মীর!

কোথায় যাচ্ছে কাশ্মীর!

হানাদারি থেকে সন্ত্রাসবাদ। স্বাধীনতার উষালগ্ন থেকেই কাশ্মীর উত্তাল। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে সাত দশকে ছবির মতো সুন্দর ডাল লেকের শীতল জল বারবার গরম রক্তের স্রোতে লাল হয়েছে, ঝিলমের স্রোতে ভেসে গেছে অজস্র মৃতদেহ। আজ আর ভূস্বর্গ নয়, কাশ্মীরকে সবাই জানে তার বাতাসে বারুদের গন্ধের জন্য আর অবিরাম রক্তক্ষয়ের জন্য, দমবন্ধ করা আতঙ্কের পরিবেশের জন্য।

১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর কাশ্মীর ভারতে আসার পর পাকিস্তান সামনে হানাদার বাহিনী পেরিয়ে পেছনে ব্রিটিশ মিলিটারি ফৌজকে দিয়ে কাশ্মীর দখল করার চেষ্টা করে। কাশ্মীরের রাজা হরিসিং প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে চিঠি লিখে ভারতীয় সৈন্যদের সাহায্য চান। দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় যেসব ব্রিটিশ সৈন্য ভারতে ছিল ভারত তাদের সবাইকে তাড়িয়ে দেয়, তারা গিয়ে যোগ দেয় পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে। ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর হরি সিংয়ের রাজত্বের এলাকা জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ সম্পূর্ণভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন হিন্দু রাজা হলেও সমগ্র জম্মু-কাশ্মীরে জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশ ছিল ইসলাম ধর্ম অবলম্বনকারী মুসলমান। কাশ্মীরের রাজা তার প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ করেন শেখ আবদুল্লাহকে। রাজার অনুরোধে ভারতের সংবিধানে ৩৭০ ধারাযুক্ত করে বলা হয়—জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখ ভারত থেকে এই ‘বিশেষ’ সুযোগ-সুবিধা পাবে। আর ভারতের সংবিধানে ৩৫-এর (ক) ধারায় বলা হয়—কাশ্মীরের বাইরের কোনো রাজ্যের এবং বিদেশের কোনো লোক কাশ্মীরে জমি কিনতে পারবে না। কাশ্মীর জোর করে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ১৯৪৮, ১৯৬৫, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান কাশ্মীরকে অধিগ্রহণ করার জন্য তিনবার ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং প্রতিবারই ব্যর্থ হয়।

সম্প্রতি ভারতের বিজেপি সরকার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সংবিধান সংশোধন করে জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখের প্রশাসনিক দায়িত্ব সরাসরি কেন্দ্রের হাতে নিয়ে নেয়, এবার বিজেপির অত্যাচারের সীমা ৭২ বছরের ইতিহাস ছাপিয়ে গেছে। শুধু ভারতেই নয়, কাশ্মীরকে কার্যত পৃথিবী থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে গত ৩ সপ্তাহ ধরে। স্কুল, কলেজ, অফিস সব বন্ধ হয়ে গেছে। আর দিল্লিতে বসে অমিত শাহরা টিভিতে বলছে—কাশ্মীর সম্পূর্ণ সচল, বাস্তবিক কি তাই? বিবিসি রয়টার্স নিউ ইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে সংবাদ মাধ্যমগুলো দেখিয়ে আসছে জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখের মানুষগুলোর করুণ অবস্থা।

নোবেল জয়ী অমর্ত্য সেন এক ইংরেজি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাত্কারে অভিযোগ করেছেন—কাশ্মীরি নেতাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা না করে মোদি সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সম্পূর্ণ বেআইনি, তাদের উচিত ছিল কাশ্মীরের জনগণ ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা আর সেটাই গণতন্ত্রর নিয়ম। অমর্ত্যসেন আরো বলেছেন—শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে বাদ দিয়ে কাশ্মীরের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।

তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াল? তিন সপ্তাহ পরে দেখা গেল—মোদি আমিত শহের হঠকারী সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো বাঙালিরা। সুযোগ পেলেই বাঙালিরা বেড়াতে যায়। আগামী ৪০-৪৫ দিন পর বাঙালির জাতীয় উত্সব দুর্গাপূজা। হাজার হাজার মানুষ এপ্রিল মাস থেকেই আগাম কাশ্মীরে হোটেল ও শিকারা বুক করে, এবারও করেছিল। জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখে কোনো শিল্প নেই। তাদের একমাত্র শিল্প হলো পর্যটকশিল্প। কাশ্মীরিরা অক্টোবর-নভেম্বর মাস থেকেই কলকাতায় শাল ও নানারকম গরম জামা-কাপড় বিক্রি করতে আসে। তাদেরও পথে বসিয়ে দিয়েছেন অমিত শাহরা। কলকাতায় শতাধিক ভ্রমণসংস্থা আগাম টাকা দিয়ে বসে আছে, তারা অগ্রিম টাকা দিয়ে পর্যটকদের জন্য হোটেল ও শিকারা বুক করেছে। হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ল। এমনিতেই জম্মু, কাশ্মীর, লাদাখ ও পশ্চিমবঙ্গে কোনো কর্মসংস্থান নেই। বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অমর্ত্যসেনের সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলছেন যে, আগাম আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। কেন বর্ষীয়ান নেতা ফারুক আব্দুল্লাহকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে? কেন কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহকে জেলে পাঠানো হয়েছে? আরেক মুখ্যমন্ত্রী পিডিপি মেহেবুবা মুফতি ও তার মেয়েকে কেন গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে? মেহেবুবা মুফতি টাকার লোভে এই প্রথমবার বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধেছিল। বিজেপিকে তিনি কাশ্মীরে নিয়ে গেলেন কেন—এ প্রশ্ন উঠেছে।

সংবিধানের ঐ দুটি ধারা সংশোধনের পর সদ্য আরএসএসে যোগ দেওয়া আমার পরিচিত একজন কেন্দ্রীয় সরকারি আমলা দ্রুত ছুটে এসেছেন আমার বাড়িতে। লাফাতে লাফাতে বললেন—তিনি কাশ্মীরে গিয়ে ২০-২৫ মিটার জমি কিনবেন। এই পরিচিত সরকারি আমলা জানেন না সংবিধান সংশোধন হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মোদি অমিত শাহের বন্ধু ধনকুবের মুকেশ আম্বানি সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছেন—তিনি জম্মু-কাশ্মীরে গিয়ে কয়েক হাজার একক জমি কিনবেন। সেখানে তিনি শিল্প গড়বেন। কোন স্বার্থে গুজরাটি ব্যবসায়ীদের জমি কিনতে দেওয়া হচ্ছে—তা এখন ভালো লেকের জলের মতো পরিষ্কার। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ১৯৪০ সালে লাহোরে মুসলিম লীগের সম্মেলনে দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন। তীব্র আপত্তি করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, সেই জন্যই জনসংখ্যা মুসলমান বেশি হওয়া সত্ত্বেও কাশ্মীর ভারতে যোগ দিয়েছিল। আরেক ধাপ এগিয়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে পূর্ব বাংলার মানুষরা ইন্দিরা গান্ধীর সহায়তায় ঐ দ্বিজাতিতত্ত্ব ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। আর এটাই হলো ইতিহাস। ইতিহাস কোনো দিন কাউকে ক্ষমা করে না। মোদি, অমিতশাহ ও মোহন ভগবত ধেই ধেই করে নাচতে শুরু করেছে। আমার পরিচিত বন্ধু তার সঙ্গে গলা মিলিয়ে কাশ্মীরে জমি কেনার স্বপ্ন দেখছে।

n লেখক : ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন