ঢাকা শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২২ °সে


ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতার উত্তাপ

আটলান্টিকের দুই পারে অবস্থিত উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ মহাদেশের সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির ইতিহাস দুই অঞ্চলের মধ্যে বিস্তর সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত করেছিল। যে ঘটনার পারিপার্শ্বিক প্রতিক্রিয়ায় ঐ অঞ্চলে নিরঙ্কুশ মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একই সঙ্গে যুগে যুগে রাশিয়ার কাঙ্ক্ষিত অধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়ে আছে। এর ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুগে ইউরোপ দুই শক্তির মধ্যকার মিলিটারি বাফারে পরিণত হয়েছিল
ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতার উত্তাপ

আইএনএফ বা ইন্ট্যারমিডিয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস টিট্রি হচ্ছে রাশিয়ান ফেডারেশন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। ১৯৮৭ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি থেকে সম্প্রতি একতরফাভাবে সরে এসেছে আমেরিকা। বস্তুত, মস্কোর প্রতি শর্তভঙ্গের অভিযোগ এনে নিরস্ত্রীকরণ-সংক্রান্ত এই চুক্তি থেকে সরে আসে আমেরিকা। পক্ষান্তরে ওয়াশিংটনের অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে রাশিয়াও তাত্ক্ষণিকভাবে আইএনএফ চুক্তির কার্যকারিতা স্থগিত করেছে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যকার অস্ত্র সংবরণ প্রক্রিয়ায় দেখা দিয়েছে একধরনের স্থবিরতা। এতে বিশ্ব এক মারাত্মক অস্ত্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। বিশেষত, ভূমি থেকে নিক্ষেপণযোগ্য মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতার মাত্রা তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করেছে এই বাস্তবতা। এই আশঙ্কা আরও জোরদার করে চুক্তি থেকে সরে আসার অব্যবহিত পরই আমেরিকা কর্তৃক একটি অত্যাধুনিক মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষামূলক উেক্ষপণ। যদিও পেন্টাগনের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে একযোগে নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া ও চীন। অন্যদিকে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার অল্পবিস্তর পর রাশিয়াও অতিদ্রুত দুই দফায় ঐ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। দুই দেশের এমন পালটাপালটি পদক্ষেপকে সমগ্র বিশ্বে মারাত্মক অস্ত্র প্রতিযোগিতার অশুভ লক্ষণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আমরা জানি যে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যকার এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আরো স্পষ্টভাবে বলা যায়, তত্কালীন মার্কিন মিত্র পশ্চিম ইউরোপের ভূমিতে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রেখেছিল আইএনএফ চুক্তিটি। বস্তুত, তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজ সার্বভৌম এলাকার ইউরোপীয় অংশে মোতায়েন করেছিল ঐ সময়ের অত্যাধুনিক মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এসএস-২০। মস্কোর ঐ পদক্ষেপে সমগ্র ইউরোপ মহাদেশ রুশ ক্ষেপণাস্ত্র নিশানায় চলে আসে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমেরিকা অ্যাটলান্টিকের উভয় পারের ঐক্য সংহতি-সংক্রান্ত নিজের পরাশক্তিমূলক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসে। এরপর বিভিন্ন পরিক্রমায় দুই দেশ এই চুক্তিতে উপনীত হলে স্বস্তি ফিরে আসে পশ্চিম ইউরোপে। একইসঙ্গে চুক্তিটি স্নায়ুযুদ্ধ উত্তর যুগেও ইউরোপের পরমাণুযুদ্ধের নিবারক হিসেবে কাজ করে আসছিল। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে আমেরিকার সঙ্গে তার ইউরোপীয় অংশীদারদের একধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। ফলে আটলান্টিকের উভয় পারের বৃহত্তর ঐক্যও হুমকিপ্রবণ। এ সময়ের মধ্যে আমেরিকা অন্তত দুটি পূর্ব ইউরোপীয় দেশে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা স্থাপনের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহত করতে সক্ষম হয়। এই বাস্তবতা আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অতিরিক্ত ঝুঁকি দূর করার প্রাথমিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে। ফলে ওয়াশিংটন নিজের বৈশ্বিক ক্ষমতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চল এশিয়ার দিকে মনোযোগ দিতে সচেষ্ট হয়। আজ এটি খুব পরিষ্কার যে আইএনএফের আওতায় প্রায় আড়াই যুগ ধরে মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতার ইতিবাচক স্তিতাবস্থা বিরাজ করে আসছিল। চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে গত দশক পর্যন্ত এই সমীকরণ আমেরিকার জন্য খুব বেশি উদ্বেগের ব্যাপার ছিল না। কিন্তু গত দশক থেক নতুন পরাশক্তি চীনের সামরিক উত্থান ওয়াশিংটনের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে। চীনের এই সামরিক উত্থানের সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত দেশটির অগ্রসরমান ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প। আমেরিকার অভিযোগ, আইএনএফ চুক্তির আওতায় মস্কো-ওয়াশিংটন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করলেও সেটি চীনের জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করছে না। যে কারণে আমেরিকা বাতিলকৃত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পরিবর্তে চীন-মার্কিন-রাশিয়া নতুন ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে বেশি আগ্রহী। যদিও চীন ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত এমন চুক্তিতে বেইজিংয়ের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে। ফলে মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত ঝুঁকি বেড়ে এশিয়ায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা জোরদার হচ্ছে।

আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অস্ত্র হচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র, যার সাহায্যে গোলাবারুদ সংবলিত উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক বোঝাই যুদ্ধাস্ত্র বহন করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানা যায়। এসব ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত। এক, ছুড়ে দেওয়ার পর যেসব ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেগুলোকে বলা হয় গাইডেড মিশাইল। এগুলো বিভিন্ন রেঞ্জের বহু শ্রেণিতে বিভক্ত। অন্যদিকে ছুড়ে দেওয়ার পর যেসব ক্ষেপণাস্ত্র আর কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, সেগুলোকে বলা হয় মিলিটারি রকেট। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের মতে, ১ হাজার থেকে ৩ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে আঘাত হানতে সক্ষম যুদ্ধযানকে মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। অন্যদিকে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যকার বাতিলকৃত চুক্তির শর্তে ৫৫০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরত্বে আঘাত হানতে সক্ষম যানগুলোকে নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে আইএনএফ চুক্তি স্বাক্ষরের পরের বছরগুলোতে উভয় দেশ এ ধরনের প্রায় ২ হাজার ৭০০ অস্ত্র ধ্বংস করেছিল, সাম্প্রতিক ইতিহাসে যা ছিল নজিরবিহীন।

তাই বর্তমানে এই চুক্তির অবসান হওয়ার নানা প্রশ্নের অবতারণা হচ্ছে। এর মধ্যে অগ্রাধিকার পাচ্ছে চীন-মার্কিন বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্র হিসেবে এশিয়া অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতার বিস্তারের হাতছানি। এক্ষেত্রে অনেকটা রাখঢাক ছাড়াই আমেরিকা এশিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়নের ব্যাপারে নিজেদের সদিচ্ছার কথা গণমাধ্যমে জানিয়েছে। আইএনএফ চুক্তির আনুষ্ঠানিক অবসানের মাত্র কয়েক দিন পরেই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী তার নিয়মিত এশিয়া সফরের প্রাক্কালে এমন সম্ভাবনার কথা ঘোষণা করেন। এক্ষেত্রে কোন কোন দেশে তারা এমন ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনে আগ্রহী সেটি পরিষ্কার করেননি। যদিও এশিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতির মূল অংশই হচ্ছে পূর্ব এশিয়া। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ গুয়াম ও এর আশপাশের এলাকাকে ঘিরে মার্কিন সামরিক পরিকল্পনা অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে। অন্যদিকে মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার প্রায় ১৫টি দেশের সঙ্গে সীমানা-সংযুক্তি আছে চীনের। নিজের বৈশ্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধির আগে আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে একক আধিপত্য বিস্তার বেইজিংয়ের কাছে বরাবর গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধকে কাজে লাগিয়ে চীনের সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত দেশগুলো মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের লক্ষ্যস্থল হিসেবে ভাবা হচ্ছে। এমনটি হলে এই অঞ্চলে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র হুমকিতে থাকা দেশগুলোর নিরাপত্তা বিধান-সংক্রান্ত মার্কিন এজেন্ডা বাস্তবায়নে পথ সুগম হবে। যে প্রক্রিয়ায় বেইজিংয়ের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত দেশগুলোকে এককাট্টা করা সম্ভব হবে। তাদের নিরাপত্তাভীতি দূরীভূত করার মার্কিন ইচ্ছা ও সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যাবে। বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্বব্যপী কর্তৃত্ব ধরে এটি আমেরিকানদের একটি কৌশল মাত্র।

আটলান্টিকের দুই পারে অবস্থিত উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ মহাদেশের সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির ইতিহাস দুই অঞ্চলের মধ্যে বিস্তর সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত করেছিল। যে ঘটনার পারিপার্শ্বিক প্রতিক্রিয়ায় ঐ অঞ্চলে নিরঙ্কুশ মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একই সঙ্গে যুগে যুগে রাশিয়ার কাঙ্ক্ষিত অধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়ে আছে। এর ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুগে ইউরোপ দুই শক্তির মধ্যকার মিলিটারি বাফারে পরিণত হয়েছিল। এই ক্ষেত্র তৈরিতে মার্কিনিদের প্রণীত মার্শাল পরিকল্পনা স্মরণযোগ্য। এর আগেও এক ভিন্ন বাস্তবতায় আমেরিকা নিজের ক্ষমতাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। এসংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা হচ্ছে—The United States looking outward বা ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাইরের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছে’। অনেক আগে মার্কিন ভূরাজনীতিক আলফ্রেড মহান সেই নিবন্ধে উল্লেখ করেছিলেন যে, বৃহত্তম দুটি মহাসাগরের মাঝামাঝি অবস্থিত আমেরিকার জনগণ ও সরকার মনে করে, এখন আমাদের বাইরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এই ঐতিহাসিক ঘোষণার সঙ্গে আমেরিকার বর্তমান বাস্তবতার অনেক মিল আছে। খুব স্পষ্টভাবেই বলা যায়, ওয়াশিংটনের অবশিষ্ট বৈশ্বিক ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য অপরিহার্য এশিয়া অঞ্চল। যেখানে চীনের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। চীনের সক্ষমতার উল্লেখযোগ্য অনুষঙ্গ দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প। বিশেষ করে, মাঝারি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উত্পাদন ও মজুতে চীন ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করেছে। এই বাস্তবতায় চীনের অনুমিত লক্ষ্য হচ্ছে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ। সম্ভাব্য এই যুদ্ধে চীনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্ব্বী আমেরিকা ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা। এরকম সম্ভাবনা মাথায় রেখে আঞ্চলিক পর্যায়ে আমেরিকা ও চীন উভয়ের কাছেই মাঝারি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অত্যন্ত জরুরি। আইএনএফ চুক্তি বাতিলের মধ্য দিয়ে আমেরিকা এশিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ সুগম করেছে। এর ফলে চীনের ওপর চাপ বেড়ে গেছে। যার প্রভাবে এশিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরুর শঙ্কা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

n লেখক :বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৫ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন