ঢাকা মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬
২৯ °সে


ভেজাল-দূষণ দূর করা কি খুবই কঠিন?

ভেজাল-দূষণ দূর করা কি খুবই কঠিন?

বাংলাদেশে আজ চর্তুদিকে কেবল ভেজাল আর দূষণ! পানিতে ভেজাল; খাদ্যদ্রব্য, শাক-সবজি, ফলমূল ইত্যাদিতে ভেজাল; এমনকি ওষুধে পর্যন্ত ভেজাল পৌঁছে গেছে অনেক আগেই। আদর্শ খাদ্য নামে অভিহিত দুধও আজ অখাদ্য প্রায়! শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় সবই দূষণে ভরা। ব্যবসা-বাণিজ্যে দূষণ, বাংকে দূষণ, চাকরিতে দূষণ, মানুষের শিক্ষা-দীক্ষা, চিন্তা-চেতনায় দূষণ, রাজনীতিতে দূষণ। সর্বমুখী দূষণে বাংলাদেশের মানুষের জীবন আজ অতিষ্ঠ। মারাত্মক সব দূষণে দেশের রাজধানী ঢাকা আজ বসবাসের অযোগ্য শহর। বাংলাদেশ সর্বপ্রকার দূষণ-ভূষণে, এমনকি নেপাল, ভুটান, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের চেয়েও পিছিয়ে। সব দূষণের বিষয়ে সংক্ষিপ্তভাবে যদি এক অনুচ্ছেদ করেও লেখা হয়, তাহলে কয়েকশ পাতার একটি বই হয়ে যাবে বৈকি!

আমরা সবাই জানি, মানুষের সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকার জন্য সুপেয় পানির প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য এবং পানির অপর নাম জীবন। আর এই জীবন বাঁচাতে মানুষ কী ধরনের পানি খাচ্ছে? পত্রপত্রিকায় সাম্প্রতিক প্রকাশিত ঢাকা ওয়াসার সেবা ও ময়লা-দুর্গন্ধযুক্ত পানি সরবরাহের কেচ্ছা-কাহিনি এবং হাইকোর্টের রুল, মন্তব্য আর নির্দেশনাতেই বিষয়টি পরিষ্কার। ওয়াসার অজুহাত, ঢাকায় পানি ভূ-স্তরের নিচে নেমে নাগালের বাইরে, বুড়িগঙ্গা আজ মৃতপ্রায়! বঁড়িগঙ্গা নদী পার হতে হলে আজকাল নাকে-মুখে রুমালচাপায়ও কড়া দুর্গন্ধ বন্ধ হয় না। বুড়িগঙ্গা এখন আর এক উপাখ্যান, ইতিহাস ও অধ্যায়। এ বিষয়ে অন্য সময়ে লিখব বলে আশা রাখি। বছরের পর বছর ধরে রাজধানীবাসী খাওয়ার পানির জন্য হাহাকার করে, খালি কলস নিয়ে মিছিল হয়, অনশন হয়, পত্রপত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়, কিন্তু সমস্যার কোনো সুরাহা হয় না। পানির অভাব লেগেই থাকে। সমস্যার সমাধানে বিগত ৪০ বছরেও নেওয়া হয়নি কোনো উপযুক্ত ও টেকসই দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা। বিদেশি লোনের টাকা, জনগণের ট্যাক্সের টাকা অনিয়ম-দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় অপচয় হয়; হয় না কেবল পর্যাপ্ত সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা, ঘোচে না পানির অভাব। কাজেই আর সময়ক্ষেপণ না করে জনগুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিষয় বিবেচনায় এ খাতকে সরকার আন্তরিকভাবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে, সমস্যাগুলোর সমাধান করবে, এটাই সবার প্রত্যাশা।

যে ওষুধ মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য, আজ তা হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের মৃত্যুর কারণ। নিজ অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বিদেশে চিকিত্সায় যে কোনো একটি বা দুটি ওষুধ দেওয়া হোক না কেন, তা দ্রুত যথাযথ কাজ করে, অর্থাত্ গুণগত মান ও পরিমাণ ঠিক থাকলে যে ফল দেওয়ার কথা, ঠিক তা-ই পাওয়া যায়। আর এই ভেজাল ওষুধের কারণে আমাদের দেশে ডাক্তাররা বোধ হয় রোগীকে অগণিত ওষুধ খাওয়ার পরার্মশ দিয়ে থাকেন, কখনো রোগ ঠিকমতো চিহ্নিত না করতে পারার কারণেও দিয়ে থাকতে পারেন! ভাবখানা এমন, যেন কোনো না কোনো একটা ওষুধে কাজ তো হবেই! আর আমরা অধম জনগণ জীবন বাঁচানোর তাগিদে গোগ্রাসে তা গিলতেই থাকি! অথচ দেশের ডাক্তারগণ সরব হয়ে ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে, ভেজাল ফলমূল, খাদ্যদ্রব্যের বিরুদ্ধে রাস্তায় আসেন না, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন না। খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল ও দূষণ যত বেশি, রোগ তত বেশি, রোগী তত বেশি। অতএব, ডাক্তার আর ক্লিনিকের যত রমরমা ব্যবসা ও ভেজালের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে অভিযান যে পরিচালিত হয় না, তা নয়। তবে তা নগণ্য। কেবল রমজান মাস এলে রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে মাঠে নামে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সরব ঘোষণা দিয়ে ভেজালকারীদের সতর্ক করে অভিযান কেন? আবার বছরের অন্যান সময়ে নীরব ঢিলেঢালা কার্যক্রম কেন? অভিযান চালাতে হবে সাঁড়াশি এবং প্রতিনিয়ত যখন-তখন। তবেই না সুফল আশা করা যায়।

আমরা অনেকেই জানি, বাংলাদেশে রোগ ও রোগীর তুলনায় চিকিত্সক কম, আধুনিক চিকিত্সা সরঞ্জাম অপ্রতুল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডাক্তারদের পেশা আর আন্তরিক ও মানবিক নেই, চিকিত্সা সেবাখাত এখন প্রকটভাবে বাণিজ্যিক খাত হয়ে গেছে। আর সরকারও যেন নির্বিকার, কঠোর হস্তে ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতাদের দমনের জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ করেছে না। মানুষের জীবন বলে তো কথা! মানুষ তার সর্বস্ব দিয়ে টাকা খরচ করেও চিকিত্সা চায়, বাঁচতে চায়। বিত্তবান এলিট শ্রেণির ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের লোকেরা, তাদের সন্তানেরা যখন অনেকেই বিদেশে নামি-দামি হাসপাতালে সরকারি খরচে চিকিত্সা নিয়ে থাকেন, তখন বুঝতে হবে দেশের চিকিত্সা ব্যবস্থায় তাদের কোনো আস্থা নেই, নতুবা কোথাও কোনো বড়ো রকমের সংকট আছে। সংকট যাই থাক, চিকিত্সা সেবা প্রার্থী সাধারণ মানুষ যেন সঠিক চিকিত্সা সেবা পান, তার নিশ্চয়তা সরকার নিশ্চিত করবেন। সাধারণ মানুষ যেন কোনো অবস্থতায় কোনো চিকিত্সা সেবা থেকে আর বঞ্চিত না হয়। এক্ষেত্রে সরকারকে প্রতিনিয়ত প্রতিটি সেবাস্তরে অভিযান চালাতে হবে, কঠোর হস্তে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দিয়ে ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতাদের দমন করবেন, আর চিকিত্সকরা তাদের পেশাদারিত্বে আন্তরিক সেবার মনোভাব দেখিয়ে তার দায়িত্ব পালন করবেন, এটাই সর্বসাধারণের আশা।

শব্দ দূষণ আর বায়ু দূষণ এখন দেশের বড়ো বড়ো শহরের বড়ো রকম সমস্যা। এর যন্ত্রণা-যাতনা আর ক্ষতিকারক দিক নিয়ে সরকারের চিন্তাভাবনা খুব একটা আছে কি না সন্দেহ। জনগণের দেওয়া ট্যাক্স-ভ্যাটের টাকায় সরকারের সরকারি কর্মকর্তা আমলা-মন্ত্রীরা থাকেন বিলাসবহুল সাউন্ড প্রুফ বাড়িতে, রাস্তায় চড়েন হাইফাই সাউন্ড প্রুফ এসি গাড়িতে, অফিস কক্ষও তথইবচ। অতএব, উনাদের তো দূষিত শব্দ শুনতে হয় না, দূষিত বায়ু নাকে ঢোকে না। তাই, এ ব্যাপারে তাদের মাথা ব্যথাও নেই বললেই চলে। যত সব সমস্যা যেন কেবল অধম শহরবাসীদের ভোগের জন্য, আর ত্যাগের জন্য। এরা দুর্ভোগ ভোগ করবে, আবার তার জন্য ত্যাগও করবে! হায়রে দুর্ভাগা দেশের দুর্ভাগা মানুষের ভাগ্য! অথচ, আমরা সকলেই জানি, এ দুর্ভোগ কেবল হযবরল প্রকৃতির এবং রাস্তায় চলাচলের অনুপযোগী যানবাহন ব্যবসায় নিয়োজিত একশ্রেণির সুবিধাভোগী লোভী মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট, সঙ্গে জড়িত অদক্ষ ও বেপরোয়া সব গাড়ি চালকরা। মানুষই বায়ু ও শব্দ দূষণ করে মানুষকে পেষণ করে যন্ত্রণা দিচ্ছে, মারছে। এর দায় কি বিআরটিএ, ডিসিসি (উত্তর ও দক্ষিণ) ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নয়? তদের কি করার কিছুই নেই? ঢাকা শহরকে বসবাসের অযোগ্য হতে তারা কি সাহায্য করছে না?

একজন অদক্ষ অসুস্থ মদ্যপ মানুষ কীভাবে গাড়ি চালকের লাইসেন্স পেতে পারে? গাড়ির ইঞ্জিন অনেক পুরাতন, সমস্যাযুক্ত, কালো ধোঁয়া বের হয়, এ ধরনের গাড়ি রাস্তায় চলাচলের ফিটনেস সার্টিফিকেট পায় কীভাবে? এর উত্তর কেবল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভালো জানেন। জনগণ ভ্যাট-ট্যাক্স দেয়, দিচ্ছে এবং দিবে। তাতে আপনাদের বেতন-ভাতা আরাম-আয়েশ বিলাসিতা হয় ও হবে। বিনিময়ে তারা শুধু কাঙ্ক্ষিত সেবা চায়, তাদের পাওনা চায়, নাগরিক সুবিধা চায়, অধিকার চায়, তারা কারো দয়া চায় না। তাদের অবহেলা করবেন না, শহুরে জীবনের ন্যায্য পাওনাটুকু তাদের দিন। নতুবা, বঞ্চিতদের স্ল্লোগানে হাহাকারে একদিন আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠবে। তার আগেই, শব্দ দূষণ আর বায়ু দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আপনারা কঠোর হন, সকল ক্ষেত্রে সবার জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ করুন, আইনের শাসন জারি করুন, সুশাসন নিশ্চিত করুন। তা হলে আমরা দেখতে পাব, অচিরেই ভেজাল ও দূষণ সমাজ থেকে উধাও হয়ে গেছে। মানুষ শহরগুলোতে প্রাণ খুলে দম নিতে পারবে, বসবাসের স্বপ্ন দেখতে পাবে।

n লেখক :ঊর্ধ্বতন ভাইস চেয়ারম্যান, বিজেজিইএ।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন