ঢাকা মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬
২৮ °সে


ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টি, অতঃপর

ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টি, অতঃপর

বর্তমান বিশ্বে ইসরাইলের আর্থিক, রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব রয়েছে। পশ্চিমা দুনিয়ায় এই রাষ্ট্রটির প্রতি অনুরাগ অনেক। ইসরাইল কীভাবে সৃষ্টি হলো তা সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করব। হিব্রু একটি মিশ্র জাতি। হিব্রু শব্দের উত্পত্তি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলে, শত্রুরা তাদের হাবিরু বা খাবিরু বলে ডাকত, তা থেকেই হিব্রু নামটি এসেছে—যার অর্থ ভবঘুরে, নিচু বংশের মানুষ। আবার কারো মতে, মেসোপটেমিয়ার ইউফ্রেতিস নদীর ওপার থেকে তারা এসেছিল বলে তাদের নাম হয়েছিল ইবার বা ইভার, যা থেকে হিব্রু নামের উত্পত্তি। তবে নাম নিয়ে মতভেদ থাকলেও পণ্ডিতরা একমত যে তারা প্যালেস্টাইনি এলাকার আদি বাসিন্দা নয়। এরা অন্য জায়গা থেকে এসে বসতি গড়েছে। যাহোক, অতীতে ইহুদিরা ছিল চরম নির্যাতনের শিকার। পৃথিবীর যে স্থানেই গিয়েছে সেখানেই তারা নিগ্রহের শিকার হয়েছে। কোথাও তারা স্থায়ীভাবে বাস করতে পারেনি। বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে হয়েছে। তাদেরকে মূলত পশ্চিমা জগতের কাছেই নিগৃহীত হতে হয়েছিল। তত্কালীন রোমান শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার কারণে ইহুদিরা বেশি নিগ্রহের শিকার হয়েছিল। বাইজান্টাইন সম্রাট ইহুদিদের প্রার্থনা করা পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছিল। খ্রিষ্টান জগতের অধিকাংশ দেশে তারা জমি কেনার অধিকার পর্যন্ত হারিয়েছিল। স্পেনে মুসলিম যুগের অবসানের পর ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলা স্পেন থেকে ইহুদিদের বের করে দেন। জার্মানিতে তাদের যানবাহনে চড়াও নিষিদ্ধ করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইহুদিদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য পরিকল্পনা করা হয়, যা দ্য ফাইনাল সল্যুশন নামে পরিচিত। এছাড়া নািস কর্তৃক গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে ইহুদিদের হত্যার ইতিহাস তো আছেই। এবার তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে আসি। যে জাতি যত বেশি নির্যাতিত হয়, তাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তত তীব্র হয়।

ইহুদিদেরও তেমনটা হয়েছিল। তাদের মাথা গোঁজার জায়গা নেই, নিজের মাতৃভূমি নেই—এসব ভাবনায় তাদেরকে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যায়। ইহুদি রাষ্ট্র গড়ার সফল কারিগর ছিলেন থিওডর হারজেল। ইহুদিদের কথা মাথায় রেখে তিনি নীলনকশা প্রণয়ন করেন। প্যালেস্টাইনে জমি কেনার জন্য তার নেতৃত্বে তহবিলও গঠন করা হয়। হারজেলের আগেও ১৮৬০ সালে স্যার মোসেল মন্টেফিয়র জেরুজালেমে ইহুদিদের জন্য ছোটাখাটো বসতি স্থাপনের উদ্যোগ নেন কিন্তু হারজেলের মতো সফল পরিকল্পনা এর আগে হয়নি। তার উদ্যোগের পরই বিচ্ছিন্ন ইহুদিরা প্যালেস্টাইনে গিয়ে বসতি স্থাপনে উদ্যোগী হয়। ১৯০৫ থেকেই স্রোতের মতো ইহুদিরা সেখানে গিয়ে জমি কেনা শুরু করে। আরবরা তখনো নিজেদের আসন্ন বিপদ সম্পর্কে অবগত ছিল না। তারা বিদেশি ইহুদিদের কাছে জমি বেচে দিতে থাকে। ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে তত্কালীন ব্রিটিশ সরকার তাদের পেছনে ছিল। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর ইহুদিদের নেতা ব্যারন রথসচিল্ডকে একটি ঘোষণা প্রেরণ করেন, যেটা বেলফোর ঘোষণা নামে পরিচিত। এই ঘোষণায় বলা হয়, প্যালেস্টিনিয়ান ম্যান্ডেটের মধ্যে ব্রিটেন একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই ঘোষণার পরে বিলম্ব হলেও আরবরা তাদের বিপদ বুঝতে পেরে এর বিরোধিতা করে। এসবের মধ্যেই দলে দলে ইহুদিরা প্যালেস্টাইনে আসতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ নাগাদ প্যালেস্টাইনে এদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ শতাংশে। তত্কালীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জোরালো ভূমিকা পালন করে। তবে পরবর্তী সময়ে ব্রিটেন বুঝতে পারে, বেশিসংখ্যক ইহুদিকে প্যালেস্টাইনে আসতে দিলে গৃহযুদ্ধ হতে পারে। তাই তারা ইহুদি আসা নিয়ন্ত্রণ করতে হোয়াইট পেপার প্রণয়ন করে। এর ফলে ব্রিটিশদের সঙ্গে ইহুদিদের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়। ব্রিটিশ সৈন্যদের ওপর ইহুদিরা হামলাও করে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থ হওয়ার কারণে ব্রিটিশ কর্তৃক বিষয়টি জাতিসংঘে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে আরবদের জন্য দুটি রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়। আরবরা এটা মানতে পারেনি এবং এরই জের ধরে ইহুদি- আরবদের মাঝে দাঙ্গা হয়। ইহুদিদের হাতে ফিলিস্তিনিরা ব্যাপকভাবে মার খায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৪৮ সালের মে মাসে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শেষ হতেই ইহুদি এক নেতা ইসরাইল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়। ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান ইসরাইল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দান করে। পরবর্তী সময়ে অনেক অমুসলিম দেশ তাদেরকে স্বীকৃতি দিতে থাকে।

১৯৪৯ সালের ১১ মে জাতিসংঘের সদস্যপদ পায়। বলে রাখা ভালো, পূর্বে ইহুদিদের একতাবদ্ধ করতে একজনের নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি ডেভিড গ্রিন, যার পরিবর্তিত নাম বেনগুরিয়ন। এই ব্যক্তিই হারিয়ে যাওয়া হিব্রু ভাষাকে পুনরুদ্ধার করেন। যা-ই হোক, নবগঠিত এই রাষ্ট্র তাদের অধিকার পেলেও স্থানীয় আরবদের ভাগ্য নেমে আসে নিগ্রহ, যা আজও চলে আসছে। ইহুদিরা ফিলিস্তিনিদের নিজ ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করতে থাকে, যেভাবে ইহুদিরা পশ্চিমা জগত্ থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। অথচ এই নির্যাতিত ইহুদিদের কাছে সরলমনে জমি বেচে তাদের থাকার জায়গা করে দিয়েছিল। বইয়ে একটা লাইন পড়েছিলাম, যেখানে বলা আছে, ইসরাইলকে দেখলে অনেকের স্পার্টাকান ডিসিপ্লিনের কথা মনে হয়। প্রাচীন নগররাষ্ট্র স্পার্টার সদা যুদ্ধ করার মনোভাব তাদের চিন্তার চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করেছিল। ফলে যতদূর তাদের যাওয়ার কথা ততদূর তারা যেতে পারেনি। ইসরাইল রাষ্ট্রও কি সব সময় প্রতিবেশীর সঙ্গে ঘৃণার চর্চা করে যাবে?

n লেখক :শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন