সরকারের ঋণ ও কর আদায়

প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ড. আর এম দেবনাথ

আমার মনে পড়ে কয়েক বছর আগে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের একজন ঊর্ধ্বতন নেতা এমন কথা বললেন যা শুনে সবাই রীতিমতো স্তম্ভিত। তিনি বললেন, আর কয়েক দিন পরে সরকার তার কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বেতনের টাকা দিতে পারবে না। আমি এর ওপর লিখেছিলাম। ঐ ঘটনার পর কত বছর কেটে গেল, কই, কেউ তো শুনলো না যে সরকার বেতন দিতে পারেনি বা পারছে না! এখন এমন অভিযোগ বা সতর্ক বার্তা নয়। মৃদুভাবে বলা হচ্ছে—সরকারের হাতে টাকা নেই। সরকারের আয় কম, ব্যয় বেশি। সরকার ঋণ করে বেশি সুদ দিয়ে। এর জন্য খরচ বাড়ে। খরচ বেড়েছে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির জন্য। বলা হচ্ছে রাজস্ব ঘাটতি দিয়েই ২০১৯-২০ অর্থবছর শুরু হয়েছে। আবার রাজস্ব আহরণে শ্লথ গতি দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই বিশাল বাজেট তা হলে কীভাবে বাস্তবায়িত হবে। কেউ কেউ বলছেন, টাকার টানাটানির জন্যই সরকার স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে দুই লক্ষাধিক উদ্বৃত্ত টাকা নিজের হাতে নিয়ে আসবে। কারণ তারা ঐ টাকা অব্যবহূত হিসাবে রেখে দিয়েছে। আবার আরেক পক্ষ বলছে টাকার টানাটানির জন্য অর্থমন্ত্রী পুনঃবীমা দেশের বাইরে করতে দেবেন না। এর ফলে অনেক টাকা বেঁচে যাবে।

প্রথম কথা আয় কম, ব্যয় বেশি। বলা বাহুল্য, এটা তো বাংলাদেশের জন্য বরাবরের ঘটনা। সব বাজেটই আমাদের ঘাটতি বাজেট। প্রতিবেশী বিশাল অর্থনীতির দেশ ভারতের বাজেটও ঘাটতি বাজেট। আশপাশের সব দেশের বাজেটই ঘাটতি বাজেট। অর্থাত্ সবারই আয় কম, ব্যয় বেশি। এখানে প্রশ্ন দুটো—ব্যয়টা ন্যায্য ব্যয়, না অহেতুক ব্যয়। ব্যয়টা কি ঘি খাওয়ার জন্য, নাকি সরকারের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য। বলা বাহুল্য, দুটোর একটিও নয়। দ্বিতীয় কথা ঘাটতিটি কি সহনশীল পর্যায়ে নাকি সহ্যসীমার বাইরে। দেখা যাচ্ছে কোনো বছরই আমাদের ঘাটতি ৫ শতাংশের বেশি নয়। কখনো কখনো কমও হয়েছে। আমাদের খরচ বাড়ছে আর সেভাবে হচ্ছে না—এটা সত্য। সম্ভাব্য করদাতারা কর দিতে চান না। দেশের শ্রেষ্ঠ ধনীদের তালিকা দেখলে হাসি পায়। মাত্র সোয়া ২ কোটি টাকার ওপরে সম্পদ আছে এমন বাংলাদেশির সংখ্যা মাত্র ১৩ হাজার (২০১৭-১৮ অর্থবছর)। আর ২০১৩-১৪ করবছরে ১০০ কোটি টাকার নিট সম্পদ ছিল মাত্র ২৫ জনের। ৫০ কোটি টাকার বেশি নিট সম্পদের মালিক ছিলেন মাত্র ৪৭ জন। এই হাস্যকর পরিস্থিতিতে বলা বাহুল্য, সরকারের কর আদায় মূলত বেতনভুক্ত কর্মচারীদের কাছ থেকে আর কিছু সংখ্যক বড়ো কোম্পানি এবং ব্যাংক থেকে। যে দেশে ৪ কোটি লোকের মতো মধ্যবিত্ত আছে সেখানে কর আদায়ের এই পরিস্থিতিতে সরকারকে ঋণ করা ছাড়া গতি কী? সরকার ঋণ করছে দেখাই যাচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য। বড়ো বড়ো প্রকল্প সরকারের সঙ্গে। ব্যয় বেশ কিছুটা বেড়েছে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোতে। আর কিছুটা খরচ বেড়েছে সুদ খাতে। অবশ্য জিডিপি অনুপাতে এমনকি মোট খরচের অনুপাতে সুদব্যয় আহামরি কিছু বাড়েনি। ঘাটতি বাজেট ৫ শতাংশে সীমিত রেখে সরকার যদি উন্নয়ন বাজেটের জন্য টাকা জোগাড় করে বিভিন্নভাবে, তাহলে আপত্তি কী। স্পষ্টই ঘাটতি বাজেটের টাকা জোগাড় কয়েকটি সূত্রে হয়। দেশের ভেতরে সরকার মানুষের কাছ থেকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ঋণ নিতে পারে। ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিতে পারে। বিদেশ থেকে ঋণ নিতে পারে। আরেকটি উেসর কথা আমরা অনেকেই জানি না। সরকার প্রয়োজনবোধে ‘নোট’ না ছেপে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ‘ওয়েজ অ্যান্ড মিনস’ নামীয় খাত থেকে অস্থায়ীভাবে ঋণ নিতে পারে। তবে অবশ্যই নোট ছেপে নয়। এ কাজ সরকার এখনো করেনি। এবার দেখা যাচ্ছে, সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ কম নেওয়া হচ্ছে। ঋণ নেওয়া হচ্ছে ব্যাংক থেকে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে ব্যাংকের লাভ, সরকারেরও লাভ। সরকার কম সুদে ঋণ পায়। আর ব্যাংক সরকারকে ঋণ দিলে ঋণ খেলাপি হয় না। ব্যাংক বেঁচে যায়। তবে কথা থাকে ব্যবসায়ীদের নিয়ে। তারা বলেন তারা ঋণ পান না। সরকার ঋণ নিয়ে নিলে তাদের ঋণে টানাটানি পড়ে। একথা সত্য নয়। কারণ প্রাইভেট ক্রেডিট বেসরকারি ব্যবসায়ীরা বিগত কয়েক বছরে অনেক বেশি নিয়ে নিয়েছেন। এতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছে। এসব ঋণ এখন এডজাস্ট করা দরকার। এর চেষ্টাই হচ্ছে। এতে আমি মনে করি না ব্যবসায়ীদের ঋণের অভাব হবে। আবার অনেক ব্যবসায়ীই বিদেশ থেকে ‘সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট’ নিয়ে দেশীয় ব্যাংকের বোঝা কমাচ্ছেন। এমতাবস্থায় কি ব্যবসায়ীদের কি সরকারের ঋণ পেতে অসুবিধা হবে বলে মনে হয় না।

জুলাই-আগস্ট মাসের রাজস্ব আহরণের গতি শ্লথ দেখে অনেকেই আতঙ্কিত; কিন্তু এটা সবারই জানা, অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব আদায়ের গতি কমই হয়। বছর যেতে যেতে ধীরে ধীরে সেই গতি বৃদ্ধি পায়। আর গেল অর্থবছরে যে বড়ো রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে এর অন্যতম কারণ কর রেয়াত সুবিধা। বিভিন্ন খাতে রাজস্ব বোর্ড কর রেয়াত দেওয়াতে ঘাটতি বেড়েছে। যতটুকু জানি, এবার এই সমস্যা নেই বা অনেক কম। অতএব রাজস্ব বৃদ্ধির গতি গিয়ে ‘অ্যালার্ম’ বাজানোর কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। বর্তমান অর্থমন্ত্রী একজন সফল চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেট। একারণেই তিনি রাজস্ব কোথায় লুকিয়ে আছে, টাকা কোথায় অব্যবহূত হিসেবে পড়ে আছে, পরিহারযোগ্য রাজস্ব খরচ কোথায় কমানো যায় ইত্যাদি তার জানা। পথঘাট জানা। আমার মনে হয়, এ করণেই তিনি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তাদের উদ্বৃত্ত টাকা সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসছেন। আসল কথা হচ্ছে, এই টাকা খরচের যেমন দক্ষতা তাদের নেই তেমনি কোনো ‘অথরিটিও’ নেই। টাকা খরচের জন্য প্রকল্প বানাতে হবে। সরকারের কাছে আসতে হবে। তাদের নাম স্বায়ওশাসিত  কাগজেকলমে। অতএব তাদের উদ্বৃত টাকা নিয়ে এলে কোনো সংকট হবে না। সরকার যদি কম আয়াসে এতগুলো টাকা এনে উন্নয়নের কাজে লাগাতে পারে তা হলে অসুবিধা কোথায়? এতে ব্যাংকাররা যে কথা তুলেছেন তার কোনো ভিত্তি আছে বলে মনে হয় না। অর্থমন্ত্রী তো বলেইছেন—উদ্বৃত্ত টাকা ‘ক্যাশ’ তোলাই হবে না। এটাই নিতান্তই অ্যাকাউন্টিং ডেবিট ও ক্রেডিট। টাকা ব্যাংকেই থেকে যাবে। সেখান থেকে সরকার খরচ করবে উন্নয়ন প্রকল্পে। আবার প্রকল্পে ব্যয়করা টাকা যা ব্যবসায়ীরা পাবে তা পরিণামে আবার ব্যাংককেই ফেরত আসবে। এসবই ডেবিট-ক্রেডিট। এক অ্যাকাউন্ট থেকে আরেক অ্যাকাউন্টে যাওয়ামাত্র। এমতাবস্থায় এই বিষয় নিয়ে বড়ো রকমের আপত্তি করার কিছু নেই। তবে সরকারি খরচের গুণমান নিয়ে যে কথাবার্তা হয় এর দিকে আমাদের নজর দিতেই হবে। কারণ স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, এক টাকার কাজ দুই টাকায় হচ্ছে। গত মাসখানেকের মধ্যে বালিশ, পর্দা ইত্যাদির ওপর যেসব খবর ছাপা হয়েছে তা রীতিমতো রোমহর্ষক। এদিকে অর্থমন্ত্রীকে নজর দিতে হবে। স্কুল নেই ‘এমপিও’ হচ্ছে, স্কুল বিল্ডিং পাঁচ-ছয় বছরও টেকে না, জেলাখানার কয়দির খাবার বাইরে বিক্রি হয়। হাসপাতালের রোগীদের খাবার মিলে না—এসবের সমাধান দরকার। এর প্রতি নজর দিতে পারলে সরকারি ব্যয় অনেক কমবে। অনেক কম টাকায় বেশি কাজ করা যাবে। ঘাটতি কমবে। টাকার টানাটানি কমবে। আরো কমবে যদি আমরা ধনীদের ‘ট্যাক্স’ করতে পরি যা এখন আইএমএফও চায়। তারা বলছে, ধনীদের ট্যাক্স না করলে উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই হবে না। ভ্যাট ফাঁকি বন্ধ করা, বন্ডেড ওয়ারহাউজের মাল বাইরে বিক্রি বন্ধ করা, বড়ো বড়ো কোম্পানির কর ফাঁকি বন্ধ করা বহুজাতিক সংস্থাকে যথাযথভাবে ট্যাক্স করা ইত্যাদি এখন ফরজ কাজ। কাগজে দেখলাম অর্থমন্ত্রী আরেকটা চুক্তি করেছেন। প্রতি বছর ‘রি-ইনসিওরেন্সের’ নামে প্রচুর টাকা দেশের বাইরে চলে যায়। এটা দলীয়ভাবে করলে এখানে প্রচুর টাকা সাশ্রয় হয়। আমি এর সঙ্গে একমত। ব্যাংকে বিমার ব্যবস্থা আছে। ‘ভোল্টের’ বিমা, ক্যাশ কাউন্টারের বিমা, ক্যাশ-ইন-ট্র্যানজিটের বিমা ইত্যাদি। এসব খাতে অনেক টাকা যায়; কিন্তু এসবে দুর্ঘটনা কয়টা ঘটে। হিসাব করলে দেখা যাবে, বিমা না করলেই বরং লাভ। ১৯৭২ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ব্যাংকের ক্যাশ থেকে টাকা লুট, কাউন্টার থেকে ক্যাশ লুট অথবা ক্যাশ-ইন-ট্র্যানজিটে টাকা লুটের ঘটনা কয়টা ঘটেছে। এভাবে বিচার করলে দেখা যাবে ‘রি-ইনসিওরেন্সের’ ক্ষেত্রেও অনেক বিবেচ্য বিষয় আছে।

পরিশেষে বলতে চাই, সরকারের টাকার টানাটানির খবরে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু আছে বলে মনে হয় না। সরকার একটা সার্বভৌম সত্তা। তার টাকার অভাব হবে না। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তার হাতে ৯০ হাজার কোটি টাকা এখনই আছে। আতঙ্কিত হব তখনই, যখন নোট ছেপে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে।

তবে অবশ্যই করের ক্ষেত্রে গরীব ও মধ্যবিত্তের বোঝা কমানো দরকার। ধরা দরকার বড়োলোকদের যাদের ট্যাক্স দেওয়ার ক্ষমতা আছে। দ্বিতীয়ত খরচের ক্ষেত্রে গুণমান বাড়াতে হবে। জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এসবে কোনো খাতির করা ঠিক হবে না।

n লেখক :অর্থনীতিবিদ