ঢাকা সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬
৩৩ °সে


ইরানের পরমাণু কার্যক্রম ঘিরে অনিশ্চয়তা

ইরানের পরমাণু কার্যক্রম  ঘিরে অনিশ্চয়তা

হাসান জাবির

ইসলামি রিপাবলিক ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত একটি সামগ্রিক সমঝোতা চুক্তি হচ্ছে ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেন্সিভ প্লান অফ একশন’। ২০১৫ সালের জুলাই মাসে বিশ্বের শক্তিশালী ছয় দেশ ও ইরানের মধ্যে চুক্তিটি সম্পাদিত হয়। মূলত ইরানের সম্প্রসারণশীল পরমাণু প্রকল্পের লাগাম টেনে ধরাই ছিল এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য। উল্লেখ্য যে, ঐ সময়ের মধ্যে পরমাণু গবেষণায় ইরানের ব্যাপক বৈজ্ঞানিক, কারিগরি সাফল্যের প্রতিফলন প্রত্যক্ষ করে বিশ্ব। ঐ প্রেক্ষিতে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক উত্কণ্ঠার অবসান করেছিল এই চুক্তি। যে প্রক্রিয়ায় সাময়িকভাবে মন্থর হয়েছিল তেহরানের পারমাণবিক প্রকল্পের গতি। একইসঙ্গে ঘটনাটি পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ সংক্রান্ত অন্যান্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগসমূহকে নতুন করে গতিশীল করেছিল। এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। কিন্তু ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেন্সিভ প্লান অফ একশন’ স্বাক্ষরিত হওয়ার মাত্র তিন বছরের মাথায় আমেরিকা চুক্তি থেকে সরে যায়। ২০১৮ সালের ৯ মে হোয়াইট হাউজের এমন সিদ্ধান্ত চুক্তির ভবিষ্যত্ নিয়ে এক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। ফলে ভঙ্গুর চুক্তিটির অন্যান্য পক্ষ ফ্রান্স, জার্মানি, বৃটেন, রাশিয়া ও চীন এ চুক্তি বাঁচানোর চেষ্টা করেন। এছাড়াও চুক্তিতে সম্পৃক্ত নয় এমন কিছু ইউরোপীয় দেশসহ বেশিরভাগ দেশ এই স্থিতাবস্থা ধরে রাখার পক্ষে অবস্থান নেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চুক্তিতে ফিরে আসেনি আমেরিকা। ফলশ্রুতিতে চুক্তি টিকিয়ে রাখার অন্যান্য প্রচেষ্টাও খুব বেশিদূর অগ্রসর হয়নি। এ ধরনের অচলাবস্থার মধ্যেই গত ১০ মে থেকে ইরানও চুক্তির কিছু ধারা লঙ্ঘন করার অভিপ্রায় ইউরোপকে অবহিত করে। এক পর্যায়ে ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেন্সিভ প্লান অফ একশন’ চুক্তির ৩৬ নম্বর ধারার ভিত্তিতে তেহরান নিজের পারমাণবিক কার্যক্রম ২০১৫ সালের পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে উদ্যত হয়। সর্বশেষ দেশটি উন্নত সেন্ট্রিফিউজ স্থাপন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধায়নের মাত্রা, ইউরেনিয়াম মজুত সবকিছুতেই চুক্তির নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। এই তথ্য নিশ্চিত করেন জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক ‘আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা’। ঐ সংস্থার ১৬তম ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—ইরান চুক্তিতে নির্ধারিত ২০১ কেজির বেশি অর্থাত্ ২৪১ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করেছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধায়নের নির্ধারিত মাত্রা ৩ পয়েন্ট ৬৭ অতিক্রম করে ৪ পয়েন্ট ৮৭তে উন্নীত করেছে। একইসঙ্গে এডভান্সড সেন্ট্রিফিউজ মেশিন ২০০ আইআর ৪এস এবং আইআর-৬এস দেশটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু কেন্দ্র “নাতাঞ্জে” স্থাপন করার সত্যতা নিশ্চিত করেছে আইএইএ। এক্ষেত্রেও চুক্তির শর্ত মানা হয়নি। চুক্তির বয়স আট বছর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত ইরানের আইআর-৬এস ও ৮এস ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। ইতিমধ্যে আইএইএর পরিচালনা পরিষদের চলমান বৈঠকেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যেখানে ইরানের ৩য় ধাপের “রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচির” বিষয়টি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এদিকে ‘রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’ সংক্রান্ত বিতর্কে ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন রাশিয়া। সম্প্রতি দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে আইএইএর সম্পূর্ণ নজরদারির মধ্যে থাকা ইরানের ‘রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’ নিরস্ত্রীকরণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি এনপিটি বা নিউক্লিয়ার পলিফারেশন ট্রিটির ব্যত্যয় করবে না। অবশ্য এর আগে এবং ২০১৫ সালের পর আইএইএ ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত মোট ১৫টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পূর্বের ১৫টি প্রতিবেদনেই আইএইএ স্বীকার করেছিল যে- ইরান চুক্তি মেনে তাদেরকে সবধরনের সহযোগিতা করছে। কিন্তু সর্বশেষ প্রতিবেদনে ইরানের চুক্তি লঙ্ঘনের স্বীকারোক্তি দেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের পরমাণু কার্যক্রম ঘিরে নানান ধরনের অনিশ্চয়তার অবতারণা হয়েছে।

পঞ্চাশের দশকে ‘এটম ফর পিচ’ শীর্ষক ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের সূচনা ঘটে। সেই সময়ের মার্কিন মিত্র ‘শাহ’ শাসিত ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বেড়ে উঠে আমেরিকা ইউরোপের সহযোগিতায়। কিন্তু ১৯৭৯ সালে রেজা শাহের পতন উত্তর ইসলামী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইরান পশ্চিমা সম্পর্ক সর্বোচ্চ খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়ে। এসময় আমেরিকা ও ইউরোপ ইরানের পরমাণু প্রকল্পে সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করেন। এতে করে অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে দেশটির পারমাণবিক কার্যক্রম। অন্যদিকে নব্বই দশক থেকে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক সহযোগিতার বিস্তৃত হতে থাকে। এই ধারাবাহিকতায় ক্রমশ উজ্জীবিত হয় দেশটির পরমাণু প্রকল্প। সর্বশেষ ২০১২ সালে বুশেহর”কে একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মক্ষম পারমাণবিক প্লান্ট হিসেবে ঘোষণা করেন রাশিয়া। ঐ সময়ের মধ্যে তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধায়নের মাত্রা নিয়ে সংশায়িত হয়ে পড়েন আন্তর্জাতিক বিশ্ব, বিশেষত আমেরিকা। এ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে সরব আমেরিকা ও তার মিত্রদের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই প্রেক্ষিতে দেশটির সব ধরনের সক্ষমতা থামিয়ে দিতে আমেরিকা বেশ কয়েকবার ইরানে সামরিক হামলার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু ইরানের শক্তি সক্ষমতা সংক্রান্ত ভিন্ন কৌশল আমেরিকার পরিকল্পনাকে বারবার ভণ্ডুল করে দেয়। এমন অবস্থায় ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধায়ন মাত্রা সামরিক ব্যবহার উপযোগী হওয়ার নিশ্চিত আশঙ্কার মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক আলোচনার পর ২০১৫ সালে সম্পাদিত হয় ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেন্সিভ প্লান অফ একশন। যে প্রক্রিয়ায় দেশটির পরমাণু প্রকল্পের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর ধারাবাহিক উত্কণ্ঠা দুটিই হ্রাস পেয়েছিল। কিন্তু চুক্তিবিহীন বর্তমান বাস্তবতা আবারও পূর্বেকার অনিশ্চয়তা উত্তেজনা ফিরে আসার আভাস দিচ্ছে। ফলে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম ঘিরে উদ্বেক-উত্কণ্ঠা বাড়ছেই। এই অবস্থার মধ্যেই সম্প্রতি তেহরান সফরে এসেছিলেন আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার ভারপ্রাপ্ত প্রধান কর্নেল ফেরুতা। এসময় তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আণবিক শক্তি সংস্থার প্রধানসহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলিত হন। একই সঙ্গে ঘুরে দেখেন দেশটির বিভিন্ন পারমাণবিক প্লান্ট। অন্যদিকে ফেরুতার তেহরান সফরের প্রাক্কালে দেশটির বেশ কয়েকটি সামরিক স্থাপনা পরিদর্শনের দাবি ওঠে। এ ব্যাপারে ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেন্সিভ প্লান অফ একশন’ চুক্তির ‘সেকশন টি’র ব্যাখ্যা নিয়ে দেখা দেয় বিতর্ক। ‘সেকশন টি’র আওতায় শুধু ইরানের পরমাণু অস্ত্র উত্পাদন সম্পর্কিত বিষয়াবলি অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে দেশটির প্রচলিত সামরিক প্রযুক্তি সংগ্রহ, অস্ত্র উত্পাদন, মজুত, গবেষণার বিষয়াবলি সংশ্লিষ্ট নয় বলে মত দিয়েছেন মস্কো। এতে করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমা উত্কণ্ঠার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

২০১৫ সালের আগেই ইরান সামরিক ব্যবহার উপযোগী ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধায়নের সক্ষমতা অর্জন করেছিল বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। যদিও তেহরানের দাবি তারা কখনই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। এতদসত্ত্বেও ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেক-উত্কণ্ঠা আমেরিকা ও পশ্চিমা মিত্রদের। তারা সবসময় এক ধরনের সন্দেহের মধ্যে থেকে দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এ পর্যায়ে ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেন্সিভ প্লান অফ একশন’ উভয়পক্ষের জন্যই সন্তোষজনক অবস্থার সৃষ্টি করে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা ফেরায়। কিন্তু আমেরিকা হঠাত্ করে এই চুক্তি থেকে সরে যাওয়ায় আইনি শৈথিল্যের সুযোগ নিচ্ছে তেহরান। সাম্প্রতিক সময়ে এই ইস্যুতে তেহরানের যাবতীয় পদক্ষেপসমূহের প্রতি দৃঢ় সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন রাশিয়া ও চীন। যদিও ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থানও চুক্তি টিকিয়ে রাখার পক্ষেই। কিন্তু এখন পর্যন্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূমিকায় আমেরিকা ইরান কেউই সন্তুষ্ট নয়। এক্ষেত্রে ফরাসি প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু এগুলো কোনোটাই তেমন কার্যকর নয়। চুক্তি টিকিয়ে রেখে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার এ সংক্রান্ত মতপার্থক্য কমে আসার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। যে কারণে ইউরোপীয় উদ্যোগসমূহকে নিছক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবেই গণ্য করা যায়। কিন্তু এমন অবস্থা চলতে থাকলে কী হবে? সত্যি সত্যি চুক্তির অপমৃত্যু নিশ্চিত হলে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের উপায় কী? তাহলে অনিয়ন্ত্রিত ইরান কি তার ইচ্ছেমতো চলবে? আপাতদৃষ্টিতে এই প্রশ্নগুলোর যুক্তিসঙ্গত উত্তর নেই। যে কারণে এক ধরনের ভয় সংশয়ের অবতারণা হচ্ছে। তাহলে কি ইরান পরমাণু বোমা বানিয়েই ফেলবে আর আমেরিকা তা বসে বসে দেখবে? আসলে ব্যাপারটি ঘিরে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের উত্তেজনা। যে প্রক্রিয়ায় ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে ক্রমশ যুক্ত হচ্ছে ভিন্নমাত্রার অনিশ্চয়তা।

n লেখক :আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৪ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন