ঢাকা শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬
২৭ °সে


ঢাকা :নাগরিক যন্ত্রণা ও দুর্ভোগের শহর

ঢাকা :নাগরিক যন্ত্রণা ও দুর্ভোগের শহর

মাহমুদুর রহমান সুমন

৪০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী এই শহরে এখন জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি। জনসংখ্যার প্রচণ্ড চাপে শহরের অবস্থা ত্রাহি মধুসূদন। এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, দেশের গরিব মানুষদের এক-তৃতীয়াংশ বাস করে ঢাকায়। সংগত কারণেই তাদের বাসস্থান-সমস্যা প্রবল। বস্তির সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান। নিত্যদিনই মানুষের ভিড় বেড়ে চলেছে। সে তুলনায় অবকাঠামো বৃদ্ধির কোনো উদ্যোগ আয়োজন চোখে পড়ে না। ফলে, শহর তো বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বেই। এটা সহজ-সরল একটি হিসাব। আবর্জনার স্তূপে রাস্তাঘাট নোংরা, অপরিচ্ছন্ন। সড়কের বেহাল দশা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কহতব্য নয়। দুঃসহ যানজট আরো তীব্রতর হয়ে উঠেছে এর কারণে। জনচাপ বাড়ছে দিনকে দিন। রাস্তা কি বাড়ছে? না। তাহলে? যা হওয়ার, তা-ই হচ্ছে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণের প্রচণ্ডতাও ক্রমবর্ধমান। আর রাজধানী ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দূষিত বায়ুর শহর। ঢাকার রাস্তার ধুলায় সর্বোচ্চ মাত্রায় সিসা, ক্যাডমিয়াম, দস্তা, ক্রোমিয়াম, নিকেল, আর্সেনিক, ম্যাঙ্গানিজ ও কপারের উপস্থিতি আছে। দেশের বাতাসে দূষণ প্রতিদিনই বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ কাজ, তীব্র যানজট, মেয়াদোত্তীর্ণ মোটরযান ও শিল্পকারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত ভারী ধাতু ধুলার সঙ্গে যোগ হচ্ছে। এই দূষণের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে মাত্রাতিরিক্ত ধুলা। নগরের বিভিন্ন স্থানে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে এই ধুলা হয়ে উঠেছে নিত্যসঙ্গী। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ঐ প্রতিবেদন বলেছে, বায়ুতে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক উপাদান হচ্ছে পিএম ২.৫। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। আর বায়ুদূষণের কারণে শিশুমৃত্যুর হারের দিক থেকে পাকিস্তানের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। বিশ্বে যেসব কারণে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, তার মধ্যে বায়ুদূষণ রয়েছে পঞ্চম স্থানে। পুরো ঢাকা শহরই এখন শব্দদূষণের শিকার। শহরের প্রায় সব এলাকাতেই শব্দ গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি। এ অবস্থা চলতে থাকলে ঢাকার এক-তৃতীয়াংশ মানুষের শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ঢাকায় সাধারণভাবে যানবাহন ও হর্ণের শব্দই শব্দদূষণের মূল কারণ। সিটি করপোরেশন ভেঙে দুইখানা করা হয়েছে। এর কী সুফল পাচ্ছেন নগরবাসী? নগরকর্তারাই এ প্রশ্নের উত্তর ভালো দিতে পারবেন। ক্লিন ঢাকা, তিলোত্তমা ঢাকা নানা ধরনের ফোলানো-ফাঁপানো আমরা শুনে আসছি। কিন্তু কোথায় কী? সমস্যা যে তিমিরে ছিল রয়ে যাচ্ছে সেই তিমিরেই।

ঢাকা যে বহুমাত্রিক সমস্যায় কণ্টকিত, জর্জরিত, সেটা থেকে বের হয়ে আসার জন্য বাস্তবোচিত, কার্যকর, সময়োপযোগী, আন্তরিক, সমন্বিত কোনো উদ্যোগ নেই। সিটি গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা প্রবর্তনের জোরালো দাবি উঠেছিল। নীতিগতভাবে সমর্থনও পেয়েছিল সেই কনসেপ্ট। উত্তর সিটিতে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপের সুফল নগরবাসী পেতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তার অকালমৃত্যুর পর সেসব প্রকল্প মনে হয় মুখ থুবড়ে পড়েছে। ঐ স্বপ্নের প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়া তো দূরের কথা, কোনোমতে বহাল রাখাই যেন দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা দেখেছি, এত বাধা এত বিপত্তি, এত প্রতিকূলতা তার মধ্যেও জনবান্ধব কাজ করতে পারা সম্ভব, যদি অঙ্গীকার, একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা থাকে। ঢাকার যানজট ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। গভীর রাতেও যানজট লেগে থাকে। ছুটিছাটার দিনেও কোনো রেহাই নেই। সড়ক দুর্ঘটনার হারও বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। কেউ ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকলেও তার জীবনের নিরাপত্তা নেই। যে কোনো সময় যে কোনো গাড়ির তলায় পড়ে পৈতৃক প্রাণটা বেঘোরে হারাতে হতে পারে। এরকম ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে এরই মধ্যে। এই শহরে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের হিসেবমতে ঢাকা শহরে সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষ মারা যায়, তার প্রায় সবাই পথচারী। স্বামী-সন্তান, মা-বাবা হারানো একেকটি মানবের নির্মম মানবতার সাক্ষী হয়ে আছে বাসচাপা সড়ক দুর্ঘটনা। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসেবে, ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ৭ হাজার ২২১ জন নিহত হয়। আহত ১৫ হাজার ৪৬৬ জন। ফুটপাত দিয়ে পথচারীরা যে নিরাপদে নির্বিঘ্নে হাঁটবেন, তার জো নেই। আর রাস্তার দুই ধার দিয়ে চলেছে ঝুঁকি নিয়ে শত শত পথচারী। কেননা ফুটপাত সেখানে থেকেও নেই। প্রশাসনের কর্তাদের উেকাচ দিয়ে অবৈধ দখলদারদের দখলে ঢাকার ফুটপাত। ফুটপাত যেখানে থাকার কথা, সেখানে দোকান বা দোকানের এক্সটেনশনে পরিণত হয়, অনেক জায়গায় গাড়ি পার্ক করে রাখা আর নির্মাণসামগ্রী তো আছেই। এতে করে পথচারীদের বিপদে পড়তে হয়। হকাররা ফুটপাত দখল করে রাখে। গাড়ির চালকরাও বেপরোয়া, কারণ তাদের নেই সঠিক প্রশিক্ষণ। ঘুষ দিয়ে পাওয়া যায় ড্রাইভিং লাইসেন্স। পরিবহন-ব্যবস্থায় নৈরাজ্য দুর্ভোগ যেন বিধিলিপি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণপরিবহন খাতের ভয়ানক বিশৃঙ্খলা দেখার কেউ নেই? ঢাকায় বাসের সংখ্যাও অসংখ্য, যার অনেকগুলিই ফিটনেসবিহীন। বাসে দাঁড়ানোর জায়গা পর্যন্ত হয় না। সিএনজিচালিত অটোওয়ালাদের কোনোভাবেই বাগে আনতে পারে না কর্তৃপক্ষ। চড়া মাশুল গুনতে হয় যাত্রীদের। চালকের খেয়ালখুশির কাছে থাকতে হয় জিম্মি। যে কোনো গন্তব্যে যেতে বাধ্য থাকলেও এই নিয়ম নিতান্তই কাগুজে। বাস্তবের সঙ্গে কোনো মিল নেই। কোনো তদারকি, শাস্তি বিধানের ঘটনা চোখে পড়ে না।

যানজট দেশকে, দেশের অর্থনীতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে অগণন কর্মঘণ্টা। প্রতি বছর ২ থেকে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার জন্য দায়ী করা হয় এই ভয়াবহ যানজটকে। অধৈর্য মোটরসাইকেলওয়ালারা ফুটপাত দিয়েই গন্তব্যে পৌঁছানোর কোশেশ করে থাকেন। উচ্চ আদালতের রায় ছিল যে ফুটপাত দিয়ে মোটরসাইকেল চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ। এই রায় কার্যকর করার ব্যাপারে পুলিশ কতটা তত্পর, তা ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন। হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন তারা। ঢাকায় বসবাসের কড়া মাশুল গুনতে হচ্ছে সবাইকে। ভিআইপিদের চলাচল সর্বদাই নির্বিঘ্নে থাকে। ভিভিআইপিদের তো কথাই নেই। সুতরাং তাদের পক্ষে আমজনতার কষ্ট লানত বোঝা সম্ভবপর নয়। বুঝিবে সে কিসে কি যাতনা বিষে কভু আশীবিষে দংশেনি যারে...

গত ২০১৪ সালে যে বস্তি শুমারি হয়েছিল, তাতে দেখা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মোট বস্তি রয়েছে ৩ হাজার ৩৯৪টি। সেখানে মোট ঘরের সংখ্যা ১ লাখ ৭৫ হাজারের মতো। পাঁচ বছর পরে পরিস্থিতির ভয়াবহতা ঠিক কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তা অনুমান করাও ভীষণ শক্ত কাজ। ঐ জরিপ অনুযায়ী সেই সময় বস্তির বাসিন্দা ছিলেন সাড়ে ৬ লাখ লোক। অর্ধেকের বেশি বস্তির অবস্থান ছিল সরকারি জমিতে। বস্তিতে ভাড়া থাকতেন ৬৫ শতাংশ মানুষ। তবে এই জরিপ বা শুমারির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে অনেক কথা, অনেক তর্কবিতর্ক রয়েছে। বিপুলসংখ্যক বস্তিবাসীকে হিসাবের বাইরে রেখে, তাদের সংখ্যা চাহিদা না জেনে কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন যে নিতান্ত অবিবেচনার কাজ।

n লেখক :গবেষক ও কলামিস্ট

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৯ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন