ঢাকা সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬
৩৩ °সে


ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের এক যুগ পেরিয়ে বাংলাদেশ

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের এক যুগ পেরিয়ে বাংলাদেশ

প্রান্ত বনিক

বিগত চার দশকে ল্যাতিন আমেরিকা এবং এশিয়ার বেশ কিছু দেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক মুনাফার সুবিধা ভোগ করে আসছে। জাপান এবং চীন তাদের দেশে আশির দশকে শুরু হওয়া ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই উন্নত বিশ্বের কাতারে নিজেদের নাম লিখিয়েছে। তাই সম্ভবত আমাদের মধ্যে এক হতবুদ্ধিকর ধারণার জন্ম নিয়েছে যে, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে অবস্থানকারী কোনো দেশের উন্নয়ন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই হয়ে থাকে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ২০০৭ সালে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে প্রবেশ করলেও আজ ২০১৯ সাল পর্যন্ত অর্থাত্ এক যুগ পেরিয়েও ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারার ফলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হয়নি।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক মুনাফা বলতে, কোনো দেশের জন্মহার কমে যাওয়ার ফলে নির্ভরশীল জনসংখ্যার তুলনায় কর্মক্ষম জনসংখ্যার আধিক্যকে বোঝায়। যখন এই কর্মক্ষম জনসংখ্যা (১৫-৬৪ বছর) দেশের মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বেশি থাকে, তখন ঐ দেশ জনসংখ্যাতাত্ত্বিক মুনাফায় অবস্থান করছে বলে ধরা হয়। ইউএনএফপিএ-এর ‘স্টেট অফ ওয়ার্ল্ড পপুলেশন ২০১৯’ প্রতিবেদন অনুসারে বর্তমানে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৬৮ শতাংশ কর্মক্ষম যা কি না ২০০৭ সালে ছিল ৬১.৪ শতাংশ। এই এক যুগে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়েনি কর্মসংস্থানের সংখ্যা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০০৭ সালে বেকারত্বের হার ছিল ৩.৭৭ শতাংশ যা বর্তমানে এসে দাঁড়িয়েছে ৪.৩১ শতাংশে অর্থাত্ প্রায় ৩০ লাখ মানুষ কর্মহীন। এত বড়ো সংখ্যক জনগোষ্ঠী অব্যবহূত থাকার কারণেই আমরা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক মুনাফার শতভাগ কাজে লাগাতে পারছি না।

মূলত একটি দেশকে, জনসংখ্যাতাত্ত্বিক মুনাফায় প্রবেশের পূর্বে থেকেই সম্ভাব্য অধিক কর্মক্ষম মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিতের লক্ষ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয়। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের অদূরদর্শিতা এবং ২০০৭ সালের পূর্বে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থার ফলে পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। যার ফলে বর্তমান সময়ে এসে অধিক কর্মসংস্থানের চাহিদা মেটাতে আমাদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।

যেখানে সিঙ্গাপুর, জাপান জনসংখ্যাতাত্ত্বিক মুনাফায় প্রবেশের সময় থেকে দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর জোর দিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বাজেটের প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ ব্যয় করে সেখানে বাংলাদেশের বিগত ১০ বছরের বাজেটের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ১৮-২০ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করেছে। এই দুই খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকার কারণে কর্মক্ষম শিক্ষিত এবং দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। এই অদক্ষতার নেতিবাচকতা প্রবাসী জনগোষ্ঠীদের দিকে লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়। প্রায় ১ কোটি মানবসম্পদ রপ্তানি করে এই বছরে বাংলাদেশের রেমিটেন্স আয় কেবলমাত্র ১ হাজার ৬০৩ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার (১৬.০৩ বিলিয়ন) যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত একইসংখ্যক মানবসম্পদ রপ্তানি করে আয় করছে ৭ হাজার ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার (৭.৯ বিলিয়ন)।

বিগত বছরগুলোর তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগের হার বাড়লেও অধিক কর্মক্ষম মানুষের যথেষ্ট কর্মক্ষেত্র সৃষ্টিতে তা পর্যাপ্ত নয়। মুক্ত বাণিজ্যের সময়ে অবস্থান করেও বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশীয় বাধা, দেশের অভ্যন্তরে সুশাসনের অভাব এবং দুর্নীতি সব মিলিয়ে বিনিয়োগের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিনিয়োগের উত্তম স্থান হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯০ দেশের মধ্যে ১৭৭তম।

কার্যকরী এবং সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। প্রথমত, দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে ২০ শতাংশ করতে হবে। কারিগরি শিক্ষার প্রতি আমাদের যে অনীহা তৈরি হয়েছে তা দূর করতে প্রণোদনামূলক কারিগরি শিক্ষার প্রচলন করা যেতে পারে। যুব উন্নয়ন কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়ে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতে হবে। সর্বোপরি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারের দিকে লক্ষ্য রেখে উপযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের শ্রমিকদের উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য তাদের স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দিতে হবে। স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে শ্রমিকদের পুষ্টিহীনতা দূর করতে এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। তৃতীয়ত, কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সম্পদের যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং আত্মকর্মসংস্থানে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে মূলধন সরবরাহ করা এবং প্রয়োজনে ভর্তুকি প্রদান করতে হবে। বেসরকারি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি রোধে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতকল্পে উপযুক্ত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

সর্বোপরি, মানুষকে সঞ্চয়ে আগ্রহী করতে হবে, কেননা ২০৪০ সালের পরবর্তী সময় মোকাবিলার জন্য আমাদের অধিক মূলধনের প্রয়োজন হবে। তাই বর্তমান শ্রম প্রাচুর্যতাকে কাজে লাগিয়ে সঞ্চয়ের মাধ্যমে মূলধন প্রাচুর্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায়, এই জনসংখ্যাতাত্ত্বিক মুনাফাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড়ো ক্ষতির কারণ।

n লেখক :শিক্ষার্থী, মার্কেটিং বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা-১৩৪২

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৪ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন