ঢাকা বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬
২৭ °সে


অভিশংসনের নীল দংশনে ট্রাম্প

অভিশংসনের নীল দংশনে ট্রাম্প

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সম্ভবত ট্রাম্পের মতো ‘নির্বাচিত কিন্তু অজনপ্রিয়’ কোনো প্রেসিডেন্ট আর আসেন নি। নির্বাচনী যুদ্ধের সময়কাল থেকে ট্রাম্পের অপ্রেসিডেন্টসুলভ আচার-আচরণ, কথাবার্তা ও চালচলন পরিশীলিত মার্কিন সংস্কৃতিতে অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। এখন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। শুরুতে অভিযোগ ছিল নির্বাচনে অর্থ খরচ করার বিষয়ে যেসব আইন আছে ট্রাম্প তা ভঙ্গ করেছেন। এ অভিযোগ এনেছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠজন, তার একজন সাবেক আইনজীবী মাইকেল কোহেন। অভিযোগ অস্বীকার করে ট্রাম্প বলেছেন, কোহেন এখন গল্প বানাচ্ছেন। এদিকে কোহেন আদালতে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জেতার লক্ষ্যে তাকে ট্রাম্প বলেছিলেন, লোকজনের মুখ বন্ধ করার জন্য তাদেরকে অর্থ দিতে। দ্বিতীয় অভিযোগ—রাশিয়া মার্কিন নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কৌশলগতভাবে সাহায্য করেছে। হিলারি ক্লিনটনের মতো গতানুগতিক শত্রুকে পরাজিত করার জন্য রাশিয়া সব ধরনের অনৈতিক সহায়তা দিয়েছে ট্রাম্পকে। সন্দেহের কারণ ঘনীভূত হয় তখনই যখন ট্রাম্প-পুতিন উষ্ণ ব্যক্তিগত সম্পর্ক প্রকাশ পায়। এ নিয়ে মার্কিন মুলুকে হুলুস্থুল কম হয়নি। মার্কিন জনগণ আজও রাশিয়াকে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের চ্যালেঞ্জ মনে করে। তদন্তে গুরুতর কিছু পাওয়া যায়নি। কিন্তু এ কারণে মার্কিন জনমত বিগড়ে আছে ট্রাম্পের প্রতি। এসব কার্যকলাপকে মার্কিন জনমত অভিশংসনযোগ্য মনে করে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য আলগ্রীন এবং ব্রাড শেরম্যান ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির প্রথম বছরে ২০১৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিশংসনের অভিযোগ উত্থাপন করেন। ঐ বছরের ডিসেম্বরে তত্কালীন রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাবটি ৩৬৪-৫৮ ভোটে বাতিল হয়ে যায়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রাধান্য অর্জন করে। তখন তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বহুমুখী অভিযোগ উত্থাপন করে। একটি অভিযোগে বলা হয় যে ট্রাম্প মস্কোতে তার নামে একটি টাওয়ার গড়তে পুতিনকে অনুরোধ করেছিলেন। ২০১৯ সালের ১৮ এপ্রিল প্রকাশিত মূলার রিপোর্টে ‘ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্তকরণে’ প্রেসিডেন্টের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। প্রতিটি অভিযোগ প্রকাশের প্রেক্ষাপটে প্রতিবারই প্রেসিডেন্টকে অভিশংসিত করার উদ্যোগ দেখা যায়। প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসী প্রাথমিক পর্যায়ে এই সব অভিশংসন অনুজ্ঞা অগ্রাহ্য করেন। কিন্তু তিনি ট্রাম্পের অব্যাহত বেআইনী কাজে বিরক্ত হয়ে এ বছরের মে মাসে অভিশংসন প্রক্রিয়ার প্রতি তার সমর্থন ঘোষণা করেন। প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা অধিকতর সংখ্যায় অভিশংসন প্রয়াস সমর্থন করছেন। ২০১৯ অর্থাত্ এ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিনিধি পরিষদের ১১৬তম অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অভিশংসনের বিষয়ে কতিপয় প্রস্তাব গৃহীত হয়। বর্তমান ইউক্রেনকেন্দ্রিক অভিশংসনের আগে ১৪০ জন প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য আনুষ্ঠানিক অভিশংসনের পক্ষে রায় দেন। মার্কিন সিনেটেও অভিশংসনের পক্ষে সিনেটররা আরো বেশি করে সর্মথন ব্যক্ত করছেন। সর্বশেষ অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপিত হয় বিগত ২৪ সেপ্টেম্বর প্রতিনিধি পরিষদে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সী পেলোসি স্বয়ং এই অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ‘ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থ’ হাসিলের উদ্দেশ্যে মর্যাদাপূর্ণ প্রেসিডেন্টের পদ ব্যবহারের অভিযোগে এই প্রস্তাব আনয়ন করা হয়।

সর্বশেষ অভিযোগটি গুরুতর। অতি উন্নত মার্কিন তথ্য-প্রযুক্তির কারণে কোনো কিছুই গোপন করার উপায় নেই। আর সেদেশের নাগরিক সাধারণ স্বয়ং প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের সুযোগ ও সাহস রাখে। যারা নিজের পরিচয় গোপন রেখে এ রকম অভিযোগ দায়ের করে তাদেরকে বলা হয় ‘হুইসেলব্লুয়ার’। এমনই একজন অজ্ঞাত অভিযোগকারী সম্প্রতি একটি অভিযোগ দায়ের করেন যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে একজন বিদেশি নেতার কথা হয়েছে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার প্রয়াস রয়েছে। আইন মোতাবেক এই অভিযোগটি সাত দিনের মধ্যে মার্কিন কংগ্রেসকে অবহিত করতে হবে। (সর্বশেষ আরও একজন হুইসেলব্লোয়ার ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন।) প্রতিনিধি পরিষদ তথা হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্বশীল সিনেট—এই দুইয়ের সমন্বয়ে মার্কিন কংগ্রেস গঠিত। এই কংগ্রেসে সাধারণ মানুষ অভিযোগ দায়ের করতে পারে। যথারীতি অজ্ঞাত অভিযোগকারী ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগ রয়েছে হোয়াইট হাউজ বিষয়টি আটকে দেয়। গণমাধ্যমে অভিযোগটি প্রকাশিত হলে ট্রাম্প প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। মূল অভিযোগে বলা হয়েছে, বিগত ২৫ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইউক্রেনের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানান। কথা বলার এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০২০ সালে তার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে বিপদে ফেলার জন্য অতীতে সেখানে কর্মরত বাইডেন পুত্রের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করতে বলেন। মার্কিন পত্রিকা ওয়ালস্ট্রীট জার্নাল জানায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আট বার জেলোনস্কির প্রতি আহ্বান জানান: তিনি যেন বাইডেন পুত্র হান্টারের ব্যাপারে তদন্তের জন্য ট্রাম্পের আইনজীবী রুডি জুলিয়ানির সহযোগিতা নেন। এই ঘটনা নিয়ে মার্কিন রাজনীতি ও সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়।

অভিশংসনের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘ইমপিচমেন্ট’। সাধারণভাবে এর অর্থ ‘অন্যায়ের জন্য অভিযুক্তকরণ’। একজন সরকারি বিশেষত উচ্চ মর্যাদাশীল ব্যক্তি যদি তার কর্তব্য পালনে অপরাধ করে অথবা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্যায়ের আশ্রয় নেয়, তখন তার বিরুদ্ধে অভিযুক্তকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর সর্বত্রই এই প্রক্রিয়াটি জটিল, বিরল ও দীর্ঘমেয়াদি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান মোতাবেক প্রতিনিধি পরিষদ তথা নিম্নকক্ষে বিষয়টি উত্থাপিত হয়। চূড়ান্ত ফয়সালা হয় উচ্চপরিষদ: সিনেটে। তখন সিনেট ইংল্যান্ডের হাউস অব লর্ডসের মতো সম্মিলিত বিচারসভায় পরিণত হয়। ইংল্যান্ডে বিগত ২০০ বছরে এধরনের ‘অভিশংসন’ হয় মাত্র দুই বার। ১৭৮৬ সালে ভারতে অন্যায়-অত্যাচার ও লুণ্ঠনের জন্য ওয়ারেন হেস্টিংসের বিচার হয়। ১৮০৬ সালে লর্ড মেলভাই অর্থ কেলেঙ্কারির জন্য অভিযুক্ত হন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও মাত্র দুই বার প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন উত্থাপিত হয়। ১৮৬৮ সালে এন্ড্রু জনসনের বিরুদ্ধে সিনেটে বিচার প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। এন্ড্রু মাত্র ১ ভোটের ব্যবধানে অভিশংসন থেকে রক্ষা পান। ১৯৭৪ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন অভিযুক্ত হন। এর মূলে ছিল কুখ্যাত ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারি। তার বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক কার্যালয়ে গোপনে ফাঁদ পেতে তথ্য জেনে নেওয়ার অভিযোগ ছিল এটি। নিক্সনের বিরুদ্ধে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারকার্যে বাধা দান এবং কংগ্রেস অবমাননা’ এর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়। এই অভিশংসনের ফলে সিনেটের বিচারসভায় তার পদচ্যুতি ছিল এক রকম অনিবার্য। প্রেসিডেন্ট নিক্সন আত্মসম্মানের স্বার্থে অভিশংসন শুরুর প্রাক্কালে পদত্যাগ করেন। আরেকটি অভিশংসন প্রয়াস এই সেদিনের। ১৯৯৮ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বিরুদ্ধে বিবাহ বহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্ক এবং মিথ্যাচারের অভিযোগ উত্থাপিত হয়; কিন্তু সিনেট প্রেসিডেন্টকে অভিযুক্তকরণের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন পেতে ব্যর্থ হওয়ায় অভিশংসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়। অভিশংসনের তাত্পর্য এমন নয় যে, অভিযোগ উত্থাপিত হলেই পদত্যাগ করতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অভিশংসনের মাধ্যমে কোনো প্রেসিডেন্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা যায়নি।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের কারণে চূড়ান্তভাবে তাকে অপসারণ সম্ভব হবে বলে মনে করেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। আগেই বলা হয়েছে—বিষয়টি জটিল, কঠিন ও বিরল। ট্রাম্প এখন সুবিধেজনক অবস্থানে রয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ এবং উচ্চ পরিষদ বা সিনেটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক দল রিপাবলিকান পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তবে ট্রাম্প অভিশংসনের ব্যাপারে নিরঙ্কুশ ঝুঁকিমুক্ত নন। এবছরের শেষের দিকে নিম্ন ও উচ্চ পরিষদের বেশ কয়েকটি পদে মধ্যবর্তী নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টি যদি জোরেশোরে প্রচার চালাতে পারে এবং ডেমোক্র্যাটরা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় তাহলে খবর আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সত্যি সত্যি যদি সরিয়ে দেওয়া যায় তাহলে মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিষয়টি নিয়মতান্ত্রিক এবং রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার পরিবর্তে কঠোরতা ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে দমন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত আছেন। ট্রাম্প প্রশাসন তদন্তকারীদের প্রাপ্ত সব সুবিধা বাতিলের হুমকি দিয়েছেন। এতদসত্ত্বেও দমে যাননি তদন্তকারী জনপ্রতিনিধিগণ। ট্রাম্প অভিশংসন প্রক্রিয়াকে জনসাধারণের মধ্যে অবাঞ্ছিত ও অগ্রহণযোগ্য করার রাজনৈতিক প্রচারণা শুরু করেছেন। তারা অভিযোগের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে ইউক্রেনে জো বাইডেন পরিবারের দুর্নীতি প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। ট্রাম্পের লোকেরা অজ্ঞাত অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেও ক্ষিপ্ত। তারা অভিযোগকারীর সত্ উদ্দেশ্য সম্পর্কেও সন্দিহান। ট্রাম্প নিজে তার সঙ্গে রাজনৈতিক বাহাছে লিপ্ত হতে চান। তারা মনে করেন অভিযোগকারী বেআইনিভাবে তথ্য সংগ্রহ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গুপ্তচরের কাজ করেছেন। তার পরিণতি হবে ভয়ংকর। অপরদিকে বিরোধীপক্ষ অভিযোগকারীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও আইনি রক্ষাকবচ নিশ্চিতকরণের আহ্বান জানিয়েছে।

n লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি

বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন