কোথায় রাস্তা? কোথায় ফুটপাত?

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আজহার মাহমুদ

ফুটপাত আর রাস্তার মধ্যে যে একটা সম্পর্ক আছে সেটা আমাদের সকলের অজানা নয়। যেখানে রাস্তা আছে সেখানে ফুটপাত থাকবেই। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে বলতে হয়, রাস্তায় ফুটপাত খুঁজে পাওয়াটাই অস্বাভাবিক। ফুটপাত এখন চোখেই পড়ে না সাধারণ মানুষের। আর পড়বেই বা কেন? এখন তো ফুটপাত মানেই মার্কেট। ছোটোখাটো মার্কেট এখন ফুটপাতেই তৈরি হয়ে যায়। আর ক্রেতারা সেখানে ভিড় করে দখল করে ফেলে পুরোটাই। এতে হাঁটার কোনো অবস্থাই থাকে না। কিন্তু আফসোস করতে হয় যখন রাস্তায়ও পথচারীরা হাঁটতে পারে না। রাস্তার পাশগুলোতে এখন গাড়ি পার্কিং আর হকার বাণিজ্য চলে। মোটকথা হাঁটার পথ সংকীর্ণ।

শুধু তা-ই নয়, মানুষ রাস্তায় নেমে আসার কারণে সৃষ্টি হয় যানজট। একদিকে ফুটপাত দখল অন্যদিকে রাস্তায় গাড়ি পার্কিং। পথচারীরা যাবে কোথায়? ফুটপাতের দোকানগুলো এমনভাবে বসানো হয়েছে যেন এগুলো দোকান বসানোর জায়গা। চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নিউমার্কেট, স্টেশন রোড, জুবলী রোড, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, আন্দরকিল্লা, চকবাজার, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ষোলশহর দুই নম্বর গেইট, অক্সিজেন মোড়, জিইসি মোড়, অলংকার, কর্নেল হাট, আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড়, এক্সেস রোড, ইপিজেড মোড়সহ নগরীর প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, ফুটপাত ও মূল সড়ক দখল করে শত শত হকার নানা পণ্যের ব্যবসা খুলে বসেছে।

বিশেষ করে চট্টগ্রাম নিউমার্কেট এলাকায় ফুটপাত ছাড়িয়ে দুই পাশের ছয় থেকে সাত ফুট রাস্তা দখল করে পোশাকের পসরা সাজিয়ে বসেছে হকাররা। একই অবস্থা দুই নম্বর গেইট, ইপিজেড ও আগ্রাবাদ এলাকায়। প্রকাশ্যে কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই হকাররা মূল সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গার্মেন্টসামগ্রী, ফলমূল, শাকসবজি, ইলেকট্রনিকস পণ্য, তৈরি পোশাক, জুতা ইত্যাদি পণ্যের ব্যবসা খুলে বসেছে। শুধু তাই নয়, মহাসড়কও বাদ পড়েনি। নগরীর কর্নেল হাট, বহদ্দার হাট, মুরাদপুর এলাকায়ও মহাসড়কের রাস্তা দখল করে ব্যবসা খুলে বসেছে । মূল সড়ক দখল হয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ ও তীব্র যানজটের সৃষ্টি হলেও কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সিটি করপোরেশনের দু-একটি বিচ্ছিন্ন অভিযান ছাড়া এ পর্যন্ত কোনো মহল কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। কোতোয়ালি থানা মোড় থেকে স্টেশন রোডের বিআরটিসি মোড় এবং নিউমার্কেট থেকে এনায়েত বাজার মসজিদ পর্যন্ত পোশাকের পাশাপাশি মৌসুমি ফলের পসরা সাজিয়ে বসেছে হকাররা।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কের পাশে ফুটপাত প্রতিটি নাগরিকের অধিকার। চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রতিটি সড়কে ফুটপাত নেই। যে পরিমাণ ফুটপাত আছে তাও বিভিন্ন মহলের দখলে। সড়ক হচ্ছে যানবাহন চলাচলের জন্য। আর ফুটপাত হচ্ছে মানুষ পায়ে হাঁটার জন্য। উন্নত বিশ্বে ফুটপাত দিয়ে প্রতিবন্ধীরাও নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। প্রতিবন্ধীদের হুইলচেয়ারে উঠা-নামা এবং চলাচলের সুযোগ রাখা হয়। আর আমাদের দেশের ফুটপাতগুলো যেন মরণফাঁদ। এ ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ফুটপাতে দুই হুইলচেয়ার পাশাপাশি চলাচলের জায়গা রাখতে হবে। আবাসিক এলাকার ফুটপাতের প্রশস্ততা থাকবে সর্বনিম্ন ১০ ফুট।

বাণিজ্যিক এলাকার ফুটপাত হবে আবাসিক এলাকার চেয়ে বেশি প্রশস্ত। নগরীর ফুটপাতে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষদের দখলের পাশাপাশি রয়েছে ডাস্টবিন, ম্যানহোল, বিলবোর্ডসহ নানা কিছু। দখল আর ঝুঁকির কারণে সাধারণ মানুষ ফুটপাত বাদ দিয়ে এখন মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করছে। এই সমস্যা নতুন কিছু নয়। অথচ কোনো মহলের পদক্ষেপ না থাকায় ফুটপাতের নৈরাজ্য নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। আবার ফুটপাত এবং সড়কের হকারদের অবৈধ বিদ্যুত্ সংযোগও রয়েছে। পিডিবির দুর্নীতিবাজ কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এসব অবৈধ বিদ্যুত্ সংযোগ দেওয়া হয়।

আমি যদি আমার এলাকার কথা বলি, সিটিগেট থেকে পাকা রাস্তার মাথা পর্যন্ত কোনো ফুটপাত নেই। এতেও সমস্যা হতো না, যদি রাস্তার একাংশে ট্রাক-লরি না থাকতো। পুরো রাস্তার এক তৃতীয়াংশ ট্রাক আর বড়ো বড়ো কাভার্ড ভ্যানের মাধ্যমে দখল থাকে। বাধ্য হয়ে পথচারীরা রাস্তার মাঝখানে চলাচল করে। বড়ো ঝুঁকির বিষয় হচ্ছে এ পথে চলাচল করে ঢাকা, কুমিল্লাসহ উত্তরবঙ্গের সকল গাড়ি। যা অনেক গতিতে চলাচল করে। গাড়িগুলো সিটিগেট থেকে এমন গতিতে চলাচল করে যা খুব ভয়ংকর। এসব গাড়ি পথচারীদের সঙ্গে হালকা স্পর্শ হলেই নিশ্চিত মৃত্যুবরণ করে, ধরে নিতে হবে। এ পর্যন্ত সিটিগেটের আশপাশে এসব উচ্চগতির গাড়ি অনেকজনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।

একদিকে বেপরোয়া গাড়ি অন্যদিকে ফুটপাত দখল। কি অসহনীয় অবস্থা! পথচারীদের জন্য এটি একটি সীমাহীন দুর্ভোগ। কিন্তু আর কতকাল এ দুর্ভোগে থাকবে পথচারীরা!

n লেখক : শিক্ষার্থী : হিসাব বিজ্ঞান বিভাগ (২য় বর্ষ), জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ওমরগনি এমইএস বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, চট্টগ্রাম।