সময় এসেছে এসব নীরব ঘাতককে প্রতিরোধের

প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সোয়াইব আহমেদ

 

রাজধানী ঢাকার হোটেল বা রেস্টুরেন্টের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও নিম্নমানের খাবার পরিবেশন নিয়ে প্রচার-প্রচারণা বা অভিযান পরিচালনা নতুন কোনো ঘটনা নয়। এক কোটি ৭০ লাখ মানুষের বসবাসের শহর ঢাকায় হোটেল বা রেস্টুরেন্ট থেকে নগরবাসী খাবার গ্রহণ করে একপ্রকার বাধ্য হয়েই। কিন্তু রাজধানীবাসীর গ্রহণকৃত এসব খাবার কি আদৌ সুষম?

ঢাকায় অভিজাত রেস্টুরেন্টের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, সেইসঙ্গে যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে ছোট বা মধ্যম মানের হোটেল-রেস্তোরাঁ। এসব হোটেলে নেই বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ, রান্নাঘরের পরিবেশ দূষিত, থালাবাসন ব্যবহারের অযোগ্য, রান্না করা হচ্ছে ওয়াসা সরবরাহকৃত পানি, বিষাক্ত তেল দ্বারা, খাবারের ওপরে ঢাকনার কোনো বালাই নেই, রয়েছে পোকা-মাকড়ের অবাধ বিচরণ। মোদ্দাকথা, এসব হোটেল বা রেস্তোরাঁয় সুষম খাবার পরিবেশনের কোনো বালাই নেই। রাজধানীর চানখাঁরপুল, আজিমপুর, বংশাল, কাজীপাড়া, মিরপুর ও শ্যামলীতে এই চিত্র নিয়মিতই চোখে পড়ে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য অধ্যাদেশ-১৯৫৯ (সংশোধনী-২০০৫)-এ বলা হয়েছে, খাবার হোটেলগুলোর রান্নাঘর পরিষ্কার থাকতে হবে, খাবার ঢাকা থাকতে হবে, বাবুর্চির হাতের নখ ছোট থাকবে ইত্যাদি। কিন্তু রাজধানীর হাতেগোনা কয়েকটি হোটেল ছাড়া বাকিগুলোতে এ নিয়ম-নীতির বালাই নেই। জনবহুল এলাকার অলিগলিতে গড়ে উঠছে পোলাও-বিরিয়ানির দোকান। কিসের মাংস দিয়ে তৈরি হচ্ছে এসব দোকানের বিরিয়ানি তার কোনো হদিস নেই। তবে মরা গরু ও মুরগি-ছাগলের মাংস এখন হোটেলে কমবেশি বিক্রি হচ্ছে বলে মাঝেমধ্যেই পত্র-পত্রিকাতে দেখতে পাই। জানা যায়, রাজধানীতে মরা মুরগি ক্রয়-বিক্রয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট।

ঢাকার বিপুল সংখ্যক ব্যাচেলর বা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের একমাত্র ভরসা রাস্তার পাশের ঝুপড়ি হোটেলগুলো। শ্রমজীবী বা স্বল্প আয়ের মানুষদের খুঁজতে হয় সবচেয়ে কম দামে খাবার সরবরাহকারী হোটেল। এসব হোটেলের দূষিত খাবার ও পানি গ্রহণের মাধমে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, প্যারাটাইফয়েড ও ইউরিন ইনফেকশন হতে পারে। এছাড়া খাবারে ফরমালিন, বিষাক্ত রং, কার্বাইড কলিফর্ম থাকায় অনেকেই নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও খাদ্য এবং কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ খাবারে বিষক্রিয়ার ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে।

২০০৫ সালে ভেজালবিরোধী অভিযান বেশ জোরেশোরে শুরু হয়েছিল। ফলে অধিকাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁ সতর্ক হয়ে যায়। বর্তমানে এসব অভিযান নিয়মিত পরিচালনার দাবি উঠছে। সেইসঙ্গে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা পানির কারখানাগুলো গুঁড়িয়ে দিতে হবে। খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অপরাধ হিসেবে ভারতে সাজা যাবজ্জীবন; চীনে মৃত্যুদণ্ড, যুক্তরাষ্ট্রে সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। আর তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন তৈরি হয়। ‘ভোক্তা অধিকার ও অভিযোগ’ নামে অ্যাপ দিয়ে স্মার্টফোনের মাধ্যমে মুহূর্তেই অভিযোগ করা যায়। কিন্তু এ ব্যাপারে আমরা অনেকেই জানি না। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে দরকার নাগরিক সচেতনতা। এজন্যে গণমাধ্যম বেশ বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

অসাধু হোটেল ব্যবসায়ীদের প্রতিরোধে আমাদের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও জনপ্রতিনিধিগণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। সময় এসেছে এসব অসাধু নীরব ঘাতককে প্রতিরোধের। এসব পদক্ষেপ নিশ্চিত করবে জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা তথা নিরাপদ খাদ্য অধিকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়