ঢাকা রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ৪ কার্তিক ১৪২৬
২৯ °সে


‘কারাগার’ শব্দটি পরিবর্তন করা দরকার

‘কারাগার’ শব্দটি পরিবর্তন  করা দরকার

বিপ্লব বিশ্বাস

আমাদের দেশে কারাগার বা জেলখানা প্রায় সবার কাছেই একটি ভীতিকর স্থান হিসেবে পরিচিত। যারা কখনো কারাগারে যায়নি, তাদেরও কারাগার সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। সাধারণ অর্থে কারাগার হচ্ছে সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি বিশেষ আবাসস্থল, যেখানে আসামি বা অপরাধীদের রাখা হয়। ব্রিটিশ আমলে রাজবন্দিদের আটক রাখার জন্য ১৮১৮ সালে ঢাকা, রাজশাহী, যশোর ও কুমিল্লাসহ কয়েকটি জেলা ও মহকুমায় কারাগার নির্মাণ করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে রাজবন্দি ছাড়াও যে কোনো অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই আটক রাখার প্রয়োজন হলে কারাগারে প্রেরণ করা হতো। ঐসময় একইসঙ্গে কারাগার পরিচালনার জন্য কারাবিধিও জারি করা হয়েছিল এবং বিভিন্ন সময়ে এই কারাবিধির পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংস্কার করা হয়েছে। কারাগারে যাঁরা যান তাঁদের সবাই অপরাধী নন। অনেকেই আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বেকসুর খালাস পান। শুধু রাজনৈতিক কারণেও অনেককেই কারাগারে পাঠানো হয়। কাজেই সেই ঔপনিবেশিক আমলের ধ্যান-ধারণা অনুযায়ী কারাগার বলতে শুধু অপরাধীদের আবাসস্থল, এমনটি মনে করার যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই। অথচ কারাগার থেকে যারা বের হয়ে আসে, দোষী-নির্দোষী নির্বিশেষে সবাইকে ‘জেলফেরত’ আসামি বা অপরাধী হিসেবেই সমাজে পরিচিতি লাভ করে। অনেক ক্ষেত্রে জেলফেরত ব্যক্তির পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদাও ভীষণভাবে ক্ষুণ্ন্ন হয়ে থাকে। অথচ অনেকেই কারাগারে যাওয়ার পর কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত বোধ করে, মনোভাবের পরিবর্তন ঘটে এবং ভবিষ্যতে আর কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত না হওয়ার সংকল্প নিয়েই কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে। কিন্তু পারিবারিক ও সামাজিক কারণে অনেকেই আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে না। ‘জেলফেরত’ বা ‘জেলখাটা’ শব্দগুলোই তাদের জীবনে কাল হয়ে দেখা দেয়। তবে শুধুমাত্র রাজনীতিকরা এই অপবাদ থেকে মুক্ত থাকেন।

যেহেতু বিচারকার্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত আটক কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যায় না, তবুও কারাগারে আটক বিচারাধীন ব্যক্তিদের অন্যান্য সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীর মতো মৌলিক অধিকার ভোগ করতে দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণও করা হয়ে থাকে। নানা কারণে অনেক নির্দোষ ব্যক্তিকেও মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর বিনাবিচারে কারাগারে এই অমানবিক জীবন কাটাতে হয়। বিচারে যারা দোষী বিবেচিত হবে তাদের অবশ্যই অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি ভোগ করতে হবে। যেহেতু অপরাধীকে নয় বরং অপরাধকেই ঘৃণা করতে হবে, তাই কারাগারে আটক অপরাধীদের সঙ্গেও মানবিক আচরণ করতে হবে। তাদের স্বাভাবিক খাবার, পোশাক, বিনোদন ও সংশোধনমূলক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। কারাগারের অভ্যন্তরে যাতে কোনো রকম অনৈতিক কাজ না হয় সেদিকেও কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে কর্তৃপক্ষকে। কারাভোগের পর বাইরে এসে আবার কেউ অপরাধের সঙ্গে জড়িত না হয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে, সে রকম প্রস্তুতি বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা অবশ্যই প্রতিটি কারাগারে নিশ্চিত করতে হবে।

১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান এবং ১৯৭১ সালে ন্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার পর প্রায় সত্তর বছরেরও বেশি সময় পার হয়েছে। অথচ কারাগার সম্পর্কে সেই ঔপনিবেশিক আমলের নেতিবাচক ধারণা বা কারাগার শব্দটির পরিবর্তন করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি কারাগারে আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে কারা কর্তৃপক্ষের মনোভাব বা আচরণেরও তেমন পরিবর্তন হয়নি। আধুনিক জগতে কারাগারের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এর ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন আনতে হবে। সেজন্য প্রথমেই কারাগার বা জেল শব্দটির পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ করা জরুরি। এক্ষেত্রে সংশোধন কেন্দ্র, মানসিক উন্নয়ন কেন্দ্র, মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র অথবা বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে কারাগারকে নতুন নামে অভিহিত করতে হবে। আশা করি সরকার ও দেশের চিন্তাশীল ব্যক্তিগণ এ ব্যাপারে এগিয়ে আসবেন।

ফরিদপুর

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২০ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন