ঢাকা মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬
২৩ °সে


শিক্ষাঙ্গনে বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী কে?

শিক্ষাঙ্গনে বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী কে?

‘৭৫ পরবর্তী সময় থেকে জাতীয় রাজনীতিতে হত্যা, ষড়যন্ত্র, দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতিসহ যে অপরাজনীতির ধারা চলে আসছে, তা থেকে ছাত্ররাজনীতিও মুক্ত হতে পারেনি। সাম্প্রতিক বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের নিষ্ঠুর মৃত্যুতে সারা জাতি শোকার্ত ও ক্ষুব্ধ। শিক্ষাঙ্গনে মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিহত হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়, হয়তো শেষও নয়। নিহত ছেলেটি যেমন অত্যন্ত মেধাবী ছিল, তেমনি যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তারাও মেধাবী হিসেবেই পরিচিত। কারণ মেধার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হয়। অথচ এই নিষ্ঠুর ঘটনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। যে ছেলেটি মারা গেল এবং যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের সকলের জীবনই ধ্বংস হয়ে গেল। প্রশ্ন হলো, এই মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর কেন দুর্বৃত্ত হয়ে যায়? কোন অপশক্তি তাদেরকে আশ্রয়, প্রশয় ও শক্তি জোগায়? শোনা যাচ্ছে, এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও সেখানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ছিল না। সর্বত্রই চরম বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম ও দুর্নীতি বিরাজ করছিল। র্যাগিং-এর নামে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর প্রচণ্ড শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো, টাকা-পয়সাও ছিনিয়ে নেওয়া ইত্যাদি ছিল বুয়েটের নিয়মিত ঘটনা। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড থেকে প্রমাণিত যে, এই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিকব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল এবং শিক্ষকদের মধ্যেও দাযিত্বশীলতার অভাব রয়েছে। ছাত্র নামধারী কতিপয় দুর্বৃত্তের অপকর্ম সম্পর্কে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সকলেই অবগত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এই ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থাত্ মাননীয় উপাচার্য নিজেও চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে পারতেন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থাও নিতে পারতেন।

শুধু বুয়েটই নয় বরং প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দায়িত্বহীনতার কারণে দেশের বেশিরভাগ শিক্ষাঙ্গন অশান্ত হয়ে উঠছে। দেশে বিরাজমান অপরাজনীতি ও দুর্বৃত্তায়ন ছাত্ররাজনীতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। ছাত্ররাজনীতির নামে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলছে দুর্বৃত্তায়ন, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মাদকসহ নানা অপকর্ম। অনেকক্ষেত্রেই সবকিছু জানা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে যেমন বিস্তর অনিয়ম রয়েছে, তেমনি উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রেও। যে কারণে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই উপাচার্যবিরোধী আন্দোলন অব্যাহত আছে। লক্ষণীয় যে, শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই নয়, বেশিরভাগ শিক্ষকদের মধ্যেও নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। সম্মানিত শিক্ষকদের একটি বড় অংশই দেশের চলমান অপরাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক সম্পর্ক নষ্ট করছেন। তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই যথেষ্ট সততা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারছেন না। একজন শিক্ষক বা উপাচার্যের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ উত্থাপিত হলেও সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগ না করে বরং পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হওয়ার পরই তাঁরা পদ ছাড়তে বাধ্য হন। উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে এই অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না।

আরবার হত্যার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধ করতে হলে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। বিতর্কিত, অযোগ্য ও অনভিজ্ঞ উপাচার্যদের অপসারণ করে সত্, যোগ্য ও অভিজ্ঞদের নিয়োগ দিতে হবে। রাজনীতির নামে ছাত্র নামধারী দুর্বৃত্তদের ছাত্রত্ব বাতিল করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতি পরিচালনার জন্য সকল পক্ষের সহাবস্থান নিশ্চিত করে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। একইসঙ্গে শিক্ষাঙ্গন পরিচালনার নীতিমালা পরিবর্তন করতে হবে যাতে নিয়োগ, পদোন্নতি, উন্নয়ন কার্যক্রম, টেন্ডার ইত্যাদির সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জড়িত হতে না পারেন। আর দেশের ছাত্ররাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে হলে দেশের জাতীয় রাজনীতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। একে অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে এই জাতীয় সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনে এগিয়ে আসতে হবে।

ফরিদপুর

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১২ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন