ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২২ °সে

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ও নারীর অংশগ্রহণ

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ও নারীর অংশগ্রহণ

শাহনাজ পারভীন

জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপি) প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী, যখন কোনো দেশের কর্মক্ষমহীন মানুষের চেয়ে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকে এবং সেটা যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে, তখনই তাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। এখানে কর্মক্ষম মানুষের নির্ধারক হচ্ছে তাদের বয়স অর্থাত্ ১৫ থেকে ৬৪, আর কর্মক্ষমহীন মানুষ বলতে বোঝায় ১৪-এর নিচের এবং ৬৫-এর বেশি বয়সের মানুষকে।

আমরা স্বপ্ন দেখছি—২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে পরিণত হবো। এখন আমার মাথাপিছু আয় ১৯০৯ ডলার, উন্নত দেশ হতে হলে ১৭,৫০০ ডলার মাথাপিছু আয় হতে হবে। তাই আমরা যদি সঠিক সময়ে সঠিকভাবে সমস্ত কর্মক্ষম জনশক্তিকে সম্পৃক্ত করতে না পারি, তাহলে মাথাপিছু আয় ঐ পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে সৌভাগ্যে পরিণত করার ক্ষেত্রে নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। আমাদের অর্থনীতি যেদিকে যাচ্ছে, শিক্ষাব্যবস্থা সেদিকে যাচ্ছে না। আমাদের দরকার চামড়া, প্লাস্টিক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ এরকম আরো অনেক খাতে কাজ করতে পারে এমন দক্ষ জনবল। যেক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণ ও সুবিধাপ্রাপ্তি খুবই নগণ্য। বিশ্লেষকরা বলছেন, সর্বত্রই নারীকে টিকে থাকতে হচ্ছে স্বীয় যোগ্যতায়। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়েই এগিয়ে যেতে হচ্ছে নারীকে।

বাংলাদেশের নারীরা এখনো মজুরি বৈষম্যের শিকার। পোশাক খাতে নারী-পুরুষের বেতনবৈষম্য রয়েছে। বর্তমান সময়ে এ খাতে যেসব নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে, তার সঙ্গে নারীশ্রমিকরা ঠিকভাবে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেন না। এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ৫৭ শতাংশ কর্মজীবী নারীর মাসিক বেতন একই পদে ও সমান মর্যাদায় কর্মরত একজন পুরুষ কর্মীর বেতনের ৫২ শতাংশ।

আশার কথা এই যে, বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে এসএমই খাতে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক বেশি। এর পরেও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মাত্র ১.৭ শতাংশ নারীদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যা বিশ্বের অন্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে কম। গবেষণা সংস্থাগুলো থেকে জানা যায়, অনেক নারী প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি ছেড়ে আত্মকর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকছেন। বর্তমানে অনলাইন ব্যবসায়ও নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে।

কর্মে যোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি গুরুত্ব দিতে হবে কর্মস্থল থেকে নারীর ঝরে পড়া রোধের দিকে। এর নেপথ্যে নিরাপত্তাহীনতা, যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকা, শিশু দিবাযত্নের অভাবসহ আনুষঙ্গিক অনেক বিষয়ই কাজ করে।

নারীর প্রতি বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের কারণেই কর্মক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে যাচ্ছে। সুস্থ কর্মপরিবেশই পারে নারীদের কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে নিতে। কর্মজীবী নারীর আবাসন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাতায়াতের সুব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, সন্তান লালন-পালনের জন্য শিশু দিবা যত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ এবং নজর না বাড়ালে কর্মক্ষেত্রে নারীদের ধরে রাখা সম্ভব হবে না। প্রবাসে নারী রেমিটেন্সযোদ্ধা পাঠানোর আগে তাদের দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিতে হবে। বৈধ চ্যানেলে যথাযথ তদারকিতে নারীকর্মী পাঠানো হলে, বিদেশের মাটিতে তাদের গুরুত্ব বাড়ার পাশাপাশি রেমিটেন্সের পরিমাণ বাড়বে। প্রবাসে নারী কর্মীরা বেশি সহিংসতা, যৌন নির্যাতন ও ছাঁটাইয়ের কবলে পড়েন। যে খাতসমূহে নারীদের অংশগ্রহণ বেশি সেই কৃষি ও পোশাক শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত নারীদের উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় ও দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করতে হবে।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড, যা ২০৪০ সালের পর আর থাকবে না। তাই এই সুবিধাটা আমাদের কাজে লাগানোর এখনই সময়। ২০৪০ সালের পর বাংলাদেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। যাঁরা তরুণদের ওপর নির্ভরশীল হবেন। তাই এখনই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে। চাকরির ক্ষেত্রে, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সংস্কার এনে পিছিয়ে পড়া নারীদের অর্থনীতির মূল স্রোতে এনে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগাতে হবে।

গাজীপুর

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১২ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন