ঢাকা বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২৭ °সে


বয়ঃসন্ধিকালীন শিশুর সমস্যা

বয়ঃসন্ধিকালীন শিশুর সমস্যা

রিফাত মুনীর ইতি

বছরখানেক আগের ঘটনা। ঢাকার স্বনামধন্য একটি স্কুল তোলপাড় হয়েছিল অরিত্রি অধিকারী নামের এক বালিকার আত্মহত্যার ঘটনায়। ঘটনার পেছনের ইতিহাস বের করতে গিয়ে, বেরিয়ে এসেছিল এমন সব ঘটনা—যা সমস্ত দেশকে নাড়া দেয়। পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন ব্যবহার করার অপরাধে বহিষ্কার ও বাবা-মাকে ডেকে অপমানের কষ্ট মেনে নিতে না পেরে অরিত্রি চলে যায় না-ফেরার দেশে। একইরকম ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল মিরপুরের এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আকাশের পরিবারকে টেলিফোনে অপমান করার ক্ষোভে সে কলেজের দোতলার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে এবং মারাত্মক আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধরনের ঘটনা রোধে আমরা কতটা সচেতন?

বয়ঃসন্ধি এমন একটা সময়, যেটি পার হতে একজন কিশোর কিংবা কিশোরীর পরম সাহায্য, বন্ধুর মতো অকপট বিশ্বাস ও নির্ভরতার ছায়া দরকার। বলতে দ্বিধা নেই, আজকের সমাজে যা দিনদিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। পরিবারের ব্যস্ততম সদস্য মা ও বাবা সংসারের ব্যয় নির্বাহের পেছনে ছুটছেন, অনেকে নিশ্চিত উপার্জনক্ষম হবার পরেও ছুটছেন প্রতিযোগিতায়। আমরা আমাদের সন্তানদের সময় না দেওয়ার পেছনে অজুহাত খুঁজছি, আর তাকে আমাদের উপার্জনের কষ্ট বুঝতে না দিয়ে সবকিছু অনায়াসে প্রাপ্তির ব্যবস্থা করছি। ফলাফল—সন্তানেরা চলে যাচ্ছে মা-বাবার নাগালের বাইরে। মুখে যতোই বলি, আমরা সন্তানের বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করি না। তাদের সহপাঠী, বন্ধু ও কাছের মানুষের খবর আমরা জানি না। এ কারণেই মাঝে মাঝেই কিশোর অপরাধীদের গ্যাং গ্রেফতার হয়। প্রশ্ন হলো, আমাদের সন্তানেরা তো বাসাতেই ফিরে আসে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে; অর্থাত্ আমাদের এগারো থেকে ষোলো বছর বয়সী শিশুটির তো রাতে বাইরে থাকার কথা নয়, তাহলে কী করে সে মাদক পাচারের মতো ভয়াবহ অপরাধের চক্রে জড়িয়ে পড়ে? আমাদের অবহেলা আর উদাসীনতাই কি এর জন্য দায়ী নয়?

অন্যদিকে, এই বয়সটাতে শারীরিক ও মানসিক যে পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে শিশুরা যায়, তা উপলব্ধি করার প্রয়োজন দেখাই না। অথচ ভয়াবহ রকমের আচরণগত, আবেগময় পরিবর্তনে শিশুটি দিশেহারা হয়ে পড়ে। শিশুর এই পরিবর্তনের কথা সমাজের অন্য সদস্যদেরও অজানা নয়, অথচ সবচেয়ে নিগৃহীত, নিষেপষিত, নিষ্ঠুর কিছু পরিণতি যেন অলক্ষ্যে অপেক্ষা করে শিশুটির ভাগ্যে।

প্রসঙ্গত, সরকার নির্ধারিত পাবলিক পরীক্ষার মতো পিএসসি কিংবা জেএসসি-র ফলাফলে আজকালকার শিশুদের চেয়ে মা-বাবাদের প্রতিযোগিতা লক্ষণীয়। আর তাই পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য শিশুদের ওপর তাদের আচরণ নির্ভর করে। আমরা মুখে বলি, কিন্তু ভুলে যাই যে প্রতিটি শিশু আলাদা, আলাদা তাদের মেধাগত অবস্থান, ধারণক্ষমতা। জেএসসি-তে অংশ নেওয়া একটি শিশুর বয়স তেরো থেকে চৌদ্দ হতে পারে; ঠিক অতটুকু বয়সে, জীবনের দ্বিতীয় পাবলিক পরীক্ষায় খারাপ ফলাফলের জন্য, আমদের গঞ্জনা মেনে নেওয়ার মতো মানসিক সক্ষমতা কতটুকু, তা আমাদের মাথায় থাকে না। আর তাই বয়ঃসন্ধির এই সময়ে অস্থির শিশুটি কঠিন সব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, বস্তুত পরোক্ষভাবে বাধ্য হয়। শুধু ফলাফল, তাও একটা পরীক্ষা যে জীবনের চেয়ে অনেক অনেক ক্ষুদ্র, এটা বোঝাতে ব্যর্থ হই আমরা।

আবার বলতে দ্বিধা নেই, আমরা নিজেরা সন্তানদের ক্ষেত্রে যতোটা নমনীয়, শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রতি মাঝে মাঝে ততোটাই কঠিন। বিশেষ করে শিশুদের অভিভাবকদের যে কোনো ঘটনা জানিয়ে দেওয়ার শঙ্কা যে কত মারাত্মক, তা অনুধাবন করতে ব্যর্থ একালের শিক্ষকেরা। অন্যদিকে, মানসিক চাপ একটা স্বাভাবিক বিষয়, বয়ঃসন্ধির এই সময়টাতে। আর এটি দূর করতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী উভয়ের জন্যই প্রয়োজন নিয়ত কাউন্সিলিং, যেটা আজকাল কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে করা হয় কি না সন্দেহ।

সব শেষে মনে রাখা উচিত, সমাজের প্রতিটি শিশুর প্রতি আমাদের সচেতন আচরণই পারে বয়ঃসন্ধিকালীন এই আবেগময় সময়টির সকল সমস্যা দূর করতে। আর এজন্য আমাদের ইচ্ছাই যথেষ্ট, আর কিছু নয়।

ঢাকা

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১১ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন