ঢাকা মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
৩৩ °সে

ক্ষতি মোকাবিলায় ব্যয় করতে হবে ১ লাখ কোটি টাকা

১ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের

১ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত করোনা পরিস্থিতি ও এর সম্ভাব্য পরিণাম থেকে রক্ষা পেতে কল্পচিত্র উপস্থাপন করেছেন। বলেছেন কঠোর সমন্বিত ব্যবস্থাপনার কথা এবং সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হলে ব্যয় করতে হবে ১ লাখ কোটি টাকা।

রূপকল্পে তিনি উল্লেখ করেন, ‘এ ধরনের কল্পচিত্র অনুযায়ী আমার হিসেবে প্রয়োজন হবে কমপক্ষে ১ লাখ কোটি টাকা। সম্পূর্ণ অর্থ একই সঙ্গে এখনই প্রয়োজন হবে না, কারণ বেশ কিছু জিনিসপত্র যেমন রি-এজেন্ট, বেতন-ভাতা, পরিবহন ব্যয়—এসব সামনে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে লাগবে। আনুমানিক ১ লাখ টাকার এ বিনিয়োগ কোথা থেকে আসতে পারে? আমার জানামতে বৈশ্বিকভাবে ইতোমধ্যে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কোভিড-১৯ প্রতিরোধ তহবিল গঠন করা হয়েছে, যা আক্রান্ত দেশগুলো ব্যবহার করবে, আর পাশাপাশি এ বাবদ প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দিচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন ফাউন্ডেশন, ট্রাস্ট ও চ্যারিটি সংস্থা। অর্থাত্ এ মুহূর্তে করোনা প্রতিরোধে বৈশ্বিক তহবিলে আছে কমপক্ষে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (এ অঙ্ক বাড়বে)। যৌক্তিক কারণেই বৈশ্বিক জনসংখ্যা অনুপাতে আমাদের ন্যায্য হিস্যা হওয়া উচিত ঐ ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কমপক্ষে ৩ শতাংশ। অর্থাত্ ন্যায্যত আমাদের পাওনা হতে পারে কমপক্ষে ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। এ হিস্যা পেতে হলে প্রয়োজন হবে শক্তিশালী অতি জরুরি ফলপ্রদ কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড।’

বৈশ্বিক তহবিল থেকে ঐ অর্থ পাওয়া গেলে ঘাটতি থাকবে ৮৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। ঘাটতি এ অর্থ পূরণের উত্স হতে পারে জরুরি অবস্থায় সম্পত্শালীদের ওপর কর অর্থাত্ ওয়েলথ ট্যাক্স আরোপ (৩০ হাজার কোটি টাকা), পাচারকৃত অর্থ ও কালো টাকা উদ্ধার (৬০ হাজার কোটি টাকা)। এখানে অর্থনীতি শাস্ত্রের কয়েকটি প্রমাণিত-পরীক্ষিত সত্য কথা উল্লেখ জরুরি : ওয়েলথ ট্যাক্স বৈষম্য হ্রাস করে; অর্থ পাচার ও কালো টাকা বৈষম্য বাড়ায়; সম্পত্শালীদের ওপর ট্যাক্স কমালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ে না; সমাজের নিচতলার ৯০ শতাংশ মানুষের ওপর কর কমালে তাদের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ে। করোনা ভাইরাস-১৯ প্রতিরোধে এই ১ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ ফল হবে বহুমুখী পজিটিভ—স্বল্প ও দীর্ঘ উভয় মেয়াদেই।

আমি বলেছি, ‘ক্ষতির সম্ভাবনা হয়তো বা অপরিমেয় কিন্তু ক্ষতি হ্রাস করতে হবে এবং সেটাও সম্ভব।’ সম্ভবত ক্ষতির গভীরতা হতে পারে কল্পনাতীত ও অপরিমেয়। বিষয়টার উদ্ভব হবে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়া অথবা গতি স্লথ হয়ে যাবার কারণে। বড়ো ধরনের অনিশ্চয়তা এবং এ অনিশ্চয়তা কতদিন চলবে, তা কেউই জানে না। আমার মতে, এসব কারণে সবচেয়ে মারাত্মক যে বিষয়টা সমাগত—এপ্রিল-মে মাসের মধ্যেই সম্ভবত—তা হলো হয়তো বা খাদ্যের পরিমাণে ঘাটতি থাকবে না কিন্তু গ্রাম-শহর নির্বিশেষে দরিদ্র-বিত্তহীন-নিম্নবিত্ত মানুষের ঘরে খাবার থাকবে না, তারা সন্তান-সন্ততিসহ অভুক্ত-অর্ধভুক্ত থাকতে বাধ্য হবেন। কারণ যেসব মানুষ (খানা) ‘দিন আনে দিন খায়’ তাদের ‘দিন আনা’ বন্ধ হয়ে গেলে তারা খাবেটা কী? আর কাজ না থাকলে তো ‘দিন আনা’ বন্ধ হয়ে যাবে। এ এক সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষাবস্থা। সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষাবস্থা এড়াতে জরুরি খাদ্য সরবরাহ নিয়ে দুটি বিষয় নির্ধারণ জরুরি। প্রথমত, যেসব খানা খাদ্য বরাদ্দপ্রাপ্তি যোগ্য তাদের তালিকা প্রণয়ন; দ্বিতীয়ত, তালিকাভুক্ত খানার মধ্যে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সেক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি বরদাস্ত না করা। দুটি কাজই গুরুত্বপূর্ণ এবং হতে হবে তুলনামূলক অভিযোগবিহীন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এ বিষয়ে জরুরি বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এখনই।

দুর্দশাগ্রস্ত অভুক্ত প্রতিটি মানুষকে খাদ্য বাবদ দৈনিক কমপক্ষে গড়ে ৭৫ টাকা বরাদ্দ করতে হবে (হিসেবটি করা হয়েছে খানাভিত্তিক আয়-ব্যয় জরিপ ২০১৬-এর দারিদ্র্যের নিম্নরেখার সঙ্গে মূল্যস্ফিতি যোগ করে)। সেক্ষেত্রে প্রতিদিন সারাদেশে লাগবে ৪৫০ কোটি টাকা অর্থাত্ মাসে ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ছয় মাস চালাতে হলে লাগবে ৮০ হাজার কোটি টাকা। যেখানে শিল্প মালিকদের জন্য আপাতত ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন আর্থিক ও নীতি সুবিধাসহ আরো অনেক সুবিধে দেওয়া হবে, সেখানে দুর্দশাগ্রস্ত অভুক্ত-অর্ধভুক্ত মানুষ বাঁচাতে তাদের মধ্যে খাদ্য বাবদ ছয় মাসের জন্য ৮১ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ যে কোনো বিবেচনায় ন্যায্য বরাদ্দ। আবার ঐ বরাদ্দ ফল কিন্তু পরবর্তীকালে পুঁজির মালিকরাই আনুপাতিক বেশি হারে ফেরত পাবেন কারণ তাদের দরকার হবে সুস্থ শ্রমিক। আর ঐ সুস্থ শ্রমিকরাই দেশজ উত্পাদন বাড়াবেন এবং একই সঙ্গে সত্যিকার অর্থে সুস্থ থাকলে তাদের উত্পাদনশীলতা বাড়বে, বাড়বে প্রবৃদ্ধি। শেষ বিচারে আনুপাতিক হারে এ সবের বেশি অংশের ফল ভোগ করবেন পুঁজির মালিক ও তাদের স্বার্থবাহীরা।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
০২ জুন, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন