পরাজয়ে ডরে না বীর
জয়া ফারহানা১৮ জুলাই, ২০১৭ ইং
পরাজয়ে ডরে না বীর
কে বীর? সর্বক্ষণ যিনি সৈন্যদের জয়ের স্বাদ দেন, তিনি? নাকি যুদ্ধক্ষেত্রে জয় পরাজয় উভয় সময়, পালিয়ে না গিয়ে সৈন্যদের যিনি বীরের মতো অভয় দেন, তিনি? বীর ধারণাটি আসলে এক রকম মিথ। মধ্যযুগ পর্যন্ত কোনো মানুষকে বীর হিসেবে ধরা হতো না। দেবতারাই তখন বীর। মঙ্গলকাব্যের পাতায় পাতায় দেবতারূপী এইসব বীরদের বন্দনা কাহিনি লেখা আছে। একজনের কথা বলা যাক। ইনি অন্ধ দেবী মনসা। এই দেবীর ভীষণ ইচ্ছা চাঁদ সওদাগরের পূজা পাওয়ার। অভিজাত চাঁদ সওদাগর সাপরূপী মনসা দেবীকে পূজা দিতে নারাজ। এই নারাজিই কাল হয় চাঁদ সওদাগরের জন্য। দেবী মনসা দৈব ক্ষমতা প্রয়োগ করে চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্য তরী ডুবিয়ে দেন। বিশাল সওদাগরী বাণিজ্য হারিয়ে চাঁদ সওদাগর পথের ভিখারি বনে যান। পদে পদে হেনস্থা এবং বিপদে ফেলেও তাকে বশ্যতা মানাতে ব্যর্থ হওয়ায় ছেলে লখিন্দরের বাসর ঘরে ঢুকে শেষ পর্যন্ত তাকে মেরেই ফেলেন। এত কিছুর পরেও মনসার কাছে নত হননি চাঁদ সওদাগর। যদি বলি, বাঙালির প্রথম বীর চাঁদ সওদাগর বোধ হয় ভুল বলা হয় না। যুদ্ধে হেরে যাবেন জেনেও যে যোদ্ধা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের মাঠে লড়াই চালিয়ে যান তিনিই জয়ী। জয় ব্যাপারটা আসলে জয়ী হওয়া নয়। জয়ী হওয়ার স্পিরিটই জয়। লড়াকু মনোভাবটাই জয়। একই কারণে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ওল্ড ফিশারম্যান পরাজিত হয়েও জয়ী। জয়ী হতে পারবেন না জেনেও অসীম ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামা বীর বা আইকন বিরল এখন। প্রমাণ নিন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকের জরিপে উঠে এসেছে এই তথ্য। তরুণদের ৮২ শতাংশের কোনো আইকন নেই। রাজনীতিতে কাউকে তারা রোল মডেল ভাবে না। ৮২ শতাংশ তরুণ কাউকে রোল মডেল ভাবতে পারছে না! এই ফলাফল দেশে আইকন সংকটের বার্তা দেয়। আইকন হিসেবে কেউই সফল নন তবে?

কোনটি সাফল্য কোনটি ব্যর্থতা, যদিও সেটা নির্ভর করে ধারণাকারীর চিন্তা বা দর্শনের উপর। জয় পরাজয়ের ব্যাপারেও ওই একই কথা। আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে জয় পরাজয় বিচারের পদ্ধতি কোনো নৈতিক মানদণ্ডের উপর দাঁড়িয়ে নেই। যে কারণে এই সমাজে সবচেয়ে খারাপ মানুষটিকেও আমরা সফল বলছি। সত্ মানুষগুলোকে বলছি ব্যর্থ। শুধু ব্যর্থও নয়, পরীক্ষিত ব্যর্থ। সাফল্য বা ব্যর্থতার মানদণ্ড কেবল ক্ষমতায় যাওয়া বা না যাওয়ার উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। এটা মুশকিল। যেকোনো অনৈতিক উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থের মালিকরা বড় বড় দলের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠেছেন। নির্বাচনী সংস্কৃতিতে ভালো মানুষের মূল্য নেই। ভালো মানুষরা নির্বাচনে পরাজিত হন। তামাশার নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে কোনো কথা হয় না কিন্তু ওই ব্যবস্থার অধীনে পরাজিত ভালো মানুষকে তামাশার পাত্র বানিয়ে দেওয়া হয়। হেন কোনো অপবাদ নাই যা শুনতে হয় না তাদের। নীতিহীনদের সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য ক্ষতিকর। সেটা নীতিহীনরাও বোঝেন। যে কারণে দেশ বসবাস উপযোগী নয় বিবেচনায় সেকেন্ড হোমের আবেদন করেন। 

সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা একটি দেশ পেয়েছি ঠিকই কিন্তু অস্বীকারের উপায় নেই যে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্র অনুযায়ী নীতি নৈতিকতা নির্ভর দেশ আমরা এখনো গড়ে তুলতে পারিনি। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থেকেছেন, ক্ষমতাসীন সেইসব গোষ্ঠীর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সুবাদে অনৈতিক অন্যায্য অর্থ বিত্ত প্রতিপত্তির পাহাড় গড়ে তুলেছেন একটি শ্রেণি। কোনো হাওয়াই আওয়াজের উপর একথা বলছি না। পত্রিকায় লেখা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের জন্য অন্তত আরো কয়েক হাজার বাংলাদেশির আবেদনপত্র পাইপ লাইনে আছে। এই রিপোর্টের পাশাপাশি ‘ত্রাণের জন্য হাহাকার’ শিরোনামে অন্য রিপোর্টও আছে যে রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে ১৩ জেলার কয়েক লাখ বন্যাদুর্গত মানুষের কাছে সামান্য সাহায্য ছাড়া আর কিছুই পৌঁছায়নি। হতে পারে দ্বিতীয় রিপোর্টই মিথ্যা, অতিরঞ্জিত। কিন্তু দেখেছি, টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে ত্রাণের জন্য মুখিয়ে থাকা মুখগুলো। দেখেছি তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সংকল্প, স্পৃহা, স্পিরিট। এখন কোন মানুষগুলোকে জয়ী বলবো? মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম আবেদনকারীদের, নাকি দুর্গত এলাকায় ফার্স্ট হোম তলিয়ে যাওয়া ত্রাণের জন্য আবেদনকারীদের? কাহলিল জিব্রানের একটি বাণী মনে পড়ছে। যে মানুষটি অপরাধ করে সেই অপরাধী তো অর্ধেক মানুষ, তার বাকি অর্ধেকটা এখনো ঐশ্বরিক আলোয় পূর্ণ। এও তো ঠিক যে সেকেন্ড হোম আবেদনকারীদের ভেতরে যে অর্ধেক ভালো মানুষটি ছিল, সেই ভালোত্বটুকুকে লালন করার পরিবেশ কোনো শাসন ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি। দেশকে বিপদাপন্ন ভেবে দেশ থেকে যারা পালিয়ে বাঁচতে চান তারা বীর নন।

জীবন প্রতি মুহূর্তের যুদ্ধক্ষেত্র। প্রতি মুহূর্তের এই যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করে যাওয়াটাই বীরত্ব, পালিয়ে যাওয়া নয়। বহুমাত্রিক সংকট এবং প্রতিকূল পরিবেশেও এখনো যারা আইকন আশা করি শেষ পর্যন্ত তারা লড়াই চালিয়ে যাবেন। পরাজিত হলেও। 

n লেখক : প্রাবন্ধিক

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৮ জুলাই, ২০১৭ ইং
ফজর৩:৫৬
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৩
সূর্যোদয় - ৫:২১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
পড়ুন