বঙ্গবন্ধুর জীবনী, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও গৌরবগাঁথা যথাযথভাবে পৌঁছে দিতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ পৌঁছে যাক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে
বঙ্গবন্ধু স্মরণে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের ছবিটি এঁকেছে রিদওয়ান ইবনে সামাদ (১২)

বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ - এই তিনটি শব্দ একই সুতোয় গাঁথা। বাঙ্গালীর ইতিহাসের মহানয়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও গৌরবগাঁথা যথাযথভাবে পৌঁছে দিতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে রয়েছে চিরন্তন প্রেরণার উৎস। তরুণ প্রজন্ম যেন সেই ইতিহাস সঠিকভাবে অনুধাবন করে আর বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথে নিজেদেরকে পরিচালিত করে, জাতীয় শোক দিবসে জাতির পিতাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সেই ভাবনার কথাই লিখেছেন কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। এটি গ্রন্থনা করেছেন সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার


কালের যাত্রায় চিরঞ্জীব বাঙ্গালীর বঙ্গবন্ধু

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

সাবেক উপাচার্য ও অধ্যাপক, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

৪২ বছর আগে এমন একটি দিনে শুধু বাংলাদেশ নয়, ধরিত্রীর অবারিত ইতিহাসে সবচেয়ে নিকৃষ্ট-নৃশংস-বর্বরতম যে ঘটনাটি সমগ্র বিশ্ববাসীকে অবাক বিষ্ময়ে দেখতে হয়েছে, সেটি হল সপরিবারের এ জাতির জনক, রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্মম হত্যকান্ড। এই হত্যাকাণ্ড শুধু বাঙ্গালী নয় বিশ্বের সমগ্র শুভ, মঙ্গল ও কল্যাণকামী বিবেকবান জনগোষ্ঠীকে কাঁদিয়েছে।

বাংলার সমাজ ইতিহাস প্রায় তিন হাজার বৎসরের পুরনো। এই ইতিহাস শুধু ভিনদেশী শাসকদের শাসনের কথা চিত্রিত করেনি, করুণভাবে উল্লেখ করেছে তাদের শোষণ প্রক্রিয়া এবং এতদঅঞ্চলের জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা-বৈষম্যের নির্মমগাঁথা। আর্য, দ্রাবিঢ়, রাঢ়, মৌর্য, তুর্কী, পাঠান, মোগল, ইংরেজ, পাকিস্তান শাসিত এ পূর্ব বাংলাকে সকলেই পরম্পপরায় এক পশ্চাৎপদ, অনগ্রসর ও অনড়সমাজে পরিণত করেছে। আমরা যাকে বাংলার স্বাধীন নবাব হিসেবে জানি তিনি বাঙ্গালী ছিলেন না, ছিলেন তুর্কী। তাঁর মাতৃ ও দাপ্তরিক ভাষা ছিল ফার্সী। এই তিন হাজার বছরের বিশ্লেষণে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, জাতির জনক বঙ্গালীর হৃদয়ের শ্রদ্ধা ও ভালবাসার অকৃত্রিম বন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই হচ্ছেন এই বাংলার সর্বপ্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রনায়ক। এ জন্যই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলার ইতিহাসে নয়, ভারতবর্ষসহ বিশ্ব ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হিসেবে সুঅধিষ্ঠিত।

ষোড়শ বা সপ্তদশ শতাব্দীতে বহু বিদেশী পর্যটকের কাছে এ অঞ্চল খুবই আকর্ষণীয় ছিল বহুবিধ উৎপাদন সামগ্রীর জন্য। মসলিনসহ নানাবিধ সুতি-বস্ত্র, স্বর্ণ, রৌপ্য, অলংকার, মসলা, নীল ইত্যাদির জন্য এটি ছিল প্রাচ্যের একটি সমৃদ্ধ ভূ-খন্ড। কিন্তু এদেশ কেন এখনো উন্নয়নশীল দেশ, তা উপলব্ধি করতে হবে। অতীতের বৈষম্য চিত্র যদি বিশ্লেষণ না করা হয় তাহলে বুঝা যাবেনা কেন এ অঞ্চলে মানুষ এত বেশী স্বাধীনতাপিপাসু হয়েছে। আর্থ-সামাজিক প্রচন্ড বৈষম্য সৃষ্টির মাধ্যমে বাঙ্গালী জাতিকে নিষ্পেষিত করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এদেশের আপামর জনগণ বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদে উদ্ধুদ্ধ হয়ে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এক কঠিন স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রায় ধংসস্তুপে পরিণত একটি দেশের পুনর্গঠনে কার্যকর পদক্ষেপ এবং বিশাল সাফল্য অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুরা ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করার মাধ্যমে দেশকে অনগ্রসর করা চেষ্টা চালায়। আজ সে জন্যই নতুন করে এবং বার বার বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা, সমাজ, রাজনীতি-রাষ্ট্র ইত্যাদি আধুনিক ও প্রাগ্রসর দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে সুষ্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যেন বিভ্রান্তি ও নষ্ট কৌশল দ্বারা জাতি কখনো পথ না হারায়।

বঙ্গবন্ধু বাঙ্গালী জাতির মহান কিংবদন্তী নেতা ও বাঙ্গালী জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান। আজকের দিনে আবারও তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং স্বর্গের অতি উঁচুমার্গের আসনে মর্যদাসীন করার জন্য স্রষ্টার দরবারে প্রার্থনা জানাচ্ছি।


১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ছিল এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ

সৈয়দ আবু তোয়াব শাকির

সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বাঙ্গালীর স্বাধিকারের সংগ্রাম বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে গড়ায় ১৯৭১-এ। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের এনে দিয়েছে বহু প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা, স্বতন্ত্র ভূখণ্ড। এই চূড়ান্ত স্বাধীনতা লাভের প্রধান রূপকার হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫, মাত্র তিনবছর তিনি দিয়েছিলেন তার প্রজ্ঞাময় নেতৃত্ব। ১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫ সপরিবারে নৃশংসভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে একে একদল সেনা সদস্যের বর্বোরোচিত হামলা বলে মনে হলেও এ ছিল এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।

দীর্ঘ সংগ্রামমুখর জীবনের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব হয়ে উঠেছিলেন বাঙ্গালীর মুক্তিসংগ্রাম ও জাতীয়তাবাদের প্রতীক। পাকিস্তান এবং সেদেশীয় দোসররা বাংলাদেশের সার্বভৌম অস্তিত্বকে মেনে নেয়নি কোনোভাবেই। তাদের সর্বাত্মক প্রয়াস ছিল বাংলাদেশের স্বাধীন এ পথচলাকে রুখে দেয়ার। ১৫ই আগস্ট তাঁরাই সক্রিয় হয়ে উঠেছিল প্রবলভাবে, সঙ্গে ছিল মহাশক্তিধর পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৭৫ পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পনেরো বছরের জন্য চলে যায় উর্দিপরা শাসকদের হাতে। রুদ্ধ হয় মানুষদের গণতান্ত্রিক অধিকার। এ দেড় যুগ বাংলাদেশকে যেনো ভিন্ন ছাঁচে ঢেলে বদলে ফেলার চেষ্টা চলে। স্বাধীনতার জন্য যে বারুদময় মুক্তিযুদ্ধ হলো, বঙ্গবন্ধু যে বাঙ্গালী জাতির পিতা তা বেমালুম চেপে যাওয়া শুরু হলো, ঢেকে ফেলা হলো পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর রাজাকার আল-বদরদের বিভৎস বর্বরতার কথা অনেকাংশে। পরবর্তী প্রজন্ম যেন না জানে এ স্বাধীনতার মূল সুর, যেনো বুঝতে না পারে এই মুক্তির মূল্য, সে লক্ষ্যেই বিকৃত করা শুরু হল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। কেন ১৫ই আগস্ট প্রাণ গেল জাতির পিতার –তার সন্তানদের হাতেই, এ প্রশ্ন সামনে উঠে আসেনি বহুকাল। মুক্তিসংগ্রাম, যুদ্ধের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুকে জানা কেন এতো প্রয়োজন? কারণ এতে নিজের পরিচয় জানা যাবে। বাঙ্গালী জাতির প্রকৃত পরিচয় প্রোথিত আছে হাজার বছরের ইতিহাসের ভাজে ভাজে। আর সে পরিচয় পরিপূর্ণ আকৃতি নিয়ে প্রকাশ লাভ করে বৃটিশদের সময়কালে এবং পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে। আর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আত্মলাভ করে একটি নতুন দেশ বাংলাদেশ, যে আত্মপরিচয় প্রাপ্তির মহানায়ক হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু সমার্থক শব্দ। তাঁর জন্ম না হলে বাংলাদেশ হোতো না। তাই এ অতীত, এ সত্যকে না জানলে চেনা হয়ে উঠবেনা এ মাতৃভূমিকে, এ ভূমির মানুষগুলোকে। প্রকৃত ইতিহাসের শিক্ষা আমাদের নতুন প্রজন্মকে করবে প্রকৃত দেশপ্রেমিক এবং আত্মত্যাগী। এমন একটি জাতি সৃষ্টির স্বপ্নই আজীবন লালন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। শোকের এই দিনটিতে জাতির পিতার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।


যে ভোর আসার কথা ছিল

শান্তা তাওহিদা

সহকারি অধ্যাপক ও চেয়ারপার্সন, যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল বঙ্গবন্ধুর। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তাঁর আগমনের প্রতীক্ষায়। “এক নেতা এক দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ” স্লোগানে সেদিন সেজেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি দেয়াল। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল টিএসসি থেকে টেকনাফ, পলাশী থেকে তেতুলিয়ায়- কখন আসবেন কবি? সে রাতে কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি বাঙ্গালি জাতির জীবনে অপেক্ষার সেই ভোর আর কোনদিন আসবে না!

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ জানে না, রাতের আধারে ৩২ নম্বরে চক্রান্তকারীদের বুলেটে রক্তের বন্যায় কোন ভোর রচিত হচ্ছিল। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ বুক চিরে রক্তিম যে ভোর সেদিন এসেছিল, সে ভোর কেউ চায়নি!

১৪ আগস্ট, ১৯৭৫ রাতে আনন্দে থইথই করছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। দেয়াল লিখন, ব্যানার, ফেস্টুন আর স্বাগত তোরণে তোরণে ছেয়ে গিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকা। টিএসসি মিলনায়তনের ভেতরে করা হয় মূলমঞ্চসজ্জা । মঞ্চে সেট করা হয়েছিল ১৬টি মাইক্রোফোন। রাত ১২টা র মধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে বঙ্গবন্ধুর হাস্যোজ্জ্বল মুখের ১২ ফুট উঁচু প্রতিকৃতি। টিএসসির ভেতরে মাঠের মাঝখানে করা হয়েছিল এই পোর্ট্রেটটি। টিএসসির সড়কদ্বীপের স্বোপার্জিত স্বাধীনতা সেদিন ছিল না। এখানে জাতীয় ফুল শাপলার নকশাসহ ১৬ ফুট উঁচু একটি স্বাগত সজ্জা করা হয়েছিল । কলা ভবনের মূল সিঁড়ির দুই পাশে করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর দুটি ম্যুরাল চিত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাজসজ্জার প্রস্তুতিটা শুরু হয়েছিল আরও চার-পাঁচ দিন আগে থেকেই।

শেখ কামলের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোসহ আমন্ত্রণপত্র আগেই পৌঁছে গেছে সবার কাছে। যেখানে লেখা ছিল, ‘জাতির জনক মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় চ্যান্সেলর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুভাগমন উপলক্ষে আগামী ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, বেলা ১১টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপাচার্য ও সিন্ডিকেটের সদস্যবৃন্দ আপনাকে সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।’- কার্ডটি দেখার সৌভাগ্য হয় ডাকসু সংগ্রহশালায়। ডাকসু সংগ্রহশালার সংগ্রাহক ও আলোকচিত্রী গোপাল দাসের মা সুমতিবালার সাধ ছিল ‘শেখ সাবেরে একনজর দেখার’। মায়ের কথা শেখ কামালের কাছে বলার সাথে সাথেই আমন্ত্রণপত্রটি পেয়েছিনেন গোপালদা।

সেদিন রাতে সুমতিবালা একটা সুন্দর ছাপা শাড়িও বের করে রেখেছিলেন সকালে পরে যাওয়ার জন্য। ভোরে ছেলের মুখে খবরটা শুনে কেঁদে ফেলেছিলেন সুমতিবালা। কার্ডটি ডাকসু সংগ্রহশালায় দিয়ে দেন সবাইকে দেখানোর জন্য। সেদিন ভোরে রেডিও টিউনিং করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু নেই খবরটা পেয়েছেন অনেকেই। ভোরের আলো ফুটতেই রোকেয়া হল থেকে সাদা জমিনে লাল পাড়ের শাড়ি পরে খোঁপায় বেলি ফুল গুঁজে বেরিয়েও এসেছিল মেয়েরা। অথচ ওরা তখনো জানত না, কী ঘটে গেছে রাতের আঁধারে।

যাদের মুখে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট রাতের গল্প শোনার সৌভাগ্য হয়, ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক স্যার, শিল্পী আনোয়ার হোসেন, গোপাল দাস, ঢাবি সাবেক শিক্ষার্থী আমার বাবা মো. তৌহিদুজ্জামান- সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। চক্রান্তকারীরা ইতিহাসকে যতই ধামাচাপা দিক না কেন, সত্য-নদী এভাবেই সবার মুখে মুখে কালে কালে বয়ে চলে। কিন্তু যখন আমাদের গল্পের জাদুকররা থাকবেন না তখন কী হবে? আজ থেকে পঞ্চাশ কিংবা একশ বছর পরের বাংলাদেশের তরুণেরা জাতির পিতার এ গল্প শুনবে কার কাছে?

আমরা তাই তাকিয়ে আছি সত্য-গল্পের জাদুকরদের দিকে। বাংলাদেশের বুকে আবারও সময় এসেছে, কালো হরফে সোনালি ইতিহাস লেখার।

আমার এ আর্জি পৌঁছে যাক, এদেশের সকল সত্য-গল্পের জাদুকরদের কাছে।


জাতির পিতার স্বপ্নপূরণ করবার দায়িত্ব নিতে হবে নতুন প্রজন্মকে

রুদমিলা মাহবুব

শিক্ষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

বঙ্গবন্ধু -যদি এই শব্দটিকে ব্যবচ্ছেদ করি তাহলে যা দাঁড়ায়, তা হল বঙ্গ বা বাংলাদেশের বন্ধু, যে বন্ধুর অবদান ছড়িয়ে আছে বাংলার পথেপ্রান্তরে সর্বত্র। যিনি না থাকলে বাংলাদেশ নামের এই দেশটির জন্ম হোতো না।

আমি যদি আমার জীবনে বঙ্গবন্ধু নিয়ে কথা বলি, তাহলে যে মূর্তিটি আমার সামনে ভেসে ওঠে, তা একজন বজ্রকঠিন মানবের। যিনি তাঁর শাণিত কণ্ঠ, প্রবল ব্যক্তিত্ব দিয়ে জয় করে নিয়েছেন লক্ষলক্ষ মানুষের হৃদয়। বাঙ্গালীর ভাগ্যাকাশে যখন দুর্যোগের ঘনঘটা দেখা দিয়েছিল, তখনই আবির্ভাব ঘটেছিল তাঁর।

আমি এমন একটা পরিবারে বড় হয়েছি, যেখানে বইপড়াটা নিয়মিত অভ্যাসের বিষয় ছিল। ফলে ছোটবেলা থেকেই আমি বই পড়তে ভীষণ ভালোবাসি। যেসব বইগুলো পড়তাম, তার মধ্যে একটা বড় অংশই ছিল বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। ছোটবেলা থেকে বঙ্গবন্ধুকে জানার প্রবল আগ্রহ ছিল। আমি ইতিহাস ও মুক্তিসংগ্রামের গল্পগুলো অনুভব করার জন্য পড়তাম। আখতার মুকুলের লেখা ‘মুজিবের রক্ত লাল’ বইটি ছিল আমার প্রথম আকর্ষণ। এখনও মনে পরে, আমার বাবা বইটি কিনে এনে আমাকে দিয়ে বলেছিলেন, তুই যদি জীবনে অনেকবড় কিছু নাও হোস তাতে দুঃখ থাকবেনা, কিন্তু এই দেশের ইতিহাস তোকে জানতে হবে, না’হলে মানুষ হিসেবে সেটা হবে তোর সবচেয়ে বড় লজ্জার বিষয়। বঙ্গবন্ধুকে ন্যাক্কারজনকভাবে হত্যার ইতিহাস জানতে হবে, যে মানুষটিকে ছাড়া এই দেশই হোতো না।

বইটির প্রচ্ছদের ছবিতে সেই বলিষ্ঠ মানুষটি তাঁর মাকে জড়িয়ে ধরে হাসছিলেন। আমাদের ইতিহাসের এই মহানায়ককে কেউ এত রূঢ়ভাবে কেন হত্যা করতে পারে, সেটা ছিল আমার ছোট্টমনে বিরাট প্রশ্ন। আমি কোনো উত্তর খুঁজে পাইনি।

বঙ্গবন্ধু পুরো দেশের। সব মানুষের। কোনো দল বা গোষ্ঠীর নয়। কিন্তু এ নিয়ে আমরা আজকাল বিভক্তি দেখি। এটা কি আদৌ থাকা উচিত? বর্তমান প্রজন্ম কি জানে সঠিক ইতিহাস? একজন বঙ্গবন্ধুর অভাব আমাদের দেশকে পিছিয়ে দিয়েছে শতবছর। আমরা যদি পৃথিবীর সেরা রাজনীতিবিদ ও তাঁদের দেয়া শ্রেষ্ঠ ভাষণের তালিকা দেখি, এরমধ্যে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর ৭ই মার্চের ভাষণ অন্যতম। এই ক্ষুদ্র দেশের ইতিহাস একজন মহান নেতা ছিলেন, যাকে কোনো দল বা গোষ্ঠীতে বিভক্ত করা কোনোভাবেই সমিচীন নয়।

এখনকার প্রজন্ম সেভাবে ইতিহাস জানতে আগ্রহী কীনা আমার জানা নেই। যদি এই ইতিহাসগুলো প্রতিটি শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়, তবে অনেকেই হয়তো জানবে, কিন্তু বেশিরভাগই তা তাদের পরিক্ষার খাতার নম্বর বাড়ানোর জন্য জানবে। কিন্তু এমনটা হলে চলবেনা। বাড়াতে হবে আগ্রহ, হৃদয় দিয়ে ধারণ করতে হবে এই ইতিহাস।

বঙ্গবন্ধু আমাদের রাষ্ট্রের নায়ক। তাঁকে সপরিবারে হত্যা করে নৃশংসতা ও অকৃতজ্ঞতার যে বিরল নজির স্থাপন করা হয়েছে, তার পাপমোচন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু, আমরা যদি সঠিক ইতিহাসটা জানি এবং দেশকে ভালোবাসি, তবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে। জাতির পিতার স্বপ্নপূরণ করবার দায়িত্ব নিতে হবে নতুন প্রজন্মকে।


মুক্তিযুদ্ধ মানেই বঙ্গবন্ধু

সাহস মোস্তাফিজ

প্রভাষক, জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

আমি আমার ক্লাসে শিক্ষার্থীদের প্রায়ই বলি, আমরা ভীষণ সৌভাগ্যবান যে আমাদের একটা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আছে। যে জাতির ১৯৭১ এর হাজার হাজার গল্প জমা আছে, সে জাতির প্রেরণা নেবার জন্য আর কোন গল্প না জানলেও চলে। মুক্তিযুদ্ধ মানেই বঙ্গবন্ধু। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে অপশক্তিরা চেয়েছিলো এ দেশের এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিতে। তবে সেই অপশক্তি যে সফল হয় নি, তার প্রমাণ আমাদের আজকের তরুণেরা। যে তরুণেরা বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরছে শ্রেষ্ঠ মহিমায়, প্রায় সকল ক্ষেত্রেই।

বিশ্বায়নের এ যুগে তথ্য ও বিনোদন এর প্রবাহ এত বেশি যে মানুষ খুব সহজেই ভুল পথে পা বাড়াতে পারে। আজকের এই বিশ্ব একটা ‘ওপেন ওয়ার্ল্ড’ এ পরিণত হয়েছে। ফলে আমাদের দায়িত্ব বেড়েছে শিক্ষার্থীদের জানার পথ তৈরি করে দেয়ার। এ কারণে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আরও বেশি সংযুক্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করি। সবচেয়ে বেশি যেটা জরুরি সেটা হলো, শিক্ষার্থীদের ভেতর একটা অনুভুতি সৃষ্টি করে দেয়া। আমি আমার ক্লাসে মুক্তিযুদ্ধের চিঠি পড়ে শুনিয়েছি। আমি ওদের চোখে আগুন দেখেছি, কান্না দেখেছি। জাতির জনকের লেখা অসমাপ্ত আত্নজীবনী পাঠ আবশ্যিক হতে পারে। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে দেয়া পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেই ভাষণ স্কুল পর্যায়ে অ্যাকাডেমিক কাজের অংশ হিসেবে প্রদর্শন ও বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

মনে রাখতে হবে, একটা জাতির কিছু বিষয়ে দ্বিমত পোষণের কোন সুযোগ নেই। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু আমাদের তেমন দুটি বিষয়। এতে রাজনীতি না মিশিয়ে বরং সমগ্র বাঙালি জাতির অভিন্ন প্রেরণা হিসেবেই উপস্থাপন করতে হবে। গোটা দুনিয়া যেন আজকের তরুণদের চোখে বঙ্গবন্ধুর তেজ ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখতে পায়, সেই ব্যবস্থা আমাদেরই করে দিতে হবে।

বঙ্গবন্ধুকে প্রাণে মারলেও তাঁর অসীম সাহসিকতা আর স্বপ্ন কোটি বাঙালির প্রেরণা হয়ে আছে। তাই তো আজকের এই বাঙালি তরুণ অদম্য। সংগ্রাম আর লড়াই আমাদের রক্তে। তাই আমাদের দমানো যাবে না কখনোই। আজকের তরুণেরা পরিচিত অপরিচিত যে কোন মানুষের জীবন বাঁচাতে মুহুর্তেই ছুটে আছে রক্ত দিতে। আজকের তরুণেরা এভারেস্ট জয় করে, ক্রিকেটে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবার সাহস দেখায়।

ইত্তেফাক/এসটিএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত