জাতিসংঘের 'রিয়েল লাইফ হিরো' স্বীকৃতি পেলেন চার বাংলাদেশি তরুণ

জাতিসংঘের 'রিয়েল লাইফ হিরো' স্বীকৃতি পেলেন চার বাংলাদেশি তরুণ
রিজভী, সৈকত, সিফাত ও আঁখি

রূপালি পর্দায় প্রতিটি সিনেমায় একজন করে হিরো থাকেন। যেখানে তাদের দেখা যায় আদর্শ মানবতার মূর্ত প্রতিক রূপে। আর সিনেমাপ্রিয় মানুষগুলোর মধ্যে অনেকে প্রায়শই রূপালি পর্দার সেই হিরোদের বৈশিষ্ট্যগুলোকে অনুকরণ করেন, এমনকি তা নিজেদের বাস্তব জীবনে ধারণ করে হয়ে উঠতে চান বাস্তব জীবনের হিরো। এই চেষ্টায় সবাই সফল না হলেও কেউ কেউ অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে মানবকল্যাণে কাজ করে বাস্তব জীবনে ঠিকই পরিচিত হয়ে ওঠেন একজন হিরো হিসেবে। এমনই চার বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীকে তাদের মানবিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ 'রিয়েল লাইফ হিরো' অর্থাৎ বাস্তব জীবনের হিরো হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘ।

গত ১৯ আগস্ট বিশ্ব মানবিক দিবস উপলক্ষে তাদের মানবিক কাজে অনুপ্রেরণা যোগাতে জাতিসংঘ এই চার বাংলাদেশি তরুণকে বিশেষ এই স্বীকৃতি দেয়। এদের প্রত্যেকেই মানবিক কার্যক্রমের স্ব স্ব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বলে মনে করেছে জাতিসংঘ। আর এই হিরোরা হলেন বেসরকারি সংস্থা ব্র‍্যাকে কর্মরত স্থপতি রিজভী হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভীর হাসান সৈকত, অনুবাদক সিফাত নুর এবং আঁখি।

স্থপতি রিজভী হাসানের বেড়ে ওঠা ঢাকায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় পড়ালেখা শেষে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র‍্যাকে কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের জন্য সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণের দায়িত্ব পান। তখনই তিনি দেখতে পান বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা মিয়ানমারের সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য স্বল্প খরচে আবাসনের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সেখানে তিনি লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতায় আক্রান্ত নারীদের সেবা প্রদানের জন্য স্বল্প খরচে নিরাপদ স্থান গড়ে তোলা শুরু করেন। এসব স্থানে রোহিঙ্গা শিবিরের নারীদের কাউন্সিলিংসহ নানা দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ব্যতিক্রমী এসব স্থাপনার মাধ্যমে বহু নারীকে নিরাপদে সেবা ও প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম হচ্ছে ব্র‍্যাক এবং ইউনিসেফ।

এদিকে করোনা মহামারির মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষার্থীরা যখন ক্যাম্পাস ছেড়ে বাড়ি চলে যাচ্ছিলেন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সৈকত ক্যাম্পাসে থেকে যান। উদ্দেশ্য, প্রান্তিক মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়া। এপ্রিল মাসের শুরু থেকে টানা ১১৬ দিন তিনি সহায়তা কার্যক্রম চালান। এরপর করোনা প্রকোপ কিছুটা কমে এলে এবং দেশে বন্যার প্রকোপ শুরু হলে তিনি সুনামগঞ্জে চলে যান বন্যা কবলিত মানুষকে সহায়তা করতে। বন্ধুবান্ধব এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে সেবামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন।

অনুবাদের কাজ করে বাস্তব জীবনের নায়ক হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি পাওয়া আরেক বাংলাদেশি তরুণ সিফাত নুর। জাতিসংঘ মনে করে, যেকোন সংকটের সময়ে খাবার, পানি ও আশ্রয়ের মতোই মানুষের মতোই মানুষের প্রয়োজন পড়ে তথ্য এবং যোগাযোগের। এসব তথ্য ও যোগাযোগ হতে হয় তাদের নিজস্ব ভাষায়। আর তখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে একজন অনুবাদকের কাজ। আর তাইতো সিফাতকে বাস্তব জীবনের নায়ক হিসেবে জাতিসংঘের ঘোষণার পেছনের কারণ, তিনি জটিল এবং জীবনরক্ষাকারী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাংলায় অনুবাদ করেছেন। ট্রান্সলেটর উইদাউট বর্ডারস নামে একটি সংস্থার হয়ে অনুবাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেন সিফাত। এছাড়াও আইএফআরসি ও ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার হয়ে কোভিড-১৯ নিয়ে শব্দ অনুবাদের মাধ্যমে আরো বেশি মানুষের কাছে জীবন রক্ষাকারী তথ্য পৌঁছে দিতে পেরেছেন তিনি।

বাস্তব জীবনের নায়ক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া আরেক বাংলাদেশি তরুণী আঁখি। একসময় দেশের আরো অনেক সুবিধাবঞ্চিত শিশুর মত আঁখিও নিয়োজিত ছিলেন শিশুশ্রমে। এরপর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন-এর সহায়তায় তিনি দর্জির কাজের প্রশিক্ষণ পান। সেই সাথে তাকে দেয়া হয় একটি সেলাই মেশিন ও কিছু কাপড়। সেখান থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন নিজের গার্মেন্টস কারখানা গড়ে তোলার। এদিকে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া শুরু করলে দেখা দেয় মাস্ক সংকট। তখনই মাস্ক তৈরি শুরু করেন এবং কমদামে স্থানীয় দরিদ্র মানুষদের মাঝে এসব মাস্ক বিক্রিও করেন।

জাতিসংঘের মত প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের কাজের এমন স্বীকৃতি পেয়ে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে স্থপতি রিজভী বলেন, 'আমার মনে হয়, আমার মত অন্যরাও কোনোধরনের স্বীকৃতির আশায় কাজগুলো করেনি। তবে, জাতিসংঘের এমন স্বীকৃতি অবশ্যই আরো ভালো কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করবে। বাকি তিন তরুণও প্রায় একই কথা বললেন। তাদের মতে, আমরা প্রত্যেকে নিজেদের দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেই কাজগুলো করেছি।

ইত্তেফাক/এসটিএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত