প্রথাগত ক্লাসরুমের পরিবর্তে জুম, গুগল মিট, ডিসকর্ড বা স্ল্যাক

কেমন চলছে অনলাইন ক্লাস

কেমন চলছে অনলাইন ক্লাস
কেমন চলছে অনলাইন ক্লাস

করোনাভাইরাসের প্রভাবে পুরো বিশ্বজুড়ে যে স্থবিরতা নেমে এসেছে, তার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে শিক্ষাঙ্গনে। গত কয়েকমাস ধরেই বন্ধ রয়েছে সব পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। উন্নত দেশগুলো অনলাইন মাধ্যমকে শিক্ষাক্ষেত্রে কাজে লাগাতে অভ্যস্ত হওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম চলছে বেশ ভালোভাবেই। কিন্তু বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে শিক্ষাব্যবস্থা শ্রেণিকক্ষেই অধিক নির্ভরশীল হওয়ায় সবার পক্ষে অনলাইন ক্লাসরুম চালু করা সহজ হচ্ছে না। ডিভাইসের অভাব, ইন্টারনেটের ধীরগতি কিংবা চড়াদামসহ নানাবিধ সমস্যা তো রয়েছেই। এসব প্রতিকূলতা পেরিয়ে গত কিছুদিন ধরে চলতে থাকা অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা কেমন —তা কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর কাছে জানার চেষ্টা করেছেন সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার


নাহিদা সুলতানা

সহকারী অধ্যাপক (ইংরেজী), মানবিক বিভাগ

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে ১৬ই মার্চ থেকে বন্ধ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন মেয়াদে বর্ধিত হয়ে এই ছুটি ৩রা অক্টোবর পর্যন্ত পৌঁছেছে। দীর্ঘ বিরতিতে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ক্ষতি পোষাতে সরকার অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পরামর্শে ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে অনলাইনে ক্লাস পরিচালনা করছে বিভিন্ন বেসরকারি ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। জুম, গুগল ক্লাসরুম বা মিট-এর মতো অ্যাপ ব্যবহার করে বহির্বিশ্বে হরহামেশা অনলাইনে ক্লাস পরিচালিত হলেও বাংলাদেশে এর ব্যাপকতা কম ছিলো।

গত কিছুদিন ধরে চলতে থাকা অনলাইন ক্লাসের বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে ডিজিটালি শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেকটা এগোচ্ছে। মহামারীর প্রাদুর্ভাবে যখন স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির তখন ঘরে বসেই শিক্ষাগ্রহণ নিঃসন্দেহে একটি অভাবনীয় সাফল্য। কিন্তু অনলাইন ক্লাসে যোগদানের ক্ষেত্রে রয়েছে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা। ব্যয়বহুল ও ধীরগতির ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ সরবরাহ বিভ্রাট, দুর্বল নেটওয়ার্ক, স্মার্ট ডিভাইস সঙ্কট, প্রযুক্তিগত অদক্ষতা, আর্থিক অসচ্ছলতা, করোনাকালীন মানসিক অশান্তি ইত্যাদি কারণে শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণের হার কম। তাছাড়া, অংশগ্রহণ করতে না পারা শিক্ষার্থীরা এক ধরনের বৈষম্যজনিত মনোকষ্টে ভোগে। উপরন্তু, ইউজিসি ও কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব জরিপ অনুযায়ী, উপরে উল্লিখিত সমস্যাগুলোর কারণে অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসের প্রতি অনাগ্রহী।

এখানে লক্ষণীয় যে, সরাসরি ক্লাসরুমের যেমন বিকল্প নেই তেমনি দুর্যোগের মুহূর্তে অনলাইন ক্লাসেরও বিকল্প নেই। তবে একথাও সত্য যে শুধু অনলাইন ক্লাসকেই প্রাধান্য দিলে চলবে না, কেননা এটি হচ্ছে অনলাইন পাঠ কার্যক্রমের বহু উপাদানের মধ্যে অন্যতম, একমাত্র নয়। পাশাপাশি যেসব বিষয়ে জোর দিতে হবে সেগুলো হচ্ছে বিভিন্ন মাধ্যমে — যেমন অডিও, ভিডিও রেকর্ডিং, স্লাইড, পিডিএফ, ওয়ার্ড ডক্যুমেন্ট, স্ক্যান, ইমেজ ইত্যাদি শিক্ষা উপকরণ সকল শিক্ষার্থীর কাছে সরবরাহ করা, নিয়মিত বাড়ির কাজ বা অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া, মৌখিক প্রশ্নোত্তর, কুইজ, আলোচনা বা ভাইভা নেয়াড় মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা এবং সর্বোপরি কোন পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়া হবে সেই সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।

ইতিমধ্যে ইউজিসি অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের সফট লোনের আওতায় স্মার্টফোন প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য স্বল্পমূল্যের ডাটা প্যাকেজ প্রয়োজন। দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে সকল সমস্যার রাতারাতি সমাধান অসম্ভব। তাই এখন দরকার সীমিত সুবিধা নিয়েই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার মানসিকতা ও প্রচেষ্টা।


এস এম ইমরান হোসেন

শিক্ষক, টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কোভিড-১৯ সারা পৃথিবীর প্রচলিত নানা হিসাব-কিতাব বদলে দিয়েছে। প্রায় সব দেশকেই একটি বড় সময়ের জন্য লকডাউনে যেতে হয়েছে। অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হয়েছে অনির্দিষ্টকালের জন্য। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। মার্চের শেষে যখন পুরো বাংলাদেশ প্রায় মাস কয়েকের সাধারণ ছুটিতে যায় তখন কেউই ভাবতে পারেননি কোভিড-১৯ নিয়েই মাসের পর মাস বাস করতে হবে আমাদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুন থেকেই অনলাইনে ক্লাস কার্যক্রম শুরু করে। বিষয়টি শিক্ষার্থীদের জন্য তো বটেই এমনকি বেশিরভাগ শিক্ষকের জন্যই একটি নতুন অভিজ্ঞতা। তবে নিঃসন্দেহে অনলাইন ক্লাস কখনোই সরাসরি ক্লাসের বিকল্প নয়। সরাসরি ক্লাসে যেভাবে শিক্ষার্থীদের সাথে মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ থাকে সেটি অনলাইন ক্লাসে সম্ভব হয়না। অনলাইন ক্লাসের বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীই এই করোনাকালে তাদের গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। কারো কারো গ্রামের বাড়ি প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্কের নিরবিচ্ছিন্ন সুবিধা নেই। অথবা কারো কারো হয়তো অনলাইন ক্লাস করার মতো ল্যাপটপ অথবা স্মার্টফোনই নেই। ডিভাইস থাকলেও আর্থিক মন্দায় উচ্চদামের ইন্টারনেট ডাটা প্যাক কেনা অনেক শিক্ষার্থীরই সাধ্যের বাইরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসব শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে তাদের অনলাইন ক্লাসের জন্য নানা শিক্ষা উপকরণ দেয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। তবে অনলাইনে ক্লাস হলেও কোন পরীক্ষা অনলাইনে নেয়া হচ্ছে না। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় খুললে এই ক্লাসগুলো সরাসরি ক্লাসরুমে আবার পুনরাবৃত্তি করা হবে। কাজেই অনলাইন ক্লাসের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের কোনভাবেই ক্ষতিগ্রস্থ হবার সুযোগ নেই। আমাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন যাতে কোনভাবেই সেশনজটের কবলে না পড়ে সেই জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগ। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, প্রায় ৮০-৯০ ভাগ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে উপস্থিত থাকছে। তবে ব্যবহারিক কোর্সগুলোতে অনলাইন ক্লাস খুব একটা কার্যকরি ভূমিকা পালন করতে পারছে না, কারণ অনলাইনে হাতে-কলমে দেখানোর সুযোগ নেই। আমাদের মনে রাখতে হবে এই মহামারির সময়ে অনলাইন ক্লাস আমাদের সামনে একটি বিকল্প তৈরি করেছে তবে সেটি কখনোই মানের দিক থেকে সরাসরি ক্লাসরুম কেন্দ্রিক শিক্ষা কার্যক্রমের বিকল্প নয়।


রুদমিলা মাহবুব

শিক্ষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

২০২০ আমাদের সকলের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। এবছরটি আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে সকল প্রতিকূলতার মাঝেও সামনে এগোতে হয়। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম ঠিক তেমনই একটি বিষয়। যেহেতু শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে এ মাধ্যমটি গতানুগতিক ধারার চাইতে ভিন্নধর্মী, এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা এতে অভ্যস্ত নই, তাই প্রথম দিকে একটু জড়তা কাজ করলেও সময়ের পরিক্রমায় আমরা মানিয়ে নিতে শুরু করেছি। ইন্টারনেট সংযোগের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিকুলতা থাকলেও বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতামূলক কার্যক্রম, যেমন বিডিরেন জুম শিক্ষকদের জন্য তৈরি করেছে নিরবিচ্ছিন্নভাবে ক্লাস নেবার ব্যবস্থা, যা সাধুবাদ পাওয়ার দাবিদার। এছাড়াও বড় শহরের রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামে প্রতিদিনের কর্মব্যস্ত সময়ের যে বড় অংশটুকু আমাদেরকে যানবাহনে বসে থেকে কাটাতে হয়, অনলাইনে শিক্ষাদানের জন্য আমরা সবাই সেই বিড়ম্বনা থেকেও মুক্ত। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে দেশের বাইরে থেকেও অনেক বিশেষজ্ঞরা আমাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, শিক্ষার্থীদেরকে লেকচার দিচ্ছেন, এটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এ কথাও সত্যি যে, ক্লাসরুমের মতো শিক্ষাদান এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভাবের আদানপ্রদানের বিষয়টি অনলাইনে সম্ভব হয়না, যার ফলে মুখোমুখি পাঠ্যদানের পরিতৃপ্তির জায়গায় কিছুটা হাহাকার থেকেই যায়। মুদ্রার এপিঠওপিঠের মতোই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও দু'টি দিক বিদ্যমান। কিছু প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। ক্লাস চলাকালীন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, শিক্ষার্থীদের ডিভাইসের সমস্যা, ক্লাসে পর্যাপ্ত উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়গুলোতে বেগ পেতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় 'বিইউএক্স' নামে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যেখানে শিক্ষার্থী কোনোকারণে লাইভ ক্লাসে অংশ নিতে না পারলে পরবর্তীতে রেকোর্ডেড লেকচার ও কোর্স কন্টেন্ট দেখে নিতে পারবে। এতে তাদের নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে নেয়া সহজ হচ্ছে। পাশাপাশি ওপেন বুক এক্সাম-এর মত সৃজনশীল প্রশ্নের মাধ্যমে পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। তবে অনলাইন পাঠ্য ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরী করতে হলে ইন্টারনেট সেবাকে আরও উন্নত করার কোন বিকল্প নেই। দেশের সকল জেলা, গ্রাম বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন টেলিকম কোম্পানিগুলোকে স্বল্পমূল্যে প্যাকেজ নির্ধারণ করতে হবে। সবশেষে বলব, অনলাইনে শিক্ষাদান আমাদের সামনে এক নতুন দুয়ার উন্মোচন করলেও প্রার্থনা করি, আমাদের এ পৃথিবী দ্রুত ফিরে আসুক তার চিরচেনা অবয়বে, কেটে যাক কোভিড-১৯ এর এই অন্ধকার অনিমেষা।


মৌসুমি আক্তার আন্নি

শিক্ষার্থী, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইন্সটিটিউট,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই করোনাকালীন সময়ে অনলাইন শিক্ষা চালু না হলে সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়তে হতো আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের। উন্নত দেশগুলো তাদের সকল শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইন মাধ্যমে চালিয়ে নিচ্ছে অনেক আগে থেকেই। ঘরে অহেতুক বসে না থেকে অনলাইনে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটা বেশ ভালো উপায়। দেশেও ইতোমধ্যেই অনেক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চালু হয়েছে অনলাইন কার্যক্রম। এর বড় একটি সুবিধা হলো, যেকোনো জায়গা থেকে যেকোনো অবস্থায় ক্লাসে অংশ নেয়া যাচ্ছে। করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় শুরুতে আমরা যে ক্ষতির আশঙ্কা করেছিলাম, তা অনেকাংশেই কমে আসছে। আবার অন্যদিকে, অনেকের ক্ষেত্রে অনলাইন ক্লাসে সুবিধার চেয়ে অসুবিধা বেশি হচ্ছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এর সম্পূর্ণ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলেও এখনো বেশ পিছিয়ে আছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বিশেষ করে ল্যাপটপ বা কম্পিউটার না থাকা, নেটওয়ার্কের সমস্যা, ইন্টারনেট প্যাকেজের উচ্চমূল্যসহ বিভিন্ন কারণেই প্রায় ৩০-৪০ ভাগ শিক্ষার্থী ক্লাসে অংশ নিতে পারছেনা। যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে আছে, ইন্টারনেটের দুর্বল গতির কারণে তাদের ক্লাসে অংশ নিতে সমস্যা হয়। এমন অনেক সহপাঠীর কথাও আমরা শুনেছি, যারা মোবাইলে ভালো নেটওয়ার্ক পাবার আশায় মাঝনদীতে নৌকায় বসে ক্লাস করছে।

অনলাইন ক্লাস করার একটা ক্ষতিকর দিক হল, লম্বা সময় ধরে স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার কারণে মাথাধরা বা চোখের সমস্যা হতে পারে। এজন্য ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বিরতি নেয়া উচিত। এছাড়া শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, অনেক শিক্ষকের ক্ষেত্রেও নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। কয়েকজন শিক্ষক বাদে বাকিদের অনেককেই অনলাইন ক্লাসের বিষয়টিতে অভ্যস্ত হতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে মনে হয়েছে। ক্লাস লেকচারগুলোর রেকোর্ডিং থাকলে পরবর্তীতেও যে কেউ তা দেখতে পারবে। এমন খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর সমাধান করা গেলেই হয়তো আমরা পুরোদমে অনলাইন শিক্ষাপদ্ধতির প্রয়োগ করতে পারব।

আমি মনে করি, এই ভিন্ন পরিস্থিতি আমাদেরকে নতুনকিছু শিখিয়েছে। অনলাইন মাধ্যমে অভ্যস্ত হওয়া এখন সময়ের দাবি। ভবিষ্যতের জন্য আমাদেরকে এই প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত হতে হবে। এজন্য অসচ্ছল শিক্ষার্থীদেরকে ডিভাইস প্রদান, স্বল্পমূল্যের ইন্টারনেট প্যাকেজ চালু করতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। এভাবে দ্রুত আমরা সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠব বলে আশা রাখি।


সীলমা সুবাহ্ রাইসা

শিক্ষার্থী, ৫ম বর্ষ,

উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ, ঢাকা

মার্চের ১৭ তারিখ লকডাউনের আগে যখন শেষ ক্লাস হলো, তখনও জানতাম না প্রায় ছয়মাসের বেশি সময় ধরে ক্যাম্পাসে যাবার সুযোগ হবেনা। মেডিকেল কলেজে পড়াশোনার শেষ বর্ষে এসে পড়াশোনায় এত লম্বা বিরতি দেখে যখন রীতিমত দুশ্চিন্তায় পড়ে যাচ্ছিলামম, ঠিক তখনই ঘোষণা এলো অনলাইনে লেকচার ক্লাস নেওয়া হবে। প্রথমদিকে বিষয়টি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। বুঝে উঠতে পারছিলাম না অনলাইনে ক্লাসের অভিজ্ঞতা কেমন হবে, ক্লাস-ই বা নেয়া হবে কীভাবে। তবে ক্লাস শুরুর পর সময়ের সাথে সাথে সবাই বিষয়টিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। যদিও মেডিকেলের পড়াশোনা সম্পূর্ণই ব্যবহারিক, তাই অনেক বিষয়ই অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে শেখা সম্ভব না। ক্লাসরুমে যেভাবে হাতেকলমে শেখার বিষয়টি প্রচলিত, অনলাইন ক্লাস সেখহেত্রে সম্পূর্ণই ভিন্ন। তবু আমাদের এই সময়টা যেন নষ্ট না হয়, তাই অনলাইনে জুম অ্যাপের মাধ্যমে যতটা সম্ভব তত্ত্বীয় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন আমাদের শিক্ষকরা। হাসপাতালে ডিউটির পাশাপাশি অক্লান্তভাবে আমাদেরকে অনলাইন ক্লাসে সময় দিয়েছেন তারা। তবে হাসপাতালের আউটডোরে রোগী দেখার মাধ্যমে ব্যবহারিক যে শিক্ষাটা আমরা পেয়ে থাকি, এক্ষেত্রে সেটি থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। তারপরও করোনাকালীন এই দুর্যোগের সময় অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করে তত্ত্বীয় বিষয়গুলোর পাঠদান সুনিশ্চিত করা হয়েছে, যা আমাদের পড়াশোনায় দীর্ঘ বিরতি কিংবা ক্ষতির হাত থেকে বাঁচিয়েছে।

অনলাইন ক্লাসের ভালো দিক বলাই বাহুল্য। তবে ক্লাস চলাকালে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে পদে পদে। দূর্বল নেটওয়ার্ক, বিশেষ করে গ্রাম এলাকায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা না থাকা, মোবাইল অপারেটরদের ইন্টারনেট প্যাকেজের চড়াদামসহ আরো বেশ কিছু সমস্যার কারণে অনেকেই অনলাইন ক্লাসের সুবিধা ভোগ করতে পারছেনা। যতদিন না করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, সকল শিক্ষার্থী যেন অনলাইন ক্লাস সহজভাবে চালিয়ে যেতে পারে সেজন্য ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা নিশ্চিতকরণসহ, ইন্টারনেট প্যাকেজের দাম কমানোর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ করছি। এই মহামারীর সময়ে ইন্টারনেটের আশীর্বাদে থেমে না থাকুক কোন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা, আর সকলের সচেতনতা ও সুবুদ্ধিতা দিয়ে আমরা অতি শীগগিরই যেন করোনা মোকাবেলা করে সেই আগের সুস্থ স্বাভাবিক পৃথিবী ফিরিয়ে আনতে পারি সেই প্রত্যাশা রইলো।


তানজিনা হিমু

শিক্ষার্থী, স্থাপত্য বিভাগ,

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

করোনাকালীন এই সময়ে শিক্ষার চাকা সচল রাখতে এবং সেশনজট এড়াতে দারুণ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম। ধারণকৃত ক্লাস ইচ্ছেমতো বারবার দেখার সুযোগ স্বাভাবিক অফলাইন ক্লাসের সীমাবদ্ধতাকে দূর করছে। শিক্ষকের দেয়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভুলে গেলে ধারণকৃত দৃশ্য দেখে সহজেই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে। লাইভ ক্লাসে অংশগ্রহণ ও আলোচনার মাধ্যমে না বোঝা বিষয়গুলো স্পষ্ট হচ্ছে। বিষয়ভেদে নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্রে পারদর্শী বিদেশি ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে আয়োজিত বিশেষ ক্লাসের মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে।

তবে যেহেতু এটি আমাদের জন্য একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা, তাই আমরা একেকসময় একেকধরনের অ্যাপ ব্যবহার করছি, যেটি কখনো কখনো কিছুটা বিভ্রান্তির কারণ হচ্ছে। কখনো জুম, কখনো গুগল মিট, গুগল ক্লাসরুম, স্ল্যাক, ডিসকর্ড বা ফেসবুক লাইভে ক্লাস নিচ্ছেন শিক্ষকরা। এই বিষয়গুলোকে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে এনে ক্লাস পরিচালনা করলে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ আরও সহজ হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন পুরোদমে ক্লাস চলছে, যেখানে কমপক্ষে চার-পাঁচটি তাত্ত্বিক বিষয়ের প্রতিনিয়ত অ্যাসাইনমেন্ট, কুইজ, প্রেজেন্টেশনের ডেডলাইন নিয়ে মাঝেমাঝে হিমশিম খেতে হচ্ছে। স্বল্প সময়সীমার কারণে অনেকের মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা বাড়ছে। এছাড়া বিদ্যুৎ বিভ্রাট, যান্ত্রিক ত্রুটি, নেটওয়ার্কের দুর্বলতা কিংবা পারিবারিক সমস্যার কারণে অনেককে প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। আমি মনে করি, এই বিষয়গুলোতে শিক্ষকদের আরও আন্তরিক ভূমিকা পালন করতে হবে। তাছাড়া ক্লাসের প্রস্তুতি, পরিক্ষার প্রস্তুতি, ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট সংক্রান্ত গবেষণা —সবকিছু কম্পিউটার বা অনলাইন নির্ভর হওয়ায় দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে, যা চোখের জন্য ক্ষতিকর।

আমি মনে করি, অনলাইন ক্লাসকে আরও জোরদার ও কার্যকরী করতে বিশেষায়িত অ্যাপ তৈরি এবং সফটওয়্যারের উন্নতি করা প্রয়োজন। এছাড়া অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের অর্থ সহায়তা, বিনামূল্যে বা অল্পমূল্যে ইন্টারনেট প্যাকেজ, ইলেকট্রনিক ডিভাইস প্রদান করে তাদেরকে ঝরে পড়া থেকে ঠেকাতে হবে। ব্যবহারিক বিষয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে বিশ্লেষণধর্মী এবং সৃজনশীল প্রতিফলনের প্রতি জোর দিতে হবে। গৎবাঁধা ক্লাসের মত আত্মস্থ না করে মুখস্থ করে পড়া জমা দেয়ার বিষয়টি যেন মূল লক্ষ্য হয়ে না হয়ে ওঠে, সেজন্য শিক্ষকদের আন্তরিক সুদৃষ্টি কামনা করছি। পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি আমাদের মানসিকতায়ও পরিবর্তন আনতে হবে, যেন আমরা পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারি। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রশাসন, সকলের জন্য প্রক্রিয়াটি নতুন। তাই পারস্পরিক দোষারোপহীন সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে অনলাইন শিক্ষাকে সফল করতে।

ইত্তেফাক/এসটিএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত