বাংলাদেশি কিশোরের আন্তর্জাতিক অর্জন

আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার পেল নড়াইলের কিশোর সাদাত

'শিশুদের নোবেল’ হিসেবে পরিচিত এই পুরষ্কার
বাংলাদেশি কিশোরের আন্তর্জাতিক অর্জন
সাদাত রহমান

আধুনিকতার এই যুগে মানুষের জীবন যাত্রা সহজ এবং আরামদায়ক করার পেছনে যার অবদানকে একমাত্র মূলমন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় তা হল প্রযুক্তি। প্রযুক্তিই বিশ্বকে মানুষের নখদর্পণে নিয়ে এসেছে। বিশ্বকে এখন বলা হয় গ্লোবাল ভিলেজ। এবারের করোনা মহামারী, প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তাকে হারে হারে টের পাইয়ে দিয়েছে বড্ড বেশি করে। কিন্তু প্রযুক্তি কি শুধু কল্যাণই বয়ে আনছে সবার জীবনে? উত্তর নিশ্চয়ই 'না' বোধক। প্রযুক্তির অন্যতম শাখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই অনেককে ঠেলে দিচ্ছে কঠিন এক পরিস্থিতির মুখে, যাকে বলা হচ্ছে সাইবার বুলিং।

একসময় এই অপরাধে শিশুদের শিকার হওয়ার খবর জানা গেলেও এখন অনেক প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝেও এইধরনের মানসিক নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। অর্থাৎ ভাবুন, আপনার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপনার কোন একটা অ্যাকাউন্ট আছে। আপনি সেখানে আপনার ছবি শেয়ার করলেন। কেউ এতে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করল। অথবা ধরুন, আপনার ব্যক্তিগত কোন তথ্য বা ছবি চলে গেল নেতিবাচক মানসিকতার কোন ব্যক্তির হাতে। তখনই ঘটে সবচেয়ে বড় বিপত্তি। এরপর নানাভাবে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হওয়া, বিষণ্ণতায় ভোগা—এতে করে একজন মানুষের জীবন দাঁড়ায় বিপর্যয়ের মুখে। অনেকেই একে মোকাবেলায় ব্যার্থ হন। হীনমন্যতায় ভোগেন। মেয়েদের ক্ষেত্রে অনেকেই বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ।

হ্যা, সাইবার বুলিং থেকে মুক্তির উপায় খোঁজার চেষ্টা করেছেন নড়াইলের কিশোর সাদাত রহমান। আর সেটিই তাকে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পুরষ্কার। শিশুদের নোবেল খ্যাত আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরষ্কার অর্জন করেছে এই কিশোর। গত শুক্রবার নেদারল্যান্ডসে ছোট্ট পরিসরে আয়েজিত এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাকে পুরস্কৃত করা হয়। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে অনুষ্ঠানটি অনলাইনে সম্প্রচার করা হয়, যেখানে ২০১৩ সালে এই পুরস্কার বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই অনলাইনে যুক্ত হয়ে সাদাতকে পুরস্কৃত করেন।

সতেরো বছর বয়সী সাদাত নড়াইল আবদুল হাই সিটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে এবং তার দল সাইবার বুলিং ও সাইবার ক্রাইম থেকে শিশু-কিশোরদের রক্ষায় নানা কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে চলেছে। সাদাত সম্পর্কে কিডস রাইটসের ওয়েব সাইটে বলা হয়েছে, সাদাত একজন 'তরুণ চেঞ্জমেকার' এবং সমাজসংস্কারক।

সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে নড়াইলের পনের বছর বয়সী এক কিশোরীর আত্মহত্যার হৃদয়বিদারক খবর জানার পর কাজে নামে সাদাত। সে নড়াইলে তার বন্ধুদের সহায়তায় 'নড়াইল ভলান্টিয়ার্স' নামে একটা সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলে। বেসরকারি সংস্থা একশন এইডের 'ইয়ুথ ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ- ২০১৯' এ বিজয়ী হয়ে যে তহবিল পায় সেটা দিয়ে তারা 'সাইবার টিনস' নামে মোবাইল অ্যাপ তৈরি করে। এর মাধ্যমে কিশোর কিশোরীরা জানতে পারে কিভাবে ইন্টারনেটের দুনিয়ায় নিজেকে সুরক্ষিত রাখা যায়। ইতোমধ্যে প্রায় আঠারো শত কিশোর কিশোরী এই অ্যাপ ব্যবহার করছে এবং এর মাধ্যমে ষাটটিরও বেশি অভিযোগের সমাধান হয়েছে। নিশ্চিত হয়েছে আটজন সাইবার অপরাধীর শাস্তি। এছাড়া সাদাত এবং তার দল 'সেফ ইন্টারনেট, সেফ টিনএজার' নামে একটি কর্মসূচি হাতে নেয়ার মাধ্যমে ইন্টারনেট নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে স্কুলে স্কুলে সেমিনার-কর্মশালা করে যাচ্ছে।

সাদাত রহমান জানান, সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে পিরোজপুরের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা আমাকে নাড়া দেয়। শুধু এটাই নয়, পুরো দেশে এসব ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে। এক হিসেবে দেখা যায় বাংলাদেশে প্রায় উনপঞ্চাশ শতাংশ কিশোর কিশোরী এরকম সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে। কিন্তু নিজের সমস্যার কথা কাউকে বলতে পারে না এবং সমাধানের সঠিক পথও খুজে পায় না। ফলে তারা নিমজ্জিত হয় হতাশায়, কেউ জড়িয়ে পড়ে মাদকের জালে, এমনকি আত্মহত্যার পথও বেছে নেয় কেউ কেউ। এসব বাস্তবতা থেকেই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া শিশু-কিশোরদের সাহায্য করতে অনলাইন প্লাটফর্ম সাইবার টিনসের যাত্রা শুরু হয় গত বছর অক্টোবর মাসে। এই অ্যাপের মাধ্যমে ভুক্তভোগী শিশু-কিশোরদের সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সাথে গোপনীয়তা বজায় রেখে যোগাযোগ সৃষ্টি করা হয়। প্রথমত, সাইবার টিনসের সদস্যদের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগীকে মানসিক সাপোর্ট দেয়া হয় এবং অভিযুক্তকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিষয়টি অপরাধ পর্যায়ে পৌছালে পুলিশ বিভাগকে জানানো হয়। নড়াইলের জেলা প্রশাসক আঞ্জুমান আরা এবং পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ জসিম উদ্দিনের সহযোগিতায় এই কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়েছে।

পুরষ্কার জয়ের পর সাদাত জানায়, পুরস্কার হিসেবে পাওয়া ১ লাখ ইউরো তার প্রজেক্টের অ্যাপটির উন্নয়নে ব্যয় করবে। তার আশা, এটি পুরো বিশ্বের জন্য একটি মডেল হবে।

২০০৫ সালে রোমে অনুষ্ঠিত নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীদের এক শীর্ষ সম্মেলন থেকে এই পুরস্কার চালু করে ‘কিডস-রাইটস’ নামের একটি সংগঠন। শিশুদের অধিকার উন্নয়ন ও নিরাপত্তায় অসাধারণ অবদানের জন্য প্রতিবছর আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সীরা ওই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। ২০১৩ সালে এই পুরস্কার বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই পরের বছর জয় করেছিলেন নোবেল।

ইত্তেফাক/এসটিএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত