ছোট বয়সে বড় উদ্ভাবক

ছোট বয়সে বড় উদ্ভাবক
সানি জুবায়ের। ছবি: সংগৃহীত

দেশে তখন কোভিড-১৯ এর (করোনা ভাইরাস) প্রকোপ অতি মাত্রায়। ভেন্টিলেটরের অভাবে তখন একের পর এক রোগী মারা যাচ্ছিল হাসপাতালে। ঠিক তখনই সাশ্রয়ী মূল্যের এক বিশেষ ধরনের ভেন্টিলেটর তৈরি করল এক তরুণ। নামমাত্র মূল্যে ভেন্টিলেটরের মতো এমন জীবন রক্ষাকারী একটি যন্ত্র তৈরি করে সারাদেশে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেন ঢাকা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সানি জুবায়ের।

কীভাবে এত স্বল্প খরচে ভেন্টিলেটর তৈরি করা সম্ভব তা ব্যাখ্যা করে এই খুদে গবেষক বলেন, ‘আমরা বিদেশ থেকে যেসব ভেন্টিলেটর আনি সেসব ভেন্টিলেটর শুধু শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজই করে না বরং বিভিন্ন কাজে ব্যবহূত হয়। ফলে সেসব ভেন্টিলেটরের দাম হয় অনেক চড়া। কিন্তু করোনা রোগীর চিকিত্সার জন্য যেটা প্রয়োজন তা হলো ভেন্টিলেটরের সাহায্যে ফুসফুসে অক্সিজেন সাপ্লাই দেওয়া এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে নিয়ে আসা। আর সানিও ঠিক এ বিষয়টি মাথায় রেখে তার তৈরিকৃত ভেন্টিলেটর ডিজাইন করেছেন। ফলে মাত্র সাত হাজার টাকা ব্যয়ে এই ভেন্টিলেটর তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

যেভাবে কাজ করে এই ভেন্টিলেটর

করোনা ভাইরাস সাধারণত মানুষের ফুসফুসে আক্রমণ করে। সংক্রমণ খুব জটিল আকার ধারণ করলে এমন অবস্থার তৈরি হয় যে রোগী ঠিকমতো আর শ্বাস নিতে পারে না। এ সময় রোগীর দেহে অক্সিজেনের মাত্রা অনেক কমে যায়। পাশাপাশি কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে রোগীর মস্তিষ্ক ও হূদপিণ্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও অচল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। ঠিক এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলায় কাজ করে ভেন্টিলেটর। এই যন্ত্রটি তখন নাক অথবা মুখের ভেতর দিয়ে টিউবের সাহায্যে ফুসফুসে অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং দেহ থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে নিয়ে আসে। কম্পিউটারের সাহায্যে এই যন্ত্রটি পরিচালনা করা হয়। কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে পরিস্থিতি গুরুতর হলে রোগীর নিউমোনিয়া হয়। ফলে তার ফুসফুসের নিচের অংশে পানি জমে যায় এবং তখন শ্বাস গ্রহণ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তখন ভেন্টিলেটর ছাড়া ওই রোগী আর শ্বাস নিতে পারে না। যন্ত্রটি তখন ফুসফুস থেকে পানি ও রোগীর দেহ থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে নিয়ে আসে এবং ফুসফুসে অক্সিজেন সরবরাহ করে কৃত্রিমভাবে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখে। রোগী যতক্ষণ পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাস গ্রহণ করতে না পারে ততক্ষণ ভেন্টিলেটর লাগানো থাকে। এ সময় রোগী কথা বলতে পারে না, পারে না মুখ দিয়ে কিছু খেতেও। এ সময় তাকে টিউবের সাহায্যে খাবার দেওয়া হয়।

খুদে বিজ্ঞানীর যত উদ্ভাবন

২০১৭ সালে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় সামরিক কাজে ব্যবহার উপযোগী ফাইটার রোবট- ‘এফআর ২১’ উদ্ভাবন করে বেশ আলোচিত হন এই খুদে বিজ্ঞানী। তার আগে হাতের স্পর্শ ছাড়াই কম্পিউটার চালু, দুর্ঘটনা এড়াতে স্বয়ংক্রিয় ব্রেক, গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়াতে রিসিভারসহ বেশ কয়েকটি চমত্কার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে সানি। পরে সৌরজগতের চতুর্থ গ্রহ মঙ্গলের মাটিতে বিভিন্ন পরীক্ষা চালানো এবং সেখানকার আবহাওয়া, মাটি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য আদান-প্রদান করার উপযোগী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট— রোভার অ্যাটলাসের ডিজাইন করেন এই শিক্ষার্থী। এজন্য তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কর্তৃক শ্রেষ্ঠ তরুণ উদ্ভাবকের পুরস্কার অর্জন করেন। তাছাড়া, দৈনন্দিন কাজে সহায়তাকারী সম্পূর্ণ অটোনোমাস ভিত্তিক রোবট— ‘ব্রেন বট’, কৃষি কাজে সাহায্যকারী রোবট— ‘ফার্মওভার’ ও রেসিং রোবট— ‘ফ্যালকন এক্সএক্সআইভি’ সহ বেশ কিছু রোবট তৈরি করেছে সানি জুবায়ের।

যত কৃতিত্ব, যত অর্জন

টিম লিডার হিসেবে ১৮ জন সদস্য নিয়ে সানি প্রতিষ্ঠা করেন ‘টিম অ্যাটলাস’ নামক একটি সংগঠন। সংগঠনটি আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াডে প্রথম স্থান, মেক্সেলারেশন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) আয়োজিত টেকনিভ্যাল ২০১৮-তে চ্যাম্পিয়ন, ন্যাশনাল রোবটিক্স ফেস্টিভাল ২০১৭-তে চ্যাম্পিয়ন, ন্যাশনাল রোবট অলিম্পিয়াড ২০১৯-এ স্বর্ণ জয়, ইন্ট্যারন্যাশনাল রোবট অলিম্পিয়াড ২০১৯-এ ব্রোঞ্জ জয় ছাড়াও সানির নেতৃত্বে ২০১৯ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড রোবটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ১৩ তম স্থান অর্জন করে বাংলাদেশ। তাছাড়া বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করে সানি ও তার দল।

যা করছে, যা ভাবছে

সানি ও তার দল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। লক্ষ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের কৃতিত্বকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গৌরবের সঙ্গে উপস্থাপন করা।

যারা রোবটিক্স নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন দেখেন তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সৃষ্টিশীলতার অনেক কিছু লুকিয়ে আছে রোবটিক্সে। এজন্য সর্বপ্রথম রোবটিক্স সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিতে হবে এবং সেইসঙ্গে প্রোগ্রামিং করাটাও আয়ত্ত্বে আনতে হবে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত