করোনাকালের এক সম্মুখযোদ্ধার গল্প

করোনাকালের এক সম্মুখযোদ্ধার গল্প
ছবি: সংগৃহীত

কোভিড-১৯ মহামারির বিরুদ্ধে যারা জীবন বাজি রেখে অন্যের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন তাদের আমরা বলে থাকি সম্মুখ সারির যোদ্ধা। এই কাতারে আছেন ডাক্তার, পুলিশসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ। অবশ্য মানবিকতার পাশাপাশি ছিল তাদের পেশাগত তাগিদ। কিন্তু একেবারে স্বেচ্ছায় নিঃস্বার্থভাবে কেউ কি এই সম্মুখ সারিতে এসে দাঁড়ায়? এমনই এক দুঃসাহসী সৈনিক ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদ খান। বলছি এই করোনাকালে দেশের ছিন্নমূল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়াসে দুঃসাহস নিয়ে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়েপড়া তরুণ ইশতিয়াকের গল্প।

কোভিড-১৯ এর জন্য বাংলাদেশে প্রথম লকডাউন ঘোষণা করা হয় ২০২০ সালের মার্চের শেষদিকে। তখন থেকে করোনা ভাইরাস এক আতঙ্কের নাম। জনবহুল এলাকা কিংবা বিদেশ থেকে প্রবাসীরা কেউ এলে তাকে নিয়ে ভয়ে থাকতো এলাকাবাসী। বিশেষ করে সংক্রমিত হওয়ার ভয়। কিন্তু যখন এই ভয় একজন মৃত মানুষের গোসল ও দাফন ব্যবস্থার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় তখন বিষয়টা মর্মান্তিক ও হূদয়বিদারক। ভাইরাসে আক্রান্ত লাশ স্পর্শ করা দূরে থাক, মসজিদ থেকে খাটিয়া পর্যন্ত দিতে রাজি হয়নি মানুষ। এমনই ক্রান্তিলগ্নে এগিয়ে এসেছেন ইশতিয়াক।

করোনা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিদের গোসল করিয়ে দাফনের কাজ করেছেন নিজ হাতে। কখনো দাফনের সময় নেমেছে তুমুল বৃষ্টি, কবরে জমে যাচ্ছিল পানি, ডুবে যাচ্ছিল লাশ। এতসব প্রতিবন্ধকতাও থামাতে পারেনি তাকে। তিনি বলেন, ‘আমার শুধু এটা মনে হতো যে আজ এই অসহায় লাশ আমার হতে পারতো। তাই বিষয়টি অনুধাবন করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও লাশ দাফনের ব্যবস্থা করেছি। সুষ্ঠু দাফন প্রক্রিয়া একজন মরহুমের একান্ত অধিকার, জীবনের চূড়ান্ত দাবি, সেইসঙ্গে জীবিতদের কর্তব্য।’

করোনা ভাইরাস নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলা ইত্যাদি সচেতনতামূলক বিষয়গুলো প্রচার করেছেন তিনি। এলাকার অলিগলিতে জীবাণুনাশক ছিটানোর কার্যক্রম চালিয়েছেন। এছাড়া পথের ক্ষুধার্ত প্রাণিগুলোর জন্যও মমতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি।

কথায় আছে, এক মাঘে শীত যায় না। করোনা ভাইরাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে নেমে এলো অন্য এক অভিশাপ—যার নাম বন্যা। এতে বিশেষ করে সাতক্ষীরা ও সিরাজগঞ্জ জেলায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বেশি। তিনি নিজস্ব অর্থে ত্রাণ বিতরণ করেছেন সেসব বন্যার্ত মানুষের মাঝে। তিনি মনে করেন, জীবনে সবকিছু লাভ-ক্ষতির হিসেব করে হয় না। অন্যের স্থানে নিজেকে একবার কল্পনা করে দেখলেই অনেক হিসেব সহজ হয়ে যায়। মিরপুর টি ব্লগের বস্তিতে আগুন কিংবা করাইল বস্তিতে আগুন— প্রতিবারেই খাবার নিয়ে ছুটে গিয়েছেন দগ্ধ মানুষের কাছে। করোনার এই ব্যতিক্রমী রমজানেও রোজাদারদের মাঝে ইফতার বিতরণ করেছেন। বন্ধুদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে সাহায্য করেছেন তৃতীয় লিঙ্গের উপেক্ষিত জনগোষ্ঠীকে। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করেছেন। তার এই পথচলা নিস্বার্থ, সকল মানুষের জন্য।

বেড়িবাঁধ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে এক সাংবাদিকের লাশ দাফনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার লাশ দাফন কার্যক্রম। তারপর তা প্রচারিত হলে যখন তখন ডাক আসতো। ২৪ ঘণ্টা যখনই দেশের নানা প্রান্ত থেকে ডাক পড়েছে ছুটে গিয়েছেন। ভোরে বের হয়ে দিনে ৬/৭টি লাশ দাফন করে রাতে ফিরতেন। তিনি এ কাজ করেছেন মাস্তুল ফাউন্ডেশনের হয়ে।

দৈনিক ইত্তেফাককে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ‘এতসব কর্মকান্ডের পেছনে আমার চেতনা ও শক্তি ছিল একাত্তর। স্বাধীনতার জন্য সমস্ত ভয়কে জয় করে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধাগণ, তাদেরই রক্তধারা বয়ে চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আমরা সকলেই জীবদ্দশায় প্রথমবার এমন কোনো বৈশ্বিক মহামারির সম্মুখীন হলাম। তবু যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ভালো থাকতে। আমি চাই দেশের প্রত্যেক তরুণ যেন দেশকে ভালোবাসে, অন্যের কষ্টে ব্যথিত হয়, অন্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে সদা প্রস্তুত থাকে।’

দিল্লির শারদা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ইশতিয়াক। করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় দেশে ফিরে জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। বাবা মায়ের উৎসাহের কারণেই এসব করা সহজ হয়েছে বলে মনে করেন এই তরুণ।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x