৩৮তম বিসিএসের মেধাবী মুখ

ইমা হালিমার স্বপ্ন জয়ের গল্প

ইমার স্বপ্ন জয়ের গল্প
ইমা হালিমা

হাসিমাখা চেহারার ছিপছিপে গড়নের এক তরুণী ইমা। পুরো নাম ইমা হালিমা। জন্ম কুমিল্লার বুড়িচংয়ে হলেও বেড়ে উঠেছেন কুমিল্লা শহরে। ছোটবেলা থেকেই খুব প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বল ও স্বপ্নবিলাসী ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই সামরিক বাহিনীতে চাকুরি করার চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেত। কিন্তু একটা সময় এসে সেই স্বপ্নের অবসান হয়। তবে স্কুলজীবন থেকেই খুব মেধাবী ছাত্রী ছিলেন ইমা। সবাই পরীক্ষার সময় সাধারণত বেশী পড়াশোনা করে। কিন্তু ইমার ক্ষেত্রে ছিল একদমই উল্টো, সারাবছর পড়াশোনা করতেন আর পরীক্ষার সময় ঘুরতেন। জীবন নিয়ে জটিল ভাবনা ছিল না তার, তবে পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ী ছিল সবসময়।

ইমার এসএসসি পরীক্ষার চারদিন আগে জলবসন্ত হয়। তখন তার শারীরিক অবস্থা ভীষণ নাজুক। তাই শিক্ষাবোর্ড থেকে অনুমতি নিয়ে আলাদাভাবে পরীক্ষা দিতে হলো। ফলটাও আর আশানুরূপ হল না। এসএসসি পাশের পর তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে ভর্তি হন। এর কিছুদিন পরই তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। এসময়টায় জীবন নিয়ে কিছুটা হতাশায় পড়ে যান। প্রতিদিন ক্লাস করা, সংসার সামলানো ও নিজের খেয়াল রাখা, সবমিলিয়ে কুলিয়ে উঠছিল না। এসব চাপের কারণে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে পরের সেশনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। তবে স্বামীর সংসারে পড়াশোনায় কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিলনা, ফলে সানন্দে ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে স্নাতক পাস করে সেখানেই ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

পড়াশোনা শেষে তেমন কোন প্রস্তুতি ছাড়াই বন্ধুদের দেখাদেখি ৩৭তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন। তবে সেবার প্রিলিতেই অকৃতকার্য হন। বন্ধুদের কয়েকজন যখন ৩৭তম বিসিএসের প্রিলি ও রিটেনে পাশ করে ভাইভায় অংশ নেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন ইমার চোখ খুলে। এরই মধ্যে ৩৭তম বিসিএসে এক বন্ধু পুলিশের এএসপি ও আরও কয়েকজন সহপাঠী বিভিন্ন নন-ক্যাডার পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। তখন বন্ধুদের দেখে বিসিএস ক্যাডার হবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন ইমা। ইমার এক শিক্ষক তাকে খুব স্নেহ করতেন। সেই শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় নিজেও শিক্ষক হবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। এবার পণ করেন, যে করে হোক স্বপ্ন পূরণ করতেই হবে! লক্ষ্যে অটুট হয়ে ৩৮ তম বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন ইমা। বিসিএসের সিলেবাস দেখা, প্রশ্ন পর্যালোচনা করা ও নিজের মতো করে পড়তে লাগলেন। কোচিং-এ ভর্তি হয়েও নিজের শিশুসন্তানকে দেখাশোনার কারণে নিয়মিত ক্লাস করা হয়ে ওঠেনি। তবে মডেল টেস্ট ও অন্যান্য অনুশীলন চালিয়ে যেতে থাকেন। বাচ্চার স্কুল ও ঘুমানোর সময়টাতেই ইমার পড়াশোনার সুযোগ হতো।

৩৮তম বিসিএসের প্রিলির জন্য দিনরাত এক করে পড়েছেন। কোচিংয়ে ৩৮তম প্রিলির আগে একটা ফাইনাল মডেল টেস্ট হয়েছিল। পরীক্ষায় ইমা অন্যদের তুলনায় খুব ভালো নম্বর পান। তখন আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। প্রিলিতে ১২৬টি প্রশ্নের উত্তর সঠিক হয়। প্রিলিতে উত্তীর্ণ হয়ে পড়াশোনা বাড়িয়ে দেন। তখন দিনে ১০-১২ ঘন্টা পড়তেন। সংসার, সন্তান ও পড়াশোনা সব একই সাথে চলতে থাকে। সবকিছু বজায় রেখেই পড়াশোনা চালিয়ে যান। লিখিত পরীক্ষার আগে প্রচুর পত্রিকা ও নিজের লেখার দক্ষতা বাড়াতে চেষ্টা করেন। লিখিত পরীক্ষাও আশানুরূপ ভালো হয়। মৌখিক পরীক্ষার আগে মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান, বঙ্গবন্ধু ও নিজ জেলা সম্পর্কে জানতে বেশি সময় দেন। বিষয়ভিত্তিক পদের মধ্যে ইংরেজিতে বেশি প্রতিযোগিতা হয় জেনেও শিক্ষা ক্যাডার 'চয়েজ' ছিল ইমার। অবশেষে চূড়ান্ত ফলে শেষ হাসি হাসেন তিনি। ৩৮তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পাশাপাশি নিজ বিষয়ে অর্জন করেন চতুর্থ স্থান।

ইমা হালিমা বর্তমানে কুমিল্লার লাকসাম নবাব ফয়েজুন্নেছা সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। শিক্ষক হিসেবে ভবিষ্যত পরিকল্পনা জানতে চাইলে বলেন, একজন ভালো শিক্ষক হতে চাই। ছাত্রদের শুধু পড়াশোনা নয় সামাজিক, রাজনৈতিক, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ দেশপ্রেমসহ সব বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করবো।

ইত্তেফাক/টিএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x