যাদের বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছেন কেশব, তারা এখন স্বাবলম্বী

যাদের বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছেন কেশব, তারা এখন স্বাবলম্বী
কেশব রায়

'আমার জেঠাতো ভাইয়ের মেয়ের বাল্যবিয়ে ঠিক করা হয়েছিল তার অমতে, বিয়েতে রাজি না হয়েও পরিবারকে বোঝাতে না পেরে এক পর্যায়ে আত্মহত্যা করে মেয়েটি। খুব কষ্ট পাই তখন, পরিবারের সচেতনতার ওভাবে ঝরে যায় তার প্রাণ। সেদিনের পর থেকে জোরালো ভাবে বাল্যবিবাহ বন্ধের পথে নামি।' আলাপচারিতায় এমনটিই জানাচ্ছিলেন নীলফামারির তরুণ কেশব রায়। নীলফামারি জেলার জলঢাকা উপজেলায় যেন কোনো মেয়ের বাল্যবিবাহ না হয়, সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন কেশব। প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রামে গ্রামে গিয়ে বাল্যবিবাহের কুফল তুলে ধরে উঠান নাটক করা শুরু করেন কেশব ও তার দল। এতে করে গ্রামের অনেক মানুষ সচেতন হওয়া শুরু করে। কমে আসে বাল্যবিবাহ দেয়ার প্রবণতা।

কোথাও কোনো কিশোরী মেয়েকে বিয়ে দেয়ার উপক্রম হলেই তথ্য চলে আসে কেশবের কাছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে তিনি ছুটে যান বাল্যবিবাহ বন্ধে। স্থানীয় প্রশাসনকে জানালে এগিয়ে আসে প্রশাসনও। এমন করে এ পর্যন্ত তিনি ১৪৪টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। কেশব জানান, বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা পাওয়া অনেক মেয়ে এখন কলেজে পড়াশোনা করছেন, কেউবা উদ্যোক্তা হয়ে সফল, স্বাবলম্বী হয়েছেন।

কেশব রায় বলেন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর কর্মী চুনি ইসলাম ও মাহাতব লিটন ইসলাম প্রায়ই বিকেলে গ্রামের মানুষের সাথে গ্রামের পরিচিতি ও সচেতনতা নিয়ে আলোচনা করেন। একদিন আমরা আলোচনায় সংগঠন তৈরি সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও নীতিমালা তৈরি করি শিশু অধিকার, শিশু শ্রম, স্যানিটেশন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখি করা ও নাটকের মাধ্যমে অসচেতন মানুষদের সচেতন করে আলোকিত করার। সেই হিসেবে সংগঠনের নাম দিই ‘আলোকিত উন্নয়ন সমাজ কল্যাণ সংস্থা’। ২০১৩ সালে সংগঠন যাত্রা করার সময় আমাদের কোনো অর্থ ছিলনা, তবে নিজেদের মেধা, সততা ও আস্থা ছিল। নাটকের প্রশিক্ষণ নিয়ে যাত্রা শুরু হয় আমাদের। স্থানীয় প্রশাসনও আমাদেরকে সহযোগিতা করে।

তিনি আরও জানান, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের পাশাপাশি ঝড়েপরা শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করার কাজও চলছে। তরুণদের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের। নারীদের দেয়া হচ্ছে সেলাই প্রশিক্ষণ। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে জাতিসংঘ থেকে ইয়ুথ কারেজ অ্যাওয়ার্ড, ২০১৪ প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড, ২০১৫ সালে জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড, ২০১৬ সালে ক্যাম্পাস টু ক্যারিয়ার, জোনতা ক্লাব ঢাকা, বাংলাদেশ পাঠাগার আন্দোলন পুরস্কার অর্জন করেছে কেশবদের সংগঠন।

২০১৫ সালে জয় বাংলা পুরস্কার পাওয়ার পর সংগঠনের কার্যক্রম আরও বেগবান হয়। ইয়াং বাংলার সহযোগিতায় প্রত্যন্ত এলাকায় গড়ে ওঠে কম্পিউটার ল্যাব এবং ই-শপ সেন্টার। এখান থেকে শতাধিক শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষকণ দেয়া হয়েছে ও ইতোমধ্যেই ১৮ জন উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন। ‘আলোকিত উন্নয়ন সমাজ কল্যাণ সংস্থা’ এর সভাপতি কেশব রায় আগামী দিনে কাজ করতে চান অসহায় দরিদ্র নারীদের নিয়ে, যারা পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়িতে বসেই হস্তশিল্পের কাজ করে হয়ে উঠবেন স্বাবলম্বী।

ইত্তেফাক/এসটিএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x