মেয়র আনিসুল হক করভী রাখসান্দকে বলতেন

‘কাজ শুরু করো, ব্যর্থ হলে নতুন পথ খুঁজে পাবে’

‘কাজ শুরু করো, ব্যর্থ হলে নতুন পথ খুঁজে পাবে’
জাগো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা করভী রাখসান্দ ধ্রুব

সারাদেশে জাগো ফাউন্ডেশনের ৪০ হাজার স্বেচ্ছাসেবী তরুণ সংগঠক রয়েছে, ৪০০ তরুণ কাজ করেছেন তাদের দক্ষতা অনুযায়ী পারিশ্রমিকে। এই সংগঠনের মাধ্যমে পড়াশোনাও করেছে ৪০০০ শিক্ষার্থী। এক শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ জাগো ফাউন্ডেশনেরই প্রতিষ্ঠান। ইত্তেফাক অনলাইনের সাথে এক আলাপচারিতায়, ইউনেস্কো থেকে পুরস্কার পাওয়া বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ তরুণদের এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সেরা হওয়ার গল্প জানিয়েছেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা করভী রাখসান্দ ধ্রুব।

ইত্তেফাক অনলাইনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে করভী বলেন, 'একদিন বেশ ক'জন পথশিশুকে দেখলাম ওরা ডাস্টবিনের পাশে বসে খেলছে। তখন তাদের পাশে গেলাম এবং বললাম, তোমরা আমার সাথে খেলবে কী? তারা বললো, আমরা খেলছিনা, প্লাস্টিকের বোতল কুড়াচ্ছি। আমার কৌতূহল ছিল তাদের সম্পর্কে জানার, সেই কৌতূহল থেকে সারাদিন তাদের সাথে কাটাই। দিন শেষে যখন ফিরে আসবো সাতবছর বয়সী এক মেয়ে বলে ওঠে আজকের দিনটা অনেক ভালো কেটেছে, আমার তো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, আপনার সাথে আমাকে নিয়ে যাবেন কী? এই কথা শোনার পর আমার বিবেক আমাকে গভীর ভাবে ভাবায়, এতো পড়াশোনা করে যদি এই বাচ্চাগুলোকে সহযোগিতা করতে না পারি তাহলে এই জীবনের শিক্ষার লাভটা কী!। এই ঘটনা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করি এরপরই শিশুদের নিয়ে কাজ শুরু করি, ২০০৭ সালে এপ্রিল মাসে যাত্রা শুরু করে জাগো ফাউন্ডেশন।'

'স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশের কল্যাণে কাজ করবো। স্কুলজীবন থেকেই মানুষের জন্য কাজ শুরু করি, ৭ম শ্রেণিতে পড়ার সময় মাথায় আসে, আশেপাশে তো অনেক দারিদ্র মানুষ আছে, বন্ধুবান্ধবদের কাছ টাকা তুলে তাদের তো দিতে পারি। যেই ভাবনা সেই কাজ, টাকা সংগ্রহ করে দরিদ্র মানুষক দিতাম। কাজের শুরুটা আসলে স্কুল জীবন থেকেই। তিনি বলেন, কয়েক বছর এভাবে কাজ করার পর মাথায় আসে, আমি যাদের টাকা দিচ্ছি তারা তো দিনদিন অলস হয়ে যাচ্ছে, অন্যকোনো কাজে ঝুকঁছেনা বা ঝোকবেও না। আমার এমন কিছু করতে হবে যেটা ওরা দেখতে পারবেনা কিন্তু ওদেরই কাজে দিবে।'—এমনটাই বলছিলেন করভী রাখসান্দ।

করভী বলেন, 'আমি যেহেতু ঢাকায় বড় হয়েছি, সারাদেশের চিত্রের চেয়ে ঢাকার চিত্র অনেক ভিন্নতা রয়েছে। আর সেই ভিন্নতা এবং অভিজ্ঞতা থেকেই জাগো ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করি। ১৪ বছর আগে শুরু করার সময় অনেকেই অনেক কথা বলতো, ছাত্রজীবনে এসব করেছো ভালো, পড়াশোনা শেষ করে এসব পাগলামির কোনো মানে হয়না। আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন জাগো ফাউন্ডেশন মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে।

মেয়র আনিসুল হক তো জাগো'র পাশে ছিলেন ও উপদেষ্টা ছিলেন, তাঁকে কীভাবে স্মরণ করেন—এমন প্রশ্নে করভী বলেন, 'মেয়র আনিসুল হকের কাছে তখনই যেতাম তখন আমার কাজের সব পথ বন্ধ হয়ে যেতো, আমি যখন কোনো উপায় খুঁজে পেতাম না, তাকে সবকিছু জানাতাম। আমার কথা শুনে তিনি বলতেন, করভী কাজটা শুরু করে ফেলো, ব্যর্থ হলে নতুন পথ খুঁজে পাবে। তিনি পরপারে চলে গেলেও তার কথাগুলো আমাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে সবসময়। আমি সবসময় তাঁকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি।

তরুণদের উদ্দেশ্যে এই উদ্যোক্তা বলেন, 'আমাকে অনেকে বলতো বয়স হোক, শেষ বয়সে দান করে নিজেকে গুছিয়ে নিও। এই বয়সে কী দরকার এসব করার? কিন্তু শেষ বয়সে তো আমার ভাবনার, বুদ্ধিমত্তা, শক্তি ও সৃজনশীলতা যেটা আছে সেটা থাকবেনা। তরুণদের উচিত ভেবেচিন্তে কাজ করা এবং একটা কাজে লেগে থাকা। লেগে থাকলে সফলতা আসবেই। দেশের বেশিরভাগ মানুষ তরুণ, আমাদের সাথে হয়ত ৪০ হাজার তরুণ রয়েছে তবে এটা জেলাভিত্তিক। গ্রামের অনেক তরুণ আছে যারা এখনো আমাদের সাথে যুক্ত হতে পারেনি। তরুণদের আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রতি বছর জাগো ফাউন্ডেশন ন্যাশনাল ইয়ুথ অ্যাসেম্বলির আয়োজন করে থাকে, কোভিড পরিস্থিতির জন্য এবছর সময় মতো করা সম্ভব হয়নি, তবে আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।

জাগো ফাউন্ডেশন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দরিদ্র অসহায় মানুষকে সহযোগিতা করা, সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিসহ সারাদেশে বিভিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষা দিচ্ছে শিশুদের। শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য ২০১৭ সালে ‘ইউনেসকো কিং হামাদ বিন ইসা আল—খলিফা’ পুরস্কার পায় জাগো ফাউন্ডেশন। এছাড়া সিএসআর পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড, আর্থকণ্ঠ বিজনেস অ্যাওয়ার্ড পায় ২০১০ সালে, মোজাইক প্রতিভা পুরস্কার ও মোজাইক আন্তর্জাতিক পুরষ্কার পায় সে বছরই। ২০১০ সালে তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কমনওয়েলথ থেকে সাউথ এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন হওয়াসহ আরও বেশকিছু অর্জন রয়েছে তাদের সফলতার ঝুড়িতে। ইতোমধ্যে ৫১টি জেলায় ২৭০টিরও বেশী প্রকল্প সম্পন্ন করেছে শিশু ও তরুণদের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা এই সংগঠন।

করভী রাখসান্দ আরও বলেন, 'শুরুতে ভেবেছিলাম সারাদেশে আমাদের স্কুল থাকবে, পরে দেখলাম সংখ্যায় বেশি -অথচ মানহীন স্কুল থাকার চেয়ে অল্প করে শিক্ষায় মানসম্পন্ন স্কুল থাকাটা ভালো। সারাদেশের ১১টি জাগো স্কুলে বর্তমানে ৪০০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তবে কখনো ভাবিনি দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে পড়বে জাগো ফাউন্ডেশন এর শিক্ষার্থী, এটা যেমন দরিদ্র পরিবারের প্রাপ্তি তেমনি আমাদেরও, জাগো'র একজন শিক্ষার্থী স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকায় উচ্চশিক্ষায় যাবে।'

এত সব কাজের পেছনের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'যেসব শিশু আমার প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে তাদের স্বপ্নগুলোর কথা শুনে আমি অনুপ্রেরণা ও কাজের শক্তি পাই। আমার সংগঠনে কাজ করা একঝাঁক নিবেদিতপ্রাণ তরুণরাও আমার অনুপ্রেরণা।'

ইত্তেফাক/এসটিএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x