বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২০, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭
৩০ °সে

হৃদয়ে লাইলাতুল কদর 

হৃদয়ে লাইলাতুল কদর 
হৃদয়ে লাইলাতুল কদর।ছবি: সংগৃহীত

রমজানের শেষ দশকে মুমিন-মুত্তাকির জন্য বিশেষ এক রাত হচ্ছে লাইলাতুল কদর। লাইলাতুল কদর এমন এক রাত, যে রাতে আল্লাহতায়ালা তার সেইসব ঈমানদারের ওপর তার রহমতের ধারা বর্ষণ করেন। যারা নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সাথে তার ইচ্ছায় বিগলিত অন্তরে নিজেকে সমর্পণ করে আর তার আদেশাবলী পরিপূর্ণরূপে মান্য করে।

বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কালে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ রমজানের রোজা রাখছেন আর প্রত্যাশা করছেন মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর লাভের। এই রাত এমন এক রাত যা সাধারণভাবে পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হবার সাথে সংশ্লিষ্ট, তবে এর আরো অর্থ আছে যা আল্লাহর রহমানিয়ত বৈশিষ্ট্যের মাঝে গভীরভাবে প্রোথিত।

পবিত্র কোরআনের সুরা আল-কাদরের আয়াতসমূহ দ্বারা আমাদেরকে আক্ষরিকভাবে একথা বুঝানো হয়েছে যে, ‘লাইলাতুল কদর’ অর্থ হচ্ছে ‘ভাগ্য নির্ধারণের রাত’। এটা হচ্ছে এমন এক রাত, যা এক হাজার মাসের চাইতেও বেশী মর্যাদা সম্পন্ন। আরবিতে এক হাজার বলতে সংখ্যার দিক থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যাকে বুঝায়। আর এ রাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে অবতরণ করে এবং মানবজাতির মধ্যে এক নব জীবনের উন্মেষ ঘটায়।

সুরা আল-কদর পূর্ণাঙ্গ সুরাটিতে এই মহিমান্বিত রজনীর মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এটা (আল-কুরআন) মহিমান্বিত রজনীতে অবতীর্ণ করেছি। আর মহিমান্বিত রজনী সম্বন্ধে তুমি কী জান? মহিমান্বিত রজনী হাজার মাসের চাইতে উত্তম। ওই রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ (জিবরাঈল) তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে প্রত্যেক কাজের জন্য অবতীর্ণ হন। শান্তিময়, এই রাত ফজর উদয় পর্যন্ত।’ (সুরা কদর)

সুরা আল কাদরে আল্লাহতায়ালা সেই মহিমান্বিত রাতের কথা উল্লেখ করেছেন, যেই রাতে শ্রেষ্ঠনবী হজরত খাতামুল আম্বিয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছিল। এই সৌভাগ্যমণ্ডিত রাতে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেইসব আয়াতসমূহ পাঠ করেছিলেন যেগুলো চিরকাল সব মুমিনের অন্তরে গ্রথিত হয়ে থাকবে অর্থাৎ সুরা আলাকের প্রথম কয়েকটি আয়াত, যেখানে আল্লাহতায়ালা বলছেন, ‘পড় তোমার প্রভু প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে এক আঠালো রক্তপিণ্ড থেকে, তুমি পড়, কেননা তোমার প্রভু-প্রতিপালক পরম সম্মানিত, যিনি কলমের মাধ্যমে শিখিয়েছেন, তিনি মানুষকে তা শিখিয়েছেন-যা সে নিজে জানতো না’ (সুরা আলাক, আয়াত: ১-৫)।

এই আয়াতগুলো সেই সৌভাগ্য রজনীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হেরা গুহার মাটিতে অনন্তের ধ্যানে একেবারে তন্ময় তখন এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়ে তার হৃদয় কন্দরে প্রথিত হয়ে যায়। এ আয়াতগুলো আল্লাহতায়ালার দয়ার প্রথম নিদর্শন যার মাধ্যমে তিনি তার প্রিয় নবী ও শ্রেষ্ঠ নবী খাতামান্নাবেঈন হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আশিসমণ্ডিত করেছিলেন।

আরো পড়ুন: নাজাতের দশকে তোমার সন্তুষ্টি কামনা

প্রত্যেক মুমিন বান্দার জন্য ‘লাইলাতুল কদর’-এর আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ রয়েছে, আর তা হলো, এটা এমন এক রাত, যখন মুমিন এক মহান আশীর্বাদ লাভ করতে পারে। প্রসিদ্ধ একটি হাদিস দ্বারা একথা সাব্যস্ত যে, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কদরের রাতে যে ব্যক্তি ঐকান্তিক বিশ্বাসের সাথে আল্লাহর পুরস্কার লাভের আশা করে, তার অতীতের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়’ (বোখারি, প্রথম খণ্ড)।

আমাদের দেশে ২৭ রমজানের রাতকেই লাইলাতুল কদর হিসেবে পালন করা হয়। রাতভর নামাজ, দোয়া-দরুদ, জিকির-আজকার ও পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ইত্যাদির মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মানুষ রাতটি অতিবাহিত করে। তবে হাদিসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লাইলাতুল কদর অন্বেষণের সময় কখন হবে সে বিষয়ে উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ‘রমজান মাসের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ কর’ (বোখারি)। হাদিসের ভাষ্যমতে, রমজান মাসের শেষাংশের যেকোনো বিজোড় রাত অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ এর মধ্যে যেকোনো রাতই লাইলাতুল কদর।

উপরোক্ত বিশ্লেষণের আলোকে প্রত্যেক মুমিন নর-নারীর এটা দায়িত্ব, রমজানের এই দিনগুলোতে সে তার ইবাদত বাড়িয়ে দেবে এবং ঐকান্তিভাবে দোয়া করবে যে তারা যেন লাইলাতুল কদরের সুফল থেকে উপকৃত হয় এবং আল্লাহর রহমতে তাদের অতীতের সব গুনাহ মাফ পেয়ে যায়।

এক স্থানে মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সারা রমজান মাসের সব নামাজ বাজামাত আদায় করে, সে ব্যক্তি লাইলাতুল কদদের এক বৃহদাংশ সংগ্রহ করে। লাইলাতুল কদরের অভিজ্ঞতা লাভের জন্য একজন মানুষকে সারা মাস জুড়ে ন্যায়পরায়ণতার সর্বোচ্চ মান সংরক্ষণ করে। মহানবী (সা.) রমজানের শুরু থেকেই শেষ দশ দিনের এই দিনগুলোতে আল্লাহর সর্বোচ্চ এবং পরমোৎকৃষ্ট বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ইবাদতের মাঝে অতিবাহিত করার অপরিমেয় সংকল্প করতেন। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে লাইলাতুল কদরের স্বাদ লাভে ধন্য করুন আর বিশ্বকে সব বালা-মুসিবত থেকে রক্ষা করুন, আমিন।

লেখক: ইসলামী গবেষক ও কলামিস্ট

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত