বিশ্ব আন্তঃধর্ম সম্প্রীতি সপ্তাহ

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই ইসলামের সৌন্দর্য

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই ইসলামের সৌন্দর্য
মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম ও খ্রিস্টান ধর্ম নেতার মোলাকাত [ছবি: সংগৃহীত]

ইসলাম ‘সাল্ম’ মূল শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ শান্তি। ইসলামের যে যাত্রা আদম (আ) থেকে শুরু হয়েছে, তার চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি হয়েছে রসুল (স)-এর হাত ধরে ইসলামকে পরিপূর্ণ জীবনবিধান স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে।

কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণা—‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মনোনীত দিন ইসলাম’। ইসলাম জীবনবিধান হিসেবে পৌত্তলিকপ্রধান মক্কায় এবং পরবর্তী সময়ে ইহুদিপ্রধান মদিনায় শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে একথা জানান দিয়েছে—ইসলামের কাজই হলো সত্যের প্রকাশ এবং শান্তির বার্তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া। আমরা কি একবার ভেবে দেখেছি, অন্যতম বড় অপরাধী ইকরামা বিন আবু জেহেল (পরবর্তী সময়ে অন্যতম সেরা সাহাবি) কাবার ছায়ায় আশ্রয় নিলেও যাকে হত্যার হুকুম ছিল তাকে কীভাবে রসুল (স) ক্ষমা করেছিলেন? আমরা তো হিন্দার কথা জানি, যে উহুদ যুদ্ধের পর রসুল (স)-এর চাচা আমির হামজা (রা)-এর দেহমোবারক ক্ষতবিক্ষত করেছিল তৎকালীন যুদ্ধসম্পর্কীয় সব নিয়মনীতি উপেক্ষা করে। রসুল (স) জীবনে যে দু-একবার প্রকাশ্যে কেঁদেছিলেন, তার একটি ছিল আমির হামজা (রা)-এর বিকৃত চেহারামোবারক দেখে। এত কষ্ট পাওয়ার পরও হিন্দাকে কত সহজেই ক্ষমা করেছিলেন রসুল (স)।

ক্ষমা দিয়ে ইসলামের যাত্রা শুরু, যা এখনো অব্যাহত। ক্ষমার বড় কারণ ছিল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা এবং ইসলামের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা। ইসলামের এই যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে, আজও তা অব্যাহত। মুসলমানদের এ অবস্থান কেবল তাদের নৈতিক দায় থেকে নয়, বরং ধর্মীয় নির্দেশনা দিয়ে নির্ধারিত। ইসলামের এই সৌন্দর্যই হয়তো হাশেমি বংশের অন্যতম উত্তরাধিকার জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ দ্বিতীয়কে জাতিসংঘে ‘ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল ফেইথ হারমনি উইক’-এর প্রস্তাব উত্থাপনে উদ্বুদ্ধ করেছে। উল্লেখ্য, বাদশাহ আবদুল্লাহর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১০ সালে উল্লিখিত দিবস ঘোষণা করে। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির ১ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত সারা বিশ্বে এ সপ্তাহ পালিত হয়।

নাইন ইলেভেনের পর বিশ্বে ‘ইসলামফোবিয়া’ টার্ম চালু হয়। কেউ কেউ মুসলমানদের সঙ্গে বসবাস সম্ভব নয় বলে ঘোষণা দেয়। দুই দশকের ঘটনা পর্যালোচনা করলে বোঝাই যায়, যুদ্ধ-বিগ্রসহ প্রতিটি ঘটনার পেছনের কোনো সূক্ষ্ম পরিকল্পনা কাজ করেছে আর এর বলির স্বীকার হয়েছে মুসলমানরা। মুসলমানদের জ্ঞানবিজ্ঞানের যথাযথ পদচারণার অভাবে বর্তমানে অস্থির বা সন্ত্রাসভাবাপন্ন জাতি বা ইসলামফোবিয়ার যে ক্যাচাল উত্থাপিত হয়েছে, এর থেকে বুদ্ধিভিত্তিক ভাবধারায় মুসলমানদের বের হয়ে আসতে হবে। আমার মনে হয় আবদুল্লাহর ‘ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল ফেইথ হারমনি উইক’ প্রস্তাব এবং এটা সাদরে গ্রহণ এমন বুদ্ধিভিত্তিক কাজের একটি। মুসলমানদের কাজ ও কর্মের মাধ্যমে এ কথা বোঝাতে হবে, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় মুসলমানেরা অনেকের চেয়ে অগ্রজ। পজিটিভ এই স্লোগান জোরদার করতে পারলে মুসলমানদের নামে অসহিষ্ণুতা ও ইসলামফোবিয়ার যে অভিযোগ করা হয় তা ধোপে টিকবে না। আর এ কাজে ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব তথা আলেমসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। আলেমসমাজকে বুঝতে হবে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ইসলামের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার এক মাধ্যম। মক্কি ও মাদানি জিন্দেগিতে রসুল (স) হতে এমন অনেক নজিরের কথা উল্লেখ করা যাবে, যা তৎকালীন সমাজে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় ভেকসিনের ন্যায় দ্রুত কাজ করেছে।

কোরআন মুসলমানদের ইসলাম প্রচার ও প্রসারের স্বার্থে হিকমতের সঙ্গে দাওয়াহ কর্ম সম্পাদন, প্রয়োজনে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বিতর্কেরও অনুমোদন দেয়। যেকোনো সমাজে সব বিশ্বাসীর ইহজাগতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার ইসলাম স্বীকার করেছে। সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে অমুসলিমদের ধর্মীয় চেতনায় আঘাত করতে নিষেধ করা হয়েছে। কোরআনে আল্লাহ তায়ালার স্পষ্ট ঘোষণা: ‘আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা যাদের ডাকে, তোমরা তাদের গালি দিও না; তাহলে তারা অজ্ঞতাবশত অন্যায়ভাবে আল্লাহকেও গালি দেবে’ (৬ :১০৮)। এমন দ্ব্যর্থহীন ঘোষণার পর কোনো ধর্মপ্রাণ মুসলমান অন্য বিশ্বাসীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে পারে না।

এবারের ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল ফেইথ হারমনি উইকের মূল প্রতিপাদ্য ‘সকলের প্রতি সদয়, আল্লাহর সৃষ্টিকে সমানভাবে দেখা, সম্প্রীতির বাণী ছড়িয়ে দেওয়া’। এরূপ সব কাজ করাকে ইসলাম সর্বদা উত্সাহ দেয়। মুসলমানদের মধ্য থেকে কেউ যদি ধর্মের নামে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে কোনো অসহিষ্ণু বা সন্ত্রাসী কার্যক্রমে যুক্ত হয়, তবে এর দায় ইসলাম নেবে না। এ বিষয়টি সবাইকে অনুধাবন করতে হবে। বিশেষ করে আমাদের আলেমসমাজকে ইসলামের এই চরম সত্য কথাটি সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ইসলাম প্রচার হয়েছে সুন্দর ও উত্তম কথার মাধ্যমে, মানবতার প্রকৃতির সঙ্গে যায় না এমন কোনো কাজের মাধ্যমে নয়। আসুন, সম্প্রীতি বৃদ্ধির ঘোষিত এই সপ্তাহে ইসলামের কল্যাণের অন্তত কোনো একটি দিক কাজের মাধ্যমে অন্যের কাছে তুলে ধরি।

লেখক: অধ্যাপক, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ও ইন্টারফেইথ স্পেশালিষ্ট

ইত্তেফাক/এমআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x