ইসলামের দৃষ্টিতে সময়জ্ঞান

ইসলামের দৃষ্টিতে সময়জ্ঞান
[ছবি: সংগৃহীত]

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার পাঠানো নবি-রসুলগণের মাধ্যমে আমাদের অনেক ধরনের জ্ঞানদান করেছেন। তন্মধ্যে সময়জ্ঞান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আল্লাহ তাআলা বলেছেন: তিনিই আল্লাহ, যিনি ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছেন আসমানসমূহকে কোনো স্তম্ভ ছাড়া, তোমরা তা দেখছ। তারপর তিনি সমাসীন হলেন আরশের ওপর এবং সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়মাধীন করলেন, প্রত্যেকেই নির্দিষ্ট কাল মোতাবেক আবর্তন করে চলেছে। তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন যাবতীয় বিষয়, তিনিই বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন আয়াতসমূহ, যাতে তোমরা তোমাদের রবের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করতে পার (সূত্র: আল-কোরআন ১৩:২)।

সময়, মুহূর্ত, দিন, রাত, ঘণ্টা, মাস, বছর নিয়ে রয়েছে ৩৬৫টি আয়াত; যা মিরাকেল অব কোরআন হিসেবে বিবেচিত। মহান আল্লাহ আমাদের দুটি সময়জ্ঞান দান করেছেন—একটি সূর্যের মাধ্যমে, অন্যটি চন্দ্রের মাধ্যমে। সূর্য বছর ৩৬৫ দিন তথা ১২ মাসে এক বছর। আর চন্দ্র বছর ৩৫৪ দিনে, কিন্তু ১২ মাসেই এক বছর। দুটি ক্যালেন্ডার মানুষের জন্য অতীব জরুরি। তাছাড়া বিভিন্ন সংস্কৃতি থেকে বিভিন্ন আঞ্চলিক ক্যালেন্ডার তৈরি হয়েছে। তবে সবার জন্য জরুরি হচ্ছে আল্লাহ পাকের নিদর্শন সূর্য ও চন্দ্র অনুসারে যেই পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডার রয়েছে তা অনুসরণ করা। মহান আল্লাহ বলেন: তিনি এমন সত্তা, যিনি বানিয়েছেন সূর্যকে প্রচণ্ড দীপ্তিময় এবং চন্দ্রকে স্নিগ্ধ আলোকময় এবং নির্ধারিত করেছেন এর জন্য মনজিল, যাতে তোমরা জানতে পর বছরের গণনা ও হিসাব। আল্লাহ এসব নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। তিনি বিস্তারিতভাবে বিবৃত করেন আয়াতসমূহ সেই সব লোকের জন্য, যারা জ্ঞান রাখে (সূত্র: আল-কোরআন, সুরা ইউনুছ)। ১২ মাসে এক বছর, তন্মধ্যে চারটি মাস মহাসম্মানিত।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন, নিশ্চয় মাসসমূহের সংখ্যা আল্লাহর কাছে ১২ মাস, সুনির্দিষ্ট রয়েছে আল্লাহর কিতাবে সেদিন থেকে, যেদিন তিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান ও জমিন, এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মপথ। সুতরাং এই মাসগুলোর ব্যাপারে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম কোরো না (সূত্র: আল-কোরআন, সুরা তওবা)। এই চারটি বিশেষভাবে মর্যাদাসম্পন্ন মাস হলো—জিলক্বদ, জিলহজ ও মোহাররম। দিনের মধ্যে কিছু সময় রয়েছে, যখন দোয়া কবুল হয়। রসুলুল্লাহ (স) জুমার দিন সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, সে সময় যদি কোনো মুসলমান দাঁড়িয়ে সালাত কায়েম করে এবং আল্লাহর দরবারে কিছু চায়, তাহলে মহান আল্লাহ অবশ্যই তাকে তা দিয়ে থাকেন।

অতঃপর হুজুর (স) সেদিকে হাত দ্বারা ইঙ্গিত করে বললেন, তা খুবই স্বল্প সময়। সূত্র: সহিহ আল বোখারি। এ রকম উনিশটি বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন সময় রয়েছে, যখন আল্লাহ তাআলা দোয়া কবুল করেন। আল্লাহ তাআলা যেমন দিন সৃষ্টি করেছেন, তেমনি রাতও সৃষ্টি করেছেন। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি রাত ও দিনকে দুটি নিদর্শন করেছি। রাতের নিদর্শনকে করে দিয়েছি নিষ্প্রভ এবং দিনের নিদর্শনকে করেছি আলোকোজ্জ্বল, যাতে তোমরা তোমাদের রবের অনুগ্রহ অন্বেষণ করতে পার এবং যাতে তোমরা জানতে পার বছরের গণনা ও হিসাব, আর আমি প্রতিটি বিষয়কে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি (সূত্র: আল-কোরআন, ১৭:১২)।

প্রতি রাতে আল্লাহর রহমতপ্রাপ্তির মর্যাদাসম্পন্ন সময়। রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, রাতের শেষ তৃতীয়াংশ যখন বাকি থাকে, তখন আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতে দুনিয়ার আসমানে নাজিল হন আর বলতে থাকেন—কে আমার কাছে দোয়া করবে, আমি তার দোয়া কবুল করব। সূত্র: সহিহ আল বোখারি। চান্দ্রমাসের মধ্যবর্তী রাত হচ্ছে পূর্ণিমার রাত। হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (র) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা নবি করিম (স)-এর সঙ্গে বসা ছিলাম। তিনি রাত্রিবেলা পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা অচিরেই তোমাদের প্রভুকে এমনভাবে দেখতে পাবে, যেমন দেখতে পাচ্ছ পূর্ণিমার চাঁদ, তোমাদের দেখতে কোনো কষ্ট হবে না। সূত্র: সহিহ বোখারি, হাদিস-৬৯৩০।

বাবা আদম ও মা হাওয়া সন্তান গ্রহণ ব্যতিরেকে পূর্ণিমার রাতসমূহে আইয়াম বিজের রোজা পালন করতেন। এই আইয়াম বিজের রোজা রাখার জন্য রসুলুল্লাহ (স) আমাদেরও নির্দেশ দিয়েছেন। রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, নিশ্চয়ই তোমরা প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে আইয়াম বিজের রোজা রাখবে এবং বলতেন তা সারা বছর রোজা রাখার সমতুল্য। সূত্র: সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস-১৭০৭। সুনান আবু দাউদ, হাদিস-২৪৪৯।

যারা আল কোরআনের আয়াতের আনফাসি অর্থ জানেন, তারা অতি সহজে এই রাতে স্রষ্টার নিকটবর্তী হন। তাই সবাইকে সময়জ্ঞান অর্জন করে উত্তম সময়ে উত্তম কাজ সম্পন্ন করতে হবে। রসুলুল্লাহ (স) সময়কে গালি দিতে নিষেধ করেছেন। রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘তোমরা সময়কে গালি দিও না। কেননা, সময়ের নিয়ন্ত্রক হচ্ছেন মহান আল্লাহ তাআলা’ (সূত্র: সহিহ মুসলিম: ৬০০৩)। রসুলুল্লাহ (স) আরো বলেছেন: আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আদমসন্তান আমাকে কষ্ট দেয়। কারণ, সে সময়কে গালি দেয়, অথচ আমিই হচ্ছি সময়। আমি আল্লাহ রাত-দিনকে পরিবর্তন করি (সূত্র: সহিহ বোখারি, হাদিস নং-৪৭২৬)।

লেখক: চেয়ারম্যান, তাসাউফ ফাউন্ডেশন

ইত্তেফাক/এমআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x