অহংকার ও দাম্ভিকতা পরিত্যাজ্য

অহংকার ও দাম্ভিকতা পরিত্যাজ্য
ছবি: সংগৃহীত

একজন দায়ী ইল্লাল্লাহের মধ্যে রসুল (স)-এর দাওয়াতি চেতনার বহিঃপ্রকাশ থাকতেই হবে। রসুল (স)-এর দাওয়াতি মাধুর্য, জীবনচলার সারল্য, ব্যক্তি ও সামাজিকতায় অনন্য সর্বোপরি আল্লাহর সাহায্য দেখানো পথেই বর্তমানে একজন দায়ী সফল হবেন সন্দেহ নেই।

রসুল (স)-এর দাওয়াতি কাজের অন্যতম প্রধান দিক হলো ব্যক্তি বা সংগঠনকে অহংকার ও দাম্ভিকতা পরিহার করে প্রথমে নিজে বা নিজেদের শুদ্ধচারী হতে হবে। অর্থাৎ দায়ীর কথাবার্তা, আচার-আচরণ, সামাজিক যোগাযোগ, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক, রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে হবে। বাংলাদেশের আলেম সমাজকে এ বিষয়ের ব্যাপারে খুব বেশি সতর্ক হতে হবে।

স্যোশাল মিডিয়ার কল্যাণে আলহামদুলিল্লাহ অনেক দায়ীর ওয়াজ শুনে অনেকেই হেদায়াতে আলোর পরশ পাচ্ছেন। বর্তমানে স্যোশাল মিডিয়া ও ইউটিউবের কল্যাণে যেহেতু সব ওয়াজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলে যায় সেহেতু প্রত্যেক ওয়াজিনকে কথা বলার সময় অন্যান্য অনেক গুণের সঙ্গে অবশ্যই বিনয় ও নম্রতার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। কোনোভাবেই অহংকারী বা দাম্ভিক আচরণ করা শোভন হবে না। ‘আমি চল্লিশ বছর বুখারির দরস দিচ্ছি।

সুতরাং আমার চেয়ে হাদিস কেউ ভালো জানবে না, অনেকে বুঝেই না যে বৈজ্ঞানিক হাদিসগুলো আমার চোখে ধরা পড়ে’—এমন আরো অনেক অহংকার প্রকাশকারী শাব্দিক ঝংকার আমাদের শঙ্কিত করে তুলে। একশ্রেণির আলেমের নিজেদের মধ্যে এরূপ অহংকারী দাম্ভিকোক্তি আমাকে মুসা (আ)-এর সময়ের প্রখ্যাত আলেম বালআম ইবনে বাউরার কথা মনে করিয়ে দেয়। বালআম বাউরার ঘটনাটি এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে।

ফিলিস্তিন দখলকারী ‘জাব্বারিন’ তথা আমলে ক্বাস সম্প্রদায়ের শক্তিশালী নেতারা মুসা (আ) প্রেরিত ১২ জন প্রতিনিধিকে ফেরত পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেনি। কারণ তারা মুসা (আ)-এর মুজেজার কারণে ফেরাউনের সসৈন্যে সাগরডুবির খবর আগেই জেনেছিল। অতএব মুসা (আ)-এর বায়তুল মুক্বাদ্দাস অভিযান বন্ধ করার জন্য তারা বাঁকা পথ তালাশ করল।

তারা অত্যন্ত গোপনে বনু ইসরাইলের ঐ সময়কার একজন নামকরা সাধক ও দরবেশ আলেম বালআম ইবনে বাউরার কাছে বহু মূল্যবান উপঢৌকনাদিসহ লোক পাঠাল। বালআম তার স্ত্রীর অনুরোধে তা গ্রহণ করল। অতঃপর তার কাছে আসল কথা পাড়া হলো যে, কীভাবে আমরা মুসার অভিযান ঠেকাতে পারি। আপনি পথ বাতলে দিলে আমরা আরো মহামূল্যবান উপঢৌকনাদি আপনাকে প্রদান করব। বালআম উঁচুদরের আলেম ছিল। যে সম্পর্কে তার নাম না নিয়েই আল্লাহ বলেন, ‘আপনি তাদেরকে শুনিয়ে দিন সেই লোকটির অবস্থা, যাকে আমরা আমাদের নিদর্শনসমূহ দান করেছিলাম। অথচ সে তা পরিত্যাগ করে বেরিয়ে গেল।

আর তার পেছনে লাগল শয়তান। ফলে সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল’ (আরাফ ৭/১৭৫)। কথিত আছে যে, বালআম ‘ইসমে আযম’ জানত। সে যা দোয়া করত, তা সঙ্গে সঙ্গে কবুল হয়ে যেত। আমালেক্বাদের অনুরোধ ও পীড়াপীড়িতে সে অবশেষে মুসার বিরুদ্ধে দোয়া করল। কিন্তু তার জিহ্বা দিয়ে উলটা দোয়া বের হতে লাগল যা আমালেক্বাদের বিরুদ্ধে যেতে লাগল। তখন সে দোয়া বন্ধ করল। কিন্তু অন্য এক পৈশাচিক রাস্তা সে তাদের বাতলে দিল। সে বলল, বনি ইসরাইলগণের মধ্যে ব্যভিচার ছড়িয়ে দিতে পারলে আল্লাহ তাদের ওপরে নারাজ হবেন এবং তাতে মুসার অভিযান বন্ধ হয়ে যাবে’। আমালেক্বারা তার পরামর্শ গ্রহণ করল এবং তাদের সুন্দরী মেয়েদেরকে বনি ইসরাইলের নেতাদের সেবাদাসী হিসেবে অতি গোপনে পাঠিয়ে দিল। বড় একজন নেতা এ ফাঁদে পা দিল।

আস্তে আস্তে তা অন্যদের মধ্যেও সংক্রমিত হলো। ফলে আল্লাহ্র গজব নেমে এল। বনি ইসরাইলিদের মধ্যে প্লেগ মহামারি দেখা দিল। কথিত আছে যে, এক দিনেই ৭০ হাজার লোক মারা গেল। এ ঘটনায় বাকি সবাই তওবা করল এবং প্রথম পথভ্রষ্ট নেতাকে প্রকাশ্যে হত্যা করে রাস্তার ওপরে ঝুলিয়ে রাখা হলো। অতঃপর আল্লাহ্র গজব উঠে গেল। (কুরতুবি ও ইবনুকাছির উভয়ে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন উক্ত আয়াতের শানেনুজুল হিসেবে। তবে অনেকেই এগুলোকে ইসরাইলি বর্ণনা বলেছেন)। সম্ভবত সম্প্রদায়ের নেতাদের ক্রমাগত অবাধ্যতা, শঠতা ও পাপাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এবং একসঙ্গে এই বিরাট জনশক্তি বিনষ্ট হওয়ায় মুসা (আ) বায়তুল মুক্বাদ্দাস অভিযানের সংকল্প পরিত্যাগ করেন।

বালআম বাউরার তার অহমিকার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠে এবং তার অহমিকা ও পথভ্রষ্টের কথা জানিয়ে কোরআনে আয়াত নাজিল হয়। সুতরাং আমাদের আলেম সমাজ তথা দায়ী ইল্লাল্লাহদের এ বিষয়সমূহে সচেতন থাকতে হবে। শয়তানের প্রভাব মুক্ত থাকার অন্যতম দিন হলো অহমিকা পরিত্যাগ করা। নিজের বেশি জানার অহমিকা বা অন্যকে হেয় করার মানসিকতা পরিত্যাগ করে নিজেকে খুব ক্ষুদ্রভাবে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।

বিনয়ের সঙ্গে দাওয়াতে দিনের কথা মানুষের অন্তরে প্রবেশ করানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সুরা লোকমানে আল্লাহ অহংকার করতে নিষেধ করে বলেন, ‘আর তুমি মানুষের দিক থেকে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিও না। আর জমিনে দম্ভভরে চলাফেরা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক, অহংকারীকে পছন্দ করেন না’। (লোকমান :১৮) আল্লাহর কাছে আমাদের আরজি অহংকার মুক্ত মানবিক জীবন ও সমাজ প্রতিষ্ঠার। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

লেখক :অধ্যাপক, আদদাওয়া অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ও ইন্টারফেইথ স্পেশালিস্ট

ইত্তেফাক/এসআই

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x