মুক্তি, স্বাধীনতা ও ইসলাম

মুক্তি, স্বাধীনতা ও ইসলাম
ছবি: শিল্পী তাওসিন আরাফাত

ইসলাম সমাজ ও জীবনমুখী এমন এক ব্যবস্থা, যা সামাজিকভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। রসুল (স) মক্কার সামন্তবাদী নেতৃত্বের বেড়াজালে আটকা মানুষের মুক্তির পথ খুঁজতেই ধ্যানমগ্ন থাকতেন। এ ধ্যান ছিল মানুষের মুক্তির জন্য, একই রক্ত-মাংসের মানুষের বেড়াজালে আবদ্ধ ও শৃঙ্খলিত জিঞ্জির ভেঙে ফেলার, বুদ্ধি ও সমাজ মুক্তির আন্দোলনের চূড়ান্ত সফলতায় মানুষ পেল আশরাফুল মাখলুকাতের মর্যাদা। মক্কাবাসী অহংকার করেছিল, তাদের পতন হতে বেশি দিন লাগেনি। মানুষের প্রতি অত্যাচারের মাত্রা এত বেশি পরিমাণ ছিল যে তা বহন করতে মক্কাবাসী অপারগ হয়ে উঠেছিল। রসুল (স) যারপর নাই চেষ্টারত ছিলেন এসব অত্যাচারিত মানুষকে মুক্ত করার জন্যে। আবিসিনিয়া ও মক্কা হতে মদিনায় হিজরতের মূল কারণ ছিল মুক্তির নেশা।

মানুষ একমাত্র তার রবের কাছেই দায়বদ্ধ আর কারো কাছে নয়। এ বিষয়টি মানুষ ভুলতে বসেছিল। ইসলাম প্রভুত্বের সকল জাল ছিন্ন করে ঘোষণা করে, ‘আমি তাকে (ভাল-মন্দ) দুটো পথ দেখিয়েছি। কিন্তু সে ঢালু গিরিপথে প্রবৃত্ত হয়নি (যা তাকে সহজে সাফল্যে পৌঁছে দিত)। তুকি কি জান ঢালু গিরিপথ কি? একটি ঘাড় (একজন দাস) মুক্ত করে দেওয়া অথবা দুর্ভিক্ষের দিন খাওয়ানো, নিকট সম্পর্কের ইয়াতিমকে কিংবা অভাবগ্রস্ত মিসকিনকে (বালাদ-১১-১৬)।’ রসুল (স)-এর নেতৃত্বে দাসত্ববাদী মক্কায় এই যে দাস মুক্তির আন্দোলন শুরু হলো-এর সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন রসুল (স) নিজেই। রসুল (স) জন্মের পূর্ব থেকে পিতা-মাতার আনিত দাসী বারাকাহকে রসুল (স) ছোট সময়েই মুক্ত করে দিয়েছিলেন। কিন্তু রসুল মাতা আমেনাকে কথা দেওয়ার কারণে তিনি রসুল মুহাম্মদকে (স) ছেড়ে যাননি। এমনকি তিনি এক পর্যায়ে তাকে উম্মী বা ‘আমার মা’ বলে সম্বোধন করতেন। তাকে বিবাহ দেওয়ার পর তার একটি ছেলেসন্তান হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এ সন্তানের নামে উম্মে আইমান হিসেবে তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন। রসুল (স) শুধু দাসদের মুক্ত করেই ক্ষান্ত হননি; তিনি দাসকে সন্তান বানিয়েছেন, তিনি ক্রীতদাসকে ভাইয়ের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন, তিনি গোলামকে সেনা অধিনায়ক বানিয়েছেন। বংশানুক্রমিক দাসানুদাস কৃষ্ণবর্ণ হাবশি বিলাল (রা)-কে মসজিদে নববির প্রধান মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব অর্পণ করে দেখিয়েছেন ইসলামে মানুষের স্বাধীনতাই মূখ্য। এখানে সাদা-কালো আর ধনী-দরিদ্রের কোনো বিভাজন নেই। রসুল (স) বলেন,‘ সাদার উপর কালো, আরবের ওপর অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাদের যারা খোদাভীরু।’ দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার এ জয়গান যুগে যুগে মানুষকে দিয়েছে ভালোভাবে বেঁচে থাকার প্রেরণা। এক রাব্বুল ইজ্জতের দাসত্বই মানুষকে হাজারো দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারে। তাওহিদের এ ইস্পাতঢালা বাণীর অনুসারী রসুলের সাহাবিরা ছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ।

পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশকে দাসত্বের দাসখতে আবদ্ধ করতে চেয়েছে। এ কাজ করতে গিয়ে পবিত্র ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করেছে। কিন্তু বাংলার মানুষ শৃঙ্খলিত হবার নয়। এরূপ অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ইসলাম স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে। মজলুম জনতার কাতারে এসে কাজ করার জন্য সকলকে উদ্বুদ্ধ করেছে। মদিনার সনদের মাধ্যমে বৈষম্যহীন সমাজের যে চিত্র রসুল (স) আমাদের সামনে উপহার দিয়ে গেছেন এর সঠিক বাস্তবায়ন হলে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা আল্লাহর ওপর ভরসা করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আজকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান এসব মহান মুক্তিযুদ্ধার জন্য রইল আমাদের প্রাণখোলা দোয়া। আল্লাহ যেন তাদেরকে শহিদ হিসেবে কবুল করেন। যারা বেঁচে আছেন তাদের উত্তম জীবন দিন। পরিশেষে বলব, যে নীতি ও সামাজিক ন্যয়িবিচারের কথা বলে পাকিস্তানি নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল, কেবল এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার মনজিলে পৌঁছতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

লেখক :অধ্যাপক, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ,

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ও ইন্টারফেইথ স্পেশালিস্ট

ইত্তেফাক/এমএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x