মুক্তির রাত্রি পবিত্র শবেবরাত

মুক্তির রাত্রি পবিত্র শবেবরাত
ছবি: প্রতীকী ছবি।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট আরবি শাবান মাস একটি মর্যাদাসম্পন্ন মাস। এই মাসকে বলা হয় মাহে রমজানের প্রস্তুতি মাস। এই মাস আসিলে নবী করিম (স.) আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে অধিক হারে নিমগ্ন হইয়া পড়িতেন। অন্য মাসের তুলনায় অধিক করিয়া পালন করিতেন নফল রোজা। তাহা ছাড়া এই মাসে রহিয়াছে একটি ফজিলতপূর্ণ রাত্রি—লাইলাতুল বারাআত তথা শবেবরাত।

লাইলাতুল বারাআত অর্থ মুক্তির রাত্রি। আল্লাহ তায়ালা এই রাত্রে বান্দাদের এক বৃহৎ দলের গুনাহ মাফ করিয়া মুক্তি দেন। ট্যাক্স প্রদানকারী যেভাবে দায়মুক্তির সার্টিফিকেট পান, তেমনি আল্লাহ তায়ালা মুমিন বান্দাদের ক্ষমা করিয়া জাহান্নাম হইতে মুক্তির সার্টিফিকেট দেন বলিয়া এই রাতের নামকরণ করা হইয়াছে লাইলাতুল বারাআত (তাফসিরে কাবির)। তবে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের নিকট ইহা শবেবরাত বা ভাগ্যরজনী হিসাবে অধিক পরিচিত। এই রাত্রে পরবর্তী বত্সরের হায়াত-মওত, রিজিক, ধনদৌলত, আমল ইত্যাদির আদেশ-নিষেধের ফয়সালা হয়। আবার হাদিস শরিফে এই মহিমান্বিত রাত্রিকে ‘লাইলাতুন নিছফি মিন শাবান’ তথা শাবান মাসের মধ্যরজনি বলিয়া আখ্যায়িত করা হইয়াছে। কেননা ইহা শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত্রে আসিয়া থাকে।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘আমি ইহাকে অবতীর্ণ করিয়াছি এক বরকতময় রজনিতে, আমি তো সতর্ককারী। এই রজনিতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয় (সুরা দুখান-৩-৪)। এই জন্য হজরত ইকরামা (রা.) ও একদল আইম্মামে কিরামের মতে, এই আয়াতে উল্লিখিত ‘মোবারক রজনি’ দ্বারা বুঝানো হইয়াছে শবেবরাতকে। যদিও অনেকে ইহাকে লাইলাতুল কদর বলিয়া মনে করেন। এই মধ্য শাবানের রাত্রিতে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আসমানে তাহার রহমত প্রেরণ করেন এবং কালব গোত্রের মেষপালের পশমের চাইতে অধিকসংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করিয়া দেন (তিরমিজি)।

তত্কালীন আরব দেশে সর্বাধিকসংখ্যক মেষ ছিল কালব গোত্রের। ইহা দ্বারা বুঝানো হইয়াছে অসংখ্য মানুষকে আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করিয়া দেন। এই রাত্রের বিশেষ মাহাত্ম্য হইতেছে, এই রাত্রিতে আল্লাহ পাক বান্দার দোয়া কবুল করেন। পাঁচ রাত্রের দোয়া ফিরাইয়া দেওয়া হয় না—রজবের প্রথম রাত্রি, শবেবরাতের রাত্রি, জুমার রাত্রি, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার রাত্রি (বায়হাকি)। অন্য একটি বর্ণনায় শবেকদরের কথাও বলা হইয়াছে। তবে এই রাত্রে মুশরিক, হিংসুক, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, মদ্যপানকারী, আত্মহননকারী, জেনাকারী, গণক প্রভৃতি ব্যক্তিকে ক্ষমা করা হয় না।

প্রকৃতপক্ষে উম্মতে মোহাম্মদির মর্যাদা বৃদ্ধি, রহমত ও মাগফেরাতের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ হইতে শবেবরাত এক মহানিয়ামত। পাপ-পঙ্কিলতায় জর্জরিত হতভাগ্য ব্যক্তির জন্য খাঁটি তওবা করিয়া আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করে এই মহামান্বিত রজনি। তাই শবেবরাতে রাত্রি জাগিয়া একনিষ্ঠভাবে নফল নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়া-দরুদ ও জিকির-আজকারে মশগুল থাকা উচিত। শবেবরাতে কবর জিয়ারত করা সুন্নত; কিন্তু সমগ্র দেশে আবারও করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় জনসমাগম এড়াইতে বাসায় বসিয়া ইবাদত-বন্দেগি করাই বাঞ্ছনীয়। এই রাত্রে আতশবাজি ও পটকা ফুটানো, মসজিদ-দোকান, বাসাবাড়ি বা অফিস-আদালতে আলোকসজ্জা, কবরস্থানে পুষ্প অর্পণ ও আলোকসজ্জা, নারী-পুরুষের সম্মিলিত জিয়ারত, অযাচিত আনন্দ-উল্লাস, অযথা ঘোরাঘুরি, হইহুল্লোড় করা ইত্যাদি কাজে লিপ্ত থাকা অনুচিত। শবেবরাত উপলক্ষ্যে আমরা মুসলিম উম্মাহ ও বিশ্ববাসীর সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করি। সকলকে জানাই পবিত্র শবেবরাতের শুভেচ্ছা।

ইত্তেফাক/এএইচপি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x