রমাদান: ব্যক্তিত্ব বিকাশের শ্রেষ্ঠ সময়

রমাদান: ব্যক্তিত্ব বিকাশের শ্রেষ্ঠ সময়
ছবি: সংগৃহীত

একজন মুসলমান হিসেবে সম্পূর্ণ মাস গড়ে বিশ ঘণ্টা বিভিন্ন আমলে থাকার সুযোগ অনেকেই পায় না। ইসলামি জিন্দেগিতে মানুষের সৃষ্টির সঙ্গে ওয়াহদানিয়াত চূড়ান্তভাবে জড়িত। এ ওয়াহদানিয়াতের শিক্ষা দেওয়ার জন্য আল্লাহ প্রেরণ করেছেন শ্রেষ্ঠ রাসুল ও সাইয়্যেদুল মুরসালিন মুহাম্মদ (স)-কে। তার মাধ্যমে পাওয়া দিনের পদ্ধতিগত উপকরণ আমরা কুরআন ও হাদিসের মাধ্যমে বিস্তারিত পাই।

কুরআনের মৌলিক বিধির সম্প্রসারিত ব্যাখ্যা হলো হাদিসে রসুল (স)। রসুলের বাণীতে এসেছে রমজানের শুরুতে আকাশের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। অন্য এক রেওয়ায়েতে এসেছে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। কেবল তা-ই নয়, হাদিসের ঘোষণা অনুযায়ী সাওম একমাত্র আল্লাহর জন্যই রাখা হয় এবং আল্লাহ নিজে তার বান্দাকে এর উত্তম প্রতিদান দিবেন। রসুল (স) আমাদের শিক্ষক। তিনি নৈতিক চরিত্র শিক্ষা দেওয়ার জন্য আমাদের কাছে প্রেরিত হয়েছেন। তাকে অনুসরণের মাধ্যমেই আমরা চূড়ান্তভাবে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করব। তার অনুসরণ করব কীভাবে? আদর্শিক না শারীরিক? উত্তর দুভাবেই। তিনি যে আদর্শ রেখে গেছেন তার অন্যতম হলো নিজেকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্টের কাছে একজন সত্ ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করা।

নিজেকে সঠিক প্রমাণ করতে গেলে অবশ্যই কাজে ফাঁকি দেওয়া যাবে না, সুদ খাওয়া বা ঘুষ দেওয়া-নেওয়া করা যাবে না। পরিবার ও সমাজে ন্যায়বিচার কায়েমের চেষ্টায় রত থাকতে হবে। নিজের জন্য যা ভালো মনে করি তা অন্যের জন্য ভালো মনে করতে হবে। আরেকটি বড়ো কাজ হলো কারো সম্পদ অবৈধভাবে কবজা করা যাবে না। দৈনন্দিন ইবাদতের পাশাপাশি সকল কাজের দিকে নজর দিতে হবে কেবল রসুলের দেখানো পথে। যে রসুল শ্রেষ্ঠ তার অনুসরণেই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে।

পরিশুদ্ধির এ মাসে রসুলের ব্যক্তিত্বের আলোতে নিজেকে আলোকিত করার চেয়ে আর কোনো শ্রেষ্ঠ কাজ হতে পারে? এ মাসে রসুল (স)-এর কাজ কী ছিল? তিনি সওম পালন করতেন, বেশি করে সালাত আদায় করতেন, দুহাতে দান করতেন। দান তো জীবনের মহৌষধ। অন্য যে কোনো মাসের চেয়ে এ মাসের সদকাহ অনেক বেশি ছওয়াবের। মুসলমানেরা কিছু ব্যতিক্রম বাদে দান করার ইচ্ছা থেকে অনেকটা সরে এসেছে এমনকি দানের ক্ষেত্রকেও বিভাজন করেছে।

ধরুন, এখন দান বলতে আমরা মসজিদ, মাদ্রাসা (যাকাতের কিছু নির্ধারিত সীমা বাদে) সর্বোপরি এতিমদেরকে অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান দেওয়াকে বুঝি। কিন্তু বিষয়টা কিন্তু এরূপ নয়। মানবকল্যাণের সকল শাখায় আপনার দানের অর্থ বিনিয়োগ করতে পারবেন। ধর্মহীন, ভিন্নধর্ম এমনকি পশু-পাখিকেও আপনি খাওয়াতে পারেন। সাহায্য সহযোগিতা করতে পারেন। এটাই দান। দানের অর্থের আলো প্রয়োজনীয় সবাইকে আলোকিত করলেই এর যথার্থ সুফল পাওয়া যায়। এ মাসে যদি সাধ্যমতো এমনকি সাধ্যের বাইরে গিয়েও দান করি, অবশ্যই আল্লাহ আমাদের বালা-মুছিবত দূর করবেন, আয় রোজগারে বরকত দিবেন।

রামাদানকে সামনে নিয়ে রসুলের উম্মত হিসেবে ইবাদতের পরাকাষ্ঠা দেখাতে পারি, তবে এ কথা নিশ্চিত বলা যায়, সমাজের একজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে আমরা নিজেকে খুঁজে পাব। একজন আমানতদার , চরিত্রবান, দুর্নীতিহীন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য রমজানে রসুলের সুন্নতি কর্মসূচির প্রতি অনুগত্যকারী প্রতিটি মানুষই শ্রেষ্ঠ। অনেক ভালোর সঙ্গে কষ্টের কথা হলো আমরা নামাযও পড়ি আবার মিথ্যা কথাও বলি। সাওম পালনের আত্মিক উন্নতির চেষ্টা তো দূরে থাক বৈশ্বিক কৃচ্ছ্রসধনের চেষ্টাও করি না।

সারা বিশ্বে জাতীয় ও আধ্যাত্মিক এসব বিশেষ সময়ে সকল পণ্যের মূল্য কমিয়ে দেওয়া হয় আর আমার প্রিয় বাংলাদেশে সবকিছুর মূল্য বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। অতিরিক্ত মুনাফার এ প্রবণতা থেকে আমাদের বের হয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে। আমরা যদি আত্মিক উন্নতির জন্য সমগ্র মাসটিকে ব্যবহার করি, সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক কার্যক্রমকে ছওয়াবের মধ্যে সংযুক্ত করি, তবে ব্যক্তি হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের তকমা থেকে কেউ দূরে থাকব না। আসুন, শ্রেষ্ঠ মাসে শ্রেষ্ঠ রসুলের তরিকায় নিজেকে শ্রেষ্ঠ ও ব্যক্তিত্বশীল করে তুলি। আর সব কর্মের বিনিময়ে আলমে আখেরাতে আল্লাহর কাছে মুক্তি চাই।

লেখক: অধ্যাপক, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ ও ইন্টারফেইখ স্পেশালিস্ট

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x