কিয়ামতের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব

কিয়ামতের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব
পৃথিবী। ছবি: সংগৃহীত

প্রত্যেককে মৃত্যুর আস্বাদ পেতে হবে এবং কিয়ামতের দিন কৃতকর্মের পূর্ণ প্রতিফল দেওয়া হবে (কু:৩. ১৮৫)। কিয়ামত অর্থ দণ্ডায়মান হওয়া, পুনরুত্থিত হওয়া। মৃত্যুর পর সবাইকে উঠিয়ে আনাই কিয়ামত, যে দিনে এই উত্থান হবে সেই দিনটিই কিয়ামতের দিন। এই দিনে সবাইকে সমবেত করা হবে তাই এই দিন সমবেত হওয়ার বা হাশরের দিন। এই দিন প্রত্যেকে তার আমলনামা (ক্রিয়াকর্মের প্রমাণপত্র) অনুযায়ী হয় বেহেশত, নয় দোজখে যাবে। যে বেহেশতে যাবে সে পাবে এমন এক মনোরম উদ্যান, যার নিচ দিয়ে বয়ে যাবে নদী, সেখানে সে পাবে নানা ফলমূল, যা ইতিপূর্বে সে পেত এবং আরো পাবে সুন্দর সহচরী/সহচর, তার আকাঙ্ক্ষিত সবকিছু, পছন্দসই মাংস, রেশমি পোশাক, সোনার অলংকার, সুস্বাদু পানীয় ইত্যাদি—বর্তমান বিশ্বে সুখী মানুষ যা পেয়ে থাকে সেই রকমই। আর যে দোজখে যাবে সে থাকবে সাইমুম ঝড় আর উত্তপ্ত হাওয়ার মধ্যে, খাদ্য পাবে কাঁটাওয়ালা ডালপালা, ফুটন্ত পানি এবং সে জ্বলবে ভয়াবহ আগুনে।

Earth has a 'pulse' of 27.5 million years | Live Science

কিয়ামত বা পুনরুত্থানের অন্য বর্ণনায় কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ এই (মহাবিশ্ব) সৃষ্টির সূচনা করেছেন, অতঃপর পুনরায় তা সৃজন করবেন এবং তারপর তোমরা তার দিকে প্রত্যাবর্তন করবে’ (কু:৩০.১১) এই জন্য যে, ‘যারা বিশ্বাস করেছে ও সত্কর্ম করেছে তাদের (আল্লাহ) সঠিক প্রতিদান দেন এবং যারা অবিশ্বাস করেছে তাদের পানীয় হবে ফুটন্ত এবং তারা পাবে মর্মন্তুদ শাস্তি’ (কু:১০.৪)। এই পুনর্বার সৃষ্টির প্রক্রিয়া হচ্ছে, ‘সেদিন আমি (আল্লাহ্) আকাশকে গুটিয়ে (সংকুচিত করে) ফেলব যেভাবে গুটিয়ে ফেলা হয় লিখিত কাগজ (স্ক্রল); যেভাবে আমি সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবে আমি পুনরায় সৃষ্টি করব...আর আমি উপদেশ প্রদানের পর ঐশী গ্রন্থে লিখে দিয়েছি যে (সেই) পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে সৎকর্মপরায়নগণ’ (সুরা আম্বিয়া আয়াত ১০৪-৫)। মানুষও এই প্রক্রিয়ার মাঝে পুনরায় সৃষ্টি হবে। বলা হয়েছে, ‘তোমাদিগকে যেভাবে তিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন তোমরা তেমনিভাবে ফিরে আসবে (পুনরায় সৃষ্ট হবে)’ (কু:৭.২৯) এবং ‘আমি যখন ইচ্ছা করব তখন তাদের পরিবর্তে তাদের অনুরূপে পরিবর্তিত করব’ (কু:৭৭.২৮)। কুরআনের মর্মকথা হলো, যে প্রক্রিয়ায় এই বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে, মহাবিশ্ব ও মানুষ পুনরায় সেইভাবে সৃিষ্ট হবে; যদি বর্তমান পৃথিবীতে কেউ ভালো কাজ করে থাকে তবে নতুন পৃথিবীর (সুখের) উত্তরাধিকারী সেই মানুষই হবে এবং দুষ্কৃতকারীরা মর্মন্তুদ পরিবেশে নিপতিত হবে।

কিয়ামত সম্পর্কে বর্ণিত এই দুইটি প্রক্রিয়ার প্রথম প্রক্রিয়ায়, মৃত্যুর পর সব মানুষকে উঠিয়ে এক ময়দানে সমবেত করা এবং দ্বিতীয় বর্ণনায়—এই মহাবিশ্ব পুনর্বার সৃষ্টি হবে এবং মানুষের মতো মানুষও পুনর্বার সৃষ্টি হবে। এই দুটি প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি রূপক, অন্যটি অকাট্য/সুস্পষ্ট হতে পারে অথবা একটি প্রক্রিয়া অন্যটির পরিপূরক হতে পারে। আল্লাহ ভালো জানেন।

বর্তমান বিজ্ঞান কিয়ামতের দ্বিতীয় বর্ণনার অভিমুখী। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘মহাকাশ ও পৃথিবী একত্রিত ছিল এবং আমি (আল্লাহ্) তা বিচ্ছিন্ন করেছি’ (কু: ২১.৩০); ‘মহাশক্তি দিয়ে আমি এই মহাকাশ সৃষ্টি করেছি এবং তা সম্প্রসারণ করে চলেছি’ (সুরা যারিয়া আয়াত ৪৭)। বিজ্ঞানীগণ গত শতাব্দীতে বুঝতে পেরেছেন যে এই মহাকাশ বা মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে; অর্থাৎ অতীতে মহাবিশ্বের আয়তন কম ছিল; প্রায় দেড়-দুই হাজার কোটি বছর আগে মহাবিশ্বের আয়তন প্রায় শূন্য ছিল। সেই অকল্পনীয় কম (প্রায়-শূন্য) আয়তনের মধ্যে মহাবিশ্বের সবকিছু এমন সংকুচিত ছিল যে অসীম ঘনত্ব ও তাপমাত্রার (তথা অসীম আভ্যন্তরীণ চাপের) ফলে মহাবিস্ফোরণ (বিগ ব্যাং) ঘটে এবং সূচনা হয় এ মহাবিশ্ব সৃষ্টির। (প্রচণ্ড নাদ, মহাবিস্ফোরণ ইত্যাদি কুরআনে বহুবার উল্লিখিত)। সেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণের ফলে সব পদার্থ বিস্ফোরণের কেন্দ্রবিন্দু থেকে সব দিকে তীব্র বেগে ধাবিত হয়। কেন্দ্র থেকে এই দূরে সরে যাওয়াই সম্প্রসারণ।

মৃত্যুর পর রুহ কোথায় যায়

সম্প্রসারণের ফলে বিস্ফোরিত আকাশ শীতল হয়, পদার্থ ঘনীভূত হয়, কঠিন পদার্থ যথা গ্যালাক্সি নক্ষত্র গ্রহ উপগ্রহ সৃষ্টি হয়; পৃথিবী মানুষ বাসের উপযোগী হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান মহাবিশ্বের এই সম্প্রসারণের তিন প্রকার ভবিষ্যৎ থাকতে পারে। এক. সম্প্রসারণ অনন্তকাল চলতে থাকবে। দুই. সম্প্রসারণ একদিন থেমে যাবে এবং মহাবিশ্বের আয়তন সেইখানেই স্থির থাকবে। তৃতীয় সম্ভাবনা হলো, সম্প্রসারণ থেমে গিয়ে পুনরায় সংকোচন হবে, মহাবিশ্বের আয়তন আবার প্রায় শূন্য হয়ে অসীম অভ্যন্তরীণ চাপের ফলে মহাবিস্ফেরণে আবার মহাবিশ্ব সৃষ্টি হবে। এই তৃতীয় সম্ভাবনাটি কুরআনে বর্ণিত কিয়ামত প্রক্রিয়ার অধিকতর নিকটবর্তী। বৈজ্ঞানিকগণ বলছেন যে মহাবিশ্বের এই সম্প্রসারণ ও সংকোচন দুটি ভিন্ন বলের ওপর নির্ভরশীল। একটি বল হচ্ছে বিস্ফোরণজনিত (কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যাওয়ার বিক্ষেপণ) বল যার ফলে মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং দ্বিতীয়টি হলো পদার্থের পারস্পরিক আকর্ষণ বা মহাকর্ষ বল। মহাবিশ্বে পদার্থের পরিমাণ যদি একটি নির্দিষ্ট মাত্রার কম থাকে তবে এই সম্প্রসারণ রোধ করার মতো মহাকর্ষ বল অপ্রতুল হবে এবং মহাবিশ্ব অনন্তকাল প্রসারিত হতে থাকবে। আর মহাবিশ্বে পদার্থের পরিমাণ যদি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে বেশি হয় তবে পদার্থসমূহের পারস্পরিক আকর্ষণ বল এত অধিক হবে যে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ শ্লথ হয়ে যাবে, থেমে যাবে এবং উলটো এ মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে থাকবে, সংকুচিত হতে হতে আগের মতো প্রায় শূন্য আয়তনে পৌঁছে আভ্যন্তরীণ অসীম চাপের ফলে পুনরায় বিস্ফোরিত হয়ে নতুন মহাবিশ্বের সৃষ্টি হবে। মহাবিশ্বে কী পরিমাণ পদার্থ আছে বিজ্ঞানীগণ তা অন্বেষণ করছেন।

Sunrise Over Planet Earth Wall Paper Mural | Buy at EuroPosters

দিন যত যাচ্ছে পদার্থ আবিষ্কারের পরিমাণ তত বাড়ছে। বিচিত্র নয় যে অচিরে বিজ্ঞানীগণ বুঝতে পারবেন যে মহাবিশ্বে এত বেশি পদার্থ (মহাকর্ষ বল) আছে যে এই মহাবিশ্ব একদিন সংকুচিত হতে বাধ্য হবে এবং পুনরায় বিস্ফোরণের মাধ্যমে পুনর্বার এ মহাবিশ্বের মতো মহাবিশ্ব সৃষ্টি হবে, পুনরায় মানুষও সৃষ্টি হবে। এই পুনরাবৃত্তি (ওসিলেটিং) চলতে থাকবে। কুরআনে বর্ণিত কিয়ামত প্রক্রিয়াকে বৈজ্ঞানিকগণ স্বীকার করে না নিলেও স্বীকার করার পথে। কোনো কোনো বৈজ্ঞানিক ভাবছেন যে, বর্তমান মহাবিশ্বের কোনো তথ্য পরবর্তী মহাবিশ্বে পৌঁছবে না। এ বিষয়ে কেউ নিশ্চিত নন। তথ্য পৌঁছাক আর না-ই পৌঁছাক, বর্তমান মহাবিশ্বের তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী মহাবিশ্বে ব্যক্তিবিশেষের ভাগ্য নির্ধারিত হবে—এটি বিশ্বাসের বিষয়। সুরা হুদে বলা হয়েছে পুণ্যবান জান্নাতে (মনোরম উদ্যানে) এবং পাপাচারী নরকে ততদিন থাকবে যতদিন মহাকাশ ও পৃথিবী থাকবে (আয়াত ১০৮-৯)। সময়কাল এবং ঘটনাপ্রবাহ নির্ভর করবে পুনর্গঠিত মহাবিশ্বের সূচনালগ্নে সৃষ্টিকর্তা বিজ্ঞানের যে প্রকার সূত্র বেঁধে দেবেন তার উপরে? মানুষের বুঝবার শক্তি অত্যন্ত সীমিত। (কৃতজ্ঞতা স্বীকার :স্টিফেন হকিং :এ ব্রিফ হিস্টরি অব টাইম এবং কার্ল সাগান: কসমস )

লেখক: প্রকৌশলী ও প্রাবন্ধিক

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x