করোনাকালে বাবা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কাছে ছেলের চিঠি

রডরিগো গার্সিয়া

রডরিগো গার্সিয়া
গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

এমন একটা দিনও যাচ্ছে না বাবা, যেদিন তোমার সেই ‘কলেরার দিনে প্রেম’ উপন্যাসে তোমার বলা গল্পগুলোর মুখোমুখি হতে হচ্ছে না আমাকে। বারবার মনে হচ্ছে, আচ্ছা, কেমন লাগতো তোমার, যদি তুমিও আজ এখানে থাকতে।

গ্যাবো,

তোমার জন্মদিন চলে গেল এই ১৬ এপ্রিল। আর দেখ, পৃথিবীটা চলছে ঠিক তেমনই, যেমনটি সে চলে এসেছে চিরকাল। তার দিন চলছে মানুষের চমকপ্রদ সব সৃজনশীল নিষ্ঠুরতা, হৃদয়ের অবিশ্বাস্য ঐশ্বর্য আর আত্মত্যাগ, আর এ দুইয়ের মাঝামাঝি আরও যা কিছু থাকা সম্ভব, তেমন সব কিছুর মধ্য দিয়েই।

এক নতুন বস্তুর আবির্ভাব এই সময়ে ঘটেছে অবশ্য: মহামারি। আমাদের জ্ঞান যতদূর দৌড়ায়, তাতে জেনেছি কোনো এক মাংসবাজারে কোনো এক ইতর প্রাণীর দেহ থেকে একটি জীবাণু হঠাৎ লাফ দিয়ে ঢুকে পড়েছে মানুষের দেহে। সামান্য ভাইরাসের জন্য সেটি হয়তো একটি ছোট্ট পদক্ষেপ, কিন্তু তার প্রজাতির জন্য নিঃসন্দেহে এক বিরাট উল্লম্ফন। অতিক্ষুদ্র জীব, কল্পনার অতীত দূরবর্তী কোনো এক কালান্তর থেকে প্রাকৃতিক নির্বাচনের সূত্রে বিবর্তিত হয়ে আজ রূপ নিয়েছে গোগ্রাসী এক ক্ষুদে-দানবে। অবশ্য এভাবে তার পরিচয় করিয়ে দেয়াটা, ঠিক ভদ্রোচিত বলে মনে হচ্ছে না, এবং আমি নিশ্চয়ই দুঃখিত যদি আমার কথায় আমি তাকে আহত করে থাকি কোনোভাবে। তবে এটা তো সত্যি যে, আমাদের প্রজাতির ওপর বিশেষ কোনো বিদ্বেষ জমা নেই তার মনে। সে কেবল মারে আর মারে, কারণ সে মারতে পারে। নিশ্চয়ই বিষয়টি আমরা বুঝি, ব্যক্তিগত শত্রুতার কোনো প্রশ্নই ওঠে না এখানে।

এমন একটা দিনও যাচ্ছে না বাবা, যেদিন তোমার সেই ‘কলেরার দিনে প্রেম’ উপন্যাসে তোমার বলা গল্পগুলোর মুখোমুখি হতে হচ্ছে না আমাকে। কিংবা গল্পের এই নামের ঝঙ্কারটাই ঝনঝনিয়ে উঠছে না আমার মনের মধ্যে, কিংবা মনে হচ্ছে না যে, আটকা পড়ে গেছি ‘শতবর্ষের নির্জনতা’ গল্পের সেই নিদ্রাহারা-অসুখের মহামারির মধ্যে। মনের মধ্যে এই ভাবনাটা কিছুতেই না এসে পারে না যে, তুমি যদি থাকতে আজ, কীভাবে, কোন চোখ দিয়ে তুমি দেখতে এসব ঘটনা। মহামারি তোমাকে চিরকাল মোহিত করেছে, তা সে বাস্তব এই দুনিয়ার কিংবা সাহিত্যের কল্পনার, যেখানেই হোক না কেন, আর তোমাকে মুগ্ধ করেছে মানুষ, আর যা কিছু, যারা ফিরে আসে সবকিছু শেষ হওয়ার পরও।

স্ত্রী এবং দুই ছেলের সঙ্গে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

স্ত্রী এবং দুই ছেলের সঙ্গে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

স্প্যানিশ ফ্লু যখন এই পৃথিবীকে তছনছ করছিল, যখনও জন্ম হয়নি তোমার। যদিও এমন এক পরিবারের ছেলে ছিলে তুমি যেখানে সর্বদা রাজত্ব করে বেড়াত শুধু গল্প আর গল্প, যেখানে ভুত আর মনস্তাপের মতো মহামারিও ছিল সেই সাহিত্যের উত্তম উপাদান। তুমি বলতে, মানুষরা যখন দূর অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো গল্পের সময়ের কথা বোঝাতে চাইত, তখন তারা ধূমকেতুর দিনগুলোর বরাত দিত। বোধ করি তারা বলতে চাইত বিশ শতকের শুরুর দিকে আকাশে ক্ষণিক দেখা সেই হ্যালির ধূমকেতুর দিনগুলোর কথা। আমার মনে আছে মিলেনিয়ামের শেষদিকে সে যখন আবার পৃথিবীর আকাশে আরেকবার ফিরবার তোড়জোড় করছে, কী তীব্র আগ্রহ নিয়ে তুমি অপেক্ষা করতে, তাকে নিজের চোখে দেখবার জন্য। তুমি কেমন অবাক হতে এই ভেবে যে, অলীক একটা ঘড়ি কী আশ্চর্য নিয়মে প্রতি ৭৬ বছর পর পর নিঃশব্দে একবার করে ঘণ্টা বাজিয়ে যাচ্ছে, যে সময়টা আবার কিনা একজন মানুষের একজীবনের জন্য বরাদ্দ গড় আয়ুর সমান। এই মিলটা কি খুব কাকতালীয়? হতেও পারে এটি নতুন কোনো প্রহেলিকা। তুমি তো ঈশ্বরে অবিশ্বাসী ছিলে, অথচ তুমি এটাও বলতে, এসবের পেছনে কোনো মহাপরিকল্পনা নেই, এমনটা ভাবা অসম্ভব, মনে পড়ে? গল্প বলার সেই বলিয়ে তো আর নেই। আর তাছাড়া, এসব কৌতুহল বিষয়ে আমার চেয়ে আজ বরং তোমারই অনেক বেশি জানা হয়ে গেছে, হয়তো বা।

আবারও এসেছে মহামারি। আর বিজ্ঞানের অসীম অর্জন আর মানব প্রজাতির সুবিখ্যাত সৃজনশীলতা সত্ত্বেও আজ আমাদের সর্বোচ্চ বিধ্বংসী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হচ্ছে, আর কিছুই না, শুধু নিজেকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখো। শ্বাপদ খাদকের খপ্পর থেকে বাঁচতে গুহার আরো গভীরে লুকিয়ে ফেলো নিজেকে। তুলনামূলক সরলমনা মানুষ যারা, বিষয়টা তাদের জন্য হয়তো কমবেশি বিব্রতকর, তবে অন্যদের জন্য তা যথারীতি একটা নতুন ঝামেলা, যার বিনাশ ঘটাতে হবে এখনি।

ভয়াবহ সর্বনাশ ঘটছে দুনিয়ার যে যে দেশে, তার মধ্যে পড়ে গেছে তোমার প্রিয় দুটি দেশও, স্পেন আর ইতালি। হাজারবার তুমি আর মার্সিডিজ বেড়াতে গিয়েছ ওই সব জায়গায়। বার্সেলোনা, মাদ্রিদ আর মিলানের সেইসব ফ্ল্যাটে, এখনো হয়তো লড়ে যাচ্ছে তোমার পুরনো বন্ধুদের কেউ কেউ। আমি শুনেছি, ওই প্রজন্মের লোকজন নাকি বলে বেড়াচ্ছেন, তারা হার মানবেন না কিছুতেই, অন্য কোনো কারণ নয়, কেবল এই কারণে যে, এতগুলো দশক ক্যান্সার, স্বৈরাচার, কেজো-চাকরি, দায়-দায়িত্ব আর বিবাহিত জীবন পার করে দিয়ে আসার পর সামান্য ফ্লুর হাতে হত হওয়ার কোনো অর্থই হতে পারে না।

শুধু মৃত্যুই যে আমাদের আতঙ্কিত করছে তা নয়, আমাদের ভীতু করে দিচ্ছে প্রেক্ষাপটটিও। এটি এমনই এক চূড়ান্ত প্রস্থান, যেখানে নেই কোনো বিদায় সম্ভাষণ, ভিন গ্রহের প্রাণীর মতো কিম্ভূত পোশাকে সর্বাঙ্গ মোড়ানো অচেনা কয়েকটি মানুষের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে নির্বিকার চলে যাওয়া। অনেক দূরের, একই অবস্থার শিকার, অন্য মানুষ ঘিরে থাকা, অচেনা যন্ত্রপাতির বিপ-বিপ শুনতে শুনতে মরে যাওয়া। এ হচ্ছে তাই, যা ছিল তোমার সবচেয়ে বড় ভয়, নিঃসঙ্গতা।

ড্যানিয়েল ডিফোর ‘প্লেগের বছরের দিনপঞ্জি’ নিয়ে তুমি বলতে, এটি নাকি তোমার ‘মহৎ’ অনুপ্রেরণা। অথচ গতকালের আগে অবধি আমি ভুলেগিয়েছিলাম যে, তোমার প্রিয়স্য প্রিয় ‘রাজা ইদিপাস’ গল্পের ভিতরেও আমরা দেখেছি, কীভাবে একটি মহামারি ঠেকানোর মরিয়া চেষ্টা করে যাচ্ছেন এক হতভাগ্য রাজা। আমার সবচেয়ে বেশি যা মনে হতো, তা হচ্ছে, রাজার দুর্ভাগ্যের গল্পটি বিয়োগান্তক পরিহাস। অথচ মহামারি না এলে কী হতো? মহামারির আবির্ভাব আর তার ধাক্কাতেই কিন্তু ঘটনাগুলো গড়িয়ে যেতে বাধ্য হলো নিয়তির অনিবার্য পরিণতির দিকে। তুমি বলতে, মহামারি যে কারণে আমাদের ত্রস্ত করে, কারণ, সে আমাদের মনে পড়িয়ে দেয় আমাদের ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্যের গাথা। যতই সতর্ক থাকি, যতই চিকিৎসা সুবিধা থাকুক, যতই বয়স হোক, কিংবা যতই টাকা থাকুক, সব দুপায়ে মাড়িয়ে যে কোনো সময়ে যে কারো বুকেই এসে টোকা দিতে পারে মৃত্যুদূত। নিয়তি আর মৃত্যু, প্রিয় বিষয় চিরকাল কত কতই না লেখকের।

আমার মনে হয় আজ তুমি যদি এখানে থাকতে, তোমাকে মুগ্ধ করতো মানুষ। ‘মানুষ’ কথাটি অবশ্য সেই অর্থে আর ব্যবহার হয় না বহুদিন। কিন্তু আমি একটু অন্যরকম বলব, সেই পিতৃতান্ত্রিকতাকে সম্মতি দিয়ে নয় যাকে ঘৃণা করতে তুমি, বরং এ কারণেই, যেহেতু তরুণ আর স্বপ্নবান লেখকদের কানে কানে তা ধ্বনিত হবে, যে তরুণ একদিন ছিলে তুমিও। তোমার মাথার ভিতর মনে হয় একটু বেশিই প্রজ্ঞা আর বুদ্ধি নিয়ে, যা দিয়ে কী যে করতে হবে, তা ভাবতেও পারতে না তুমি। আর আমি বলব আগেই লিখিত থাকে নিয়তি, এমনকি সেই প্রাণীটির জন্যেও যে কিনা গড়া হয়েছে ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি হিসেবে আর অভিশপ্ত করা হয়েছে স্বাধীন ইচ্ছার শাপে। এমন দিনে নিজের অসহায়ত্ব দেখে নিজের জন্য করুণা হতো তোমার, আর আমাদের আত্মিক বন্ধনের ব্যাপ্তি দেখে মোহিত হতে তুমি, বিষণ্ণ হতে ভোগান্তি দেখে, ক্রোধে পুড়তে আমাদের কিছু কিছু নেতার নির্বুদ্ধিতা দেখে আর অভিভূত হয়ে যেতে যুদ্ধের প্রথম সারির যোদ্ধাদের বীরত্ব দেখে। তোমার জানার আরো ইচ্ছে হতো, মিলনের আকাঙ্ক্ষায় কীভাবে এদিন সব বাধা, এমন কি মৃত্যুভয় তুচ্ছ করছিল প্রেমিক-প্রেমিকারা। মূল কথা, মানুষ তোমার ততই প্রিয় থাকত যতটা প্রিয় তারা ছিল তোমার চিরকাল।

সপ্তাহ কয়েক আগে, আমাদের গৃহবন্দী হওয়ার প্রথম দিনগুলোতে আমার বুদ্ধি আমাকে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছিল, এই সবকিছুর অর্থটা আসলে কী, কিংবা, কী হতে যাচ্ছে এসবের পরিণতি? আমি পারিনি। সবকিছু অতিরিক্ত কুয়াশায় ঢাকা। আর এখন যখন এসব ঘটনা প্রাত্যহিক গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে, একটি পর্যায়ে যা হয়ে থাকে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যুদ্ধটির মধ্যেও, সেই তখনও আমি পারিনি এর সন্তোষজনক কোনো উত্তর খুঁজে পেতে।

অনেকে তো এখনই প্রায় নিশ্চিত যে এই জীবন আর আগের মতো হবে না কখনই। যা হবে, আমাদের মধ্যে কেউ কেউ অনেক বেশি বদলাবে, কেউ কেউ অল্প বদলাবে, তবে বেশিরভাগেরই কিন্তু ফিরতে হবে সেই পুরনো দৌড়াদৌড়িতেই। এই সময় এমন একটা বিতর্ক কি হবে না যে, মহামারি তো প্রমাণ দিল যে কত অকল্পনীয় পদ্ধতিতেও উবে যেতে পারে এ জীবন, এবং সে কারণেই কী আরো একটু প্রবলভাবে বাঁচা উচিত নয় আমাদের, এবং তা এখনি? এই মতটি অবশ্য ব্যক্ত করেছে তোমারই পৌত্রবর্গের কোনো একজন সদস্য।

চলাফেরার ওপর কড়াকড়ি শিথিল হয়ে আসছে কোথাও কোথাও। ধীর লয়ে ফের স্বাভাবিকতার পথে ফেরার চেষ্টা করছে পৃথিবী। আসন্ন মুক্তির স্বপ্নে বিভোর থেকে অবশ্য অনেকে এরই মধ্যে ভুলে বসে আছেন যে, দিনকয়েক আগেই ঈশ্বরের কাছে কী কী প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তারা। আমাদের সত্ত্বার গভীরে মহামারির প্রভাবের প্রতিক্রিয়াটি শুরুর আগেই কিন্তু শুরু হয়ে গেছে তার বিলয় প্রক্রিয়া। আমাদের নিজেদের মধ্যেও অনেকে, যারা গভীরভাবে চেষ্টা করছে বিষয়টি বোঝার, তারাও এর ব্যাখ্যা দিতে শুরু করে দেবে অনায়াসে নিজেদের মতানুসারেই। প্রিয় নেশা হিসেবে কেনাকাটার নেশাটি তো ইতোমধ্যেই সাড়ম্বরে ফিরে এসেছে আমাদের মাঝে।

আমি এখনও আটকে আছি একটা কুয়াশার মধ্যে। মনে হচ্ছে, আমাকে অপেক্ষা করতে হবে বর্তমান আর আগামী দিনের গুরুদের জন্য, যাদের কথা শুনে হজম করে নিতে পারব আমাদের অভিন্ন এই অভিজ্ঞতার গল্প। আমি আছি সেই দিনটির অপেক্ষায়, যেদিন একটি গান, একটি কবিতা, একটি মুভি কিংবা একটি উপন্যাস আমাকে হাত ধরে নিয়ে যাবে সেই প্রান্তরে যেখানে প্রোথিত রয়েছে গোটা বিষয়টি নিয়ে আমার চিন্তা-ভাবনা আর অনুভবগুলো। যেদিন সেখানে পৌঁছাব, সেখানে কিছু খোঁড়াখুঁড়ি নিজেকেও করতে হবে, আমি জানি। আর ততদিন, আপন চক্রাবর্তে ঘুরেই চলবে পৃথিবী আর জীবন রয়ে যাবে ঠিক তেমনই রহস্যগর্ভ, শক্তিমান আর অভাবনীয়। কিংবা, তুমি যেমনটি বলতে, অল্প বিশেষণ আর অনেক বেশি কবিতা মিশিয়ে, জীবনকে কেউই কিছু শেখাতে পারে না, কখনই।

রডরিগো: নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে

ইত্তেফাক/আরএ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত