ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
২৮ °সে

স্মরণ

আনিসুজ্জামান স্যার: স্মৃতিতে, মননে

আনিসুজ্জামান স্যার: স্মৃতিতে, মননে
জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তাঁর কর্মে, মননে, আদর্শে যথার্থই পূর্ণাঙ্গ অধ্যাপক হয়ে উঠেছিলেন৷ জাতীয় অধ্যাপক, আমাদের চেতনার বাতিঘর। বাঙালি মুসলিম মানসের প্রগতিচেতনায় উত্তরণের দীর্ঘ সংগ্রামের পথযাত্রায় মশাল হাতে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ পর্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভে ১৯৩৭ সালে জন্মেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলায়। দেশভাগের পর চলে আসেন প্রথমে খুলনায়, পরে ঢাকায়। মাত্র পনেরো বছর বয়সেই সক্রীয়ভাবে অংশ নেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে। তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৫৩ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। স্যার অবশ্য রসিকতা করে বলতেন, আমি গণিত ভালো বুঝতাম না বলে মানবিকে ভর্তি হয়েছিলাম। অর্থাৎ তিনি যা ভালোবাসতেন, জীবনে সেটাই দৃঢ়তা ও একাগ্রতার সঙ্গে করেছেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পরের বছর মানে ১৯৫৮ সালে বিভাগে 'ইংরেজ আমলের বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারায় ১৭৫৭-১৯১৮' বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা শুরু করেন। আনিসুজ্জামান স্যারই সম্ভবত তাঁর সময়ে সবচেয়ে কম বয়সে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এর মধ্যে ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৫ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'ঊনিশ শতকের বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস ; ইয়ং বেঙ্গল ও সমকাল' বিষয়ে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন।

আনিস স্যার আমার ক্লাসরুমের শিক্ষক ছিলেন না। কিন্তু তাঁকে পেয়েছিলাম জীবনের শিক্ষকরূপে। তাঁর শিষ্য হওয়ার গল্পটা আমার অন্যরকম। ২০১১ সালের জুলাই মাসের ২০ তারিখ। বিপ্লবী হেনা দাসের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজন করেছিল এক স্মরণসভা, যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন আনিস স্যার আর বক্তা হিসেবে আমি উপস্থিত ছিলাম। তখন আমি সবেমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। এতো বড় একজন দেশবরেণ্য মানুষের পাশে মঞ্চে বসে কথা বলার সৌভাগ্যে ভীষণ সংকোচ বোধ করছিলাম। তাঁর সঙ্গে আমার সেই প্রথম দেখা। আমার বক্তব্য শেষ হওয়ার পর স্যার আমাকে বললেন, খুব ভালো বলেছো। 'কী করছো তুমি?' বললাম, স্যার, আমি আপনার বিভাগেরই ছাত্রী। এ বছর ভর্তি হয়েছি। স্যার বললেন, 'আমি প্রতি বুধবার সকাল ১১ টায় বিভাগে যাই। তুমি এসো।'

বিভাগের একই করিডোরে আনিসুজ্জামান নামে দু'জন প্রফেসরের কক্ষ। একজন দর্শনের স্বনামধন্য অধ্যাপক। আরেকজন আমাদের ইমিরেটাস অধ্যাপক, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীরও শিক্ষক, জাতীয় ব্যক্তিত্ব। পরের বুধবার স্যারের কক্ষে হাজির হলাম। প্রথমদিনে অনেকক্ষণ গল্প হলো। টের পেলাম কথা বলায় তাঁর সূক্ষ্ম রসবোধ আর ভীষণ আন্তরিকতা। ভয় কেটে গেলো। সেদিন আড্ডায় কথা হলো বিদ্যাসাগর নিয়ে, বাঙালি মুসলিম সাহিত্য নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে। কী গভীর জ্ঞান, অথচ স্বল্প কথায় সহজ করে বলার প্রবণতা। আমার নাম শুনে বলেছিলেন, বিষাদ সিন্ধু থেকে উঠে আসা মেয়ে।

এর কিছুদিন পর একদিন দুপুরে আজিজ মার্কেটে পাঠক সমাবেশের দোকানে বই খুঁজছিলাম। হঠাৎ স্যার এলেন। আমাকে দেখে বললেন, 'তুমি আর এলে না যে? তোমার জন্য একটা বই রেখেছি। বুধবারে এসো।' ভীষণ অবাক হলাম। এমন একজন মানুষ এত সংক্ষিপ্ত পরিচয়ে আমাকে মনে রেখেছেন! বড় মানুষেরা বুঝি এমনই হয়! পরের বুধবারে আবার গেলাম। দেখি, সামনের টেবিলেই আমার জন্য বইটা রাখা। 'বিদ্যাসাগর-রচনাসংগ্রহ'। সম্পাদক ছিলেন তিনি এবং মুহম্মদ আবদুল হাই। সেই ছিল আমার প্রতি স্যারের প্রথম আশীর্বাদ।

এরপর মাঝে মাঝেই স্যারের সঙ্গে দেখা হতো, বিভিন্ন সভা, সেমিনারে স্যারের আলোচনা শুনতাম, কথা হতো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। যত জানতে থাকলাম তাঁর সম্পর্কে, মুগ্ধ হতে থাকলাম। তিনি শুধু বিভিন্ন অনুষ্ঠানেরই সভাপতি ছিলেন না, ছিলেন যেন গোটা বাংলাদেশেরই সভাপতি। অসাধারণ বক্তা ছিলেন তিনি। কথা বলায় ছিল তাঁর গভীর পরিমিতিবোধ। প্রজ্ঞা, ধীশক্তি, নিরপেক্ষতা, যেকোন গভীর বিষয়কেও সহজভাবে বিশ্লেষণের ক্ষমতা আর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব স্যারকে সবার শ্রদ্ধাভাজন করে তুলেছিল। কোন অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা দিলে অবশ্যই যেতেন। কখনো নির্ধারিত সময়ের এক মিনিটও দেরী হতো না। সাহিত্য, রাজনীতি, অসাম্প্রদায়িক বোধ, সংস্কৃতি চেতনা সমস্ত কিছুর প্রোজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক ছিলেন তিনি। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের সংবিধান রচনা সবকিছুতে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা থাকলেও নিজেকে কখনো প্রকাশ করতেন না। জ্ঞানের গভীরতায় তিনি ছিলেন শান্ত, নিরহংকারী। শিশুর মতো সারল্য ছিল তাঁর মুখে। এক রাবীন্দ্রিক সৌম্যভাব ফুটে থাকতো তাঁর জীবন আচারে। পোষাকের স্বকীয়তা থেকে শুরু করে চেতনে, মননে, আচরণে ছিলেন যেন এক ঋষী-বিদ্বান ব্যক্তিত্ব। জীবনে বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক - সব অর্জনই ছিল তাঁর। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছিলেন ডি লিট উপাধি। ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণে ভূষিত করে। গবেষক হিসেবে ছিলেন অতুলনীয়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মুসলমান সাহিত্যিকদের ভূমিকা, বাঙালির অস্তিত্ব সংগ্রাম ও প্রগতি চেতনাসহ বিভিন্ন বিষয়ের গবেষণায় ছিল তাঁর গভীর নিষ্ঠা। আহমদ শরীফ স্যার বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের মুসলমান সাহিত্যিকদের নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। আর আনিসুজ্জামান স্যার করেছিলেন আধুনিক যুগের মুসলিম সাহিত্য নিয়ে। সাহিত্যের ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ন্যারেশনের মাঝে তিনি বহুস্বরের দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেছেন। স্যার বিপ্লবী ছিলেন না, ছিলেন প্রতিবাদী, সংগ্রামী, প্রগতিশীল। বহু অনুষ্ঠানে তাঁকে যেতে হলেও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির ব্যাপারে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। আবার ভিন্ন আদর্শের আল মাহমুদকে নিজ ঔদার্যগুণে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন কবি হিসেবেই। ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চে ছুটে এসেছিলেন তিনি। লেখক, ব্লগারদের হত্যার প্রতিবাদে ২০১৫ সালে তিনি বলেছিলেন যে, মানুষকে ধর্ম মানার স্বাধীনতার পাশাপাশি ধর্ম না মানারও স্বাধীনতা দিতে হবে।

চেতনার সংগ্রামে পেয়েছি তাঁকে, পেয়েছি মননের সাধনায়। আমাদের কাছে বাংলা, বাঙালি, বাংলাদেশ আর তিনি ছিলেন অভিন্ন চেতনায় । 'বঙ্গবিদ্যা' সংগঠনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষা চর্চার গবেষণা ও প্রসারে তাঁর সঙ্গে কাজের সুযোগ পেয়েছিলাম। একদিন স্যারকে আমার কয়েকটা কবিতা পড়তে দিলাম। পড়ে জানালেন, তাঁর কাছে ভালো লেগেছে। বই বের করার পরামর্শ দিলেন। ২০১৫-র বইমেলায় 'বীরাঙ্গনাপুরাণ কিংবা দ্রোহের কঙ্কাল' বইটা বের হলো। বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে আমার সেই বইয়ের মোড়কও উন্মোচন করলেন তিনি। সেদিন ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। বইমেলায় প্রচণ্ড ভীড়। অবাক হলাম, এক নবীন লেখকের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করতে তিনি কতদূর থেকে এই ভীড়ের মধ্যে ছুটে এসেছেন। অসংখ্য গুণগ্রাহীর মাঝেও স্যার নিয়মিত আমার খোঁজ নিতেন। স্যার ছিলেন বটবৃক্ষের মতো, যাঁর ছায়াতলে অনেক মানুষের আশ্রয় মিলতো। স্যার ছিলেন গভীর অন্ধকারে আমদের জন্য নক্ষত্রের আলো, সংকটে আমরা দিশা খুঁজে পেতাম। স্যার ছিলেন এক অন্তহীন প্রাণ, আমরা তাতে জীবনের গন্ধ পেতাম।

তারপর একদিন বিভাগে আমার ফলাফল বের হলো। স্যারকে জানাতেই খুব খুশি হলেন তিনি। আমাকে কমনওয়েলথ স্কলারশিপের জন্য আবেদন করার পরামর্শ দিলেন। সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন। আমি তখন মনে মনে ঠিক করলাম, আবেদন করবো না। স্যারের কাছ থেকে কখনো ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সহযোগিতা নেবো না। আমার প্রয়োজন নয় ; বরং আমার প্রিয়জন আর শ্রদ্ধাভাজন হয়েই থাকুন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর ঢাকা ছাড়ার ফলে স্যারের সঙ্গে দেখা কম হতে লাগলো। আমার ৫১ তম সমাবর্তনে বক্তা ছিলেন স্যার। ধীরে ধীরে তাঁর শরীর খারাপ হতে থাকে। এরমাঝে একবার এই শরীরে তিনি বান্দরবান লামায় কোয়ান্টামে অনাথ শিশুদের স্কুলও ঘুরে এলেন। একদিন তাঁর কক্ষে গিয়ে দেখলাম, অনবরত কাশছেন। ঠিকমতো কথাও বলতে পারছেন না। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো। পর্বত ভালোবাসতেন তিনি। পর্বতারোহীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থেকে অনুপ্রেরণা দিতেন।

গত বছর মে মাসে বিএমটিসি ক্লাবের এক হিমালয়ান অভিযানে পতাকা প্রদান অনুষ্ঠানে স্যারের সঙ্গে দেখা হলো। সেই ছিল শেষ দেখা। এবার যখন দেশের বাইরে থেকে শুনলাম, স্যার অসুস্থ। উদ্বেগ বাড়লো। এমন পরিস্থিতিতে তাঁকে দেখে আসাও সম্ভব নয়। মাঝে যখন শুনলাম, তিনি কিছুটা সুস্থ, আশঙ্কামুক্ত। কিন্তু মৃত্যুর অনিবার্যতায় এক স্রোতহীন শূন্যতায় স্যার বিদায় নিলেন, শিয়রে যেখানে ওঠেনি কান্না, ঝরেনি অশ্রু। বৈশ্বিক মহামারীতে এভাবেই একাকী চলে যেতে হলো তাঁকে।

বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, বাংলা ভাষাচর্চা যতদিন থাকবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যতদিন থাকবে, বাংলা বিভাগ যতদিন থাকবে, ততোদিন আপনাকে মনে রাখতেই হবে।

লেখক: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
০৬ জুন, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন