বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২০, ২২ আষাঢ় ১৪২৭
৩০ °সে

গল্প

গোল মেকার

গোল মেকার
আজাদুর রহমানের 'গোল মেকার'

মাঠে সে-ই ছিল মহানায়ক। ফরওয়ার্ডে মতিন থাকা মানে নির্ঘাত গোল। তাকে ঠেকায় সাধ্য কার! বিপক্ষ দলের একটাই দুঃস্বপ্ন-মতিন। নিদেনপক্ষে তিন-চার জন চেক দিয়ে রাখত তাকে। হলে কী হবে? মতিন নিজেও ঠিক বুঝতে পারত না যে সেই মুহূর্তে কীভাবে সে কি করে বসত। ভাবলে অবাক লাগে! কোত্থেকে অন্য এক শক্তি এসে ভর করত ওর ওপর। পায়ের কারিশমা দেখে বিপক্ষদলের আর হুশ থাকত না। কী যে উত্তেজনা! পায়ে বল পেলেই হল। হাজার দর্শক একযোগে হৈহৈ দিয়ে উঠত। থানা থেকে একসময় জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়ল তার নাম। বাজির খেলা মানেই মতিনকে নিয়ে পাল্লাপাল্লি। তরতরিয়ে দাম উঠত। সাধারণ প্লেয়ারের দাম যদি হয় এক হাজার সে বাজারে মতিনের ডাক উঠত পাঁচ হাজার। সবাই তো আর গোল মেকার হতে পারে না! হায়ারে খেলে কত টাকা আর কত কাপ যে সে তুলে নিয়ে এসেছে তার ইয়াত্তা নাই।

ঝলমলে দিনের কথা ভেবে সুখ খুঁজে পেতে থাকেন মতিন সাহেব। কল্পনায় তিনি আরও পিছনে চলে যান। তারপর ফ্ল্যাসব্যাকে জেগে ওঠা ছবিগুলো পার হয়ে দৃশ্যের পর দৃশ্য অবগাহন করে চলেন তিনি। নিজের সঙ্গে এ এক আনন্দময় খেলা। ছায়াছবির ফিতেটা থামে না। চলতেই থাকে। লাগাতার দৃশ্যাবলির মধ্যে চলতে চলতে কখনওবা বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। আপনিতেই কল্পনার চোখ বাস্তবের চোখ হয়ে যায় যেন। মেডেলগুলো তিনি স্পষ্ট ছুঁয়ে দেখতে পান। ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কল্পলোকের কোন এক জনবহুল মাঠে খেলতে থাকেন। অনবদ্য খেলা। হাজার হাজার দর্শকের করতালির মধ্যে দিয়ে তিনিও হাহা করে হেসে ওঠেন। কখনও আবার লাফিয়েও উঠতে চান। মুখ দিয়ে ইয়াহু ইয়াগু শব্দের কিস্তি তোলেন। কিন্তু পুরো খেলাটা তিনি শেষ করতে পারেন না। সিরিয়ালগুলো পর পর ভেঙ্গে পড়তে থাকে। ছবিগুলো মিলেমিশে সিনেমার সাদা পর্দা হয়ে যায়। বাতাসে তখন হোসনেআরার গলা ভাসে- কী গো তোমার কী মাথা খারাপ হয়ে গেল? নিজে নিজে কী সব বকে যাচ্ছ..।

মতিন সাহেবের জগৎ-সংসারে এই এক নারী যে কিনা তাঁর পাগলামি বোঝে। তিনি জানেন দুনিয়ার সবাই তাকে পাগল বললেও হোসনেআরা তাকে কোনদিন পাগল বলবে না। নিজ মতলবে বকে যাওয়ার ব্যাপারটা এক-দুই করে এতদিনে আত্মীয় স্বজনরা জেনে ফেলেছে। প্রথমে অবশ্য কেউ তেমন পাত্তা দিত না কিন্তু এক ঘটনা বার বার ঘটলে আমল পেতে সময় লাগে না। এসব পরমাত্মীয়রা হোসনেআরার কানে যে সন্দেহ ঢালেনি, তা নয় বরং প্রতিবেশিদের চেয়ে তারাই বেশি মজা পেয়েছে। অন্যের কোন নেগাটিভ সাইড পেলে নিজেদের যেন মজার শেষ থাকে না। হোসনেআরা সাপটা ঝেড়ে দিয়েছে-‘উনি পাগল হবে কোন দুঃখে, যারা ওনারে পাগল ভাবে তারাই আসলে পাগল। ও রকম কথা তো একলা থাকলে আমিও গুনগুন করে বলি, তাই বলে আমি পাগল নাকি! মন ভালো থাকলে উনি নিজে নিজে কথা বলেন। এতে সমস্যা কী, অন্যলোকের সঙ্গে আজেবাজে কথা বলার চেয়ে নিজে নিজে কথা বলা খারাপ কী!’ হালে বেশি পানি না পেয়ে দূরে গিয়ে অগত্যা কালো মুখে সমালোচনা করেছে তারা।

ছাব্বিশ বছর ধরে মতিন সাহেবকে পড়তে পড়তে পুরোটাই মুখস্ত হয়ে গেছে। হোসনেআরার গলাটা তাই সহজ হয়ে গেল- তুমি রেডি হয়ে নাও। আজকের মধ্যে কেনাকাটা করতে না পারলে আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবে। কতদিন পর গ্রামে যাচ্ছি! সবাই তো কতকিছু আশা করে থাকে। তুমি লিস্ট করে রেডি হয়ে নাও। এই ফাঁকে আমি শাড়িটা পাল্টে নিই। লম্বা লাইনগুলো বলে সে আর দেরি করে না। চপল হরিণের মত ভিতরের ঘরে চলে যায়। মতিন সাহেবও পাল্টা কথায় যান না। তিনি ভাল করেই জানেন, তাকে শুধু রেডি হয়ে সাথে সাথে গেলেই চলবে। হোসনেআরা সবকিছু সামাল দিতে জানে। বিয়ের পর যুবকেরা যেমন হঠাৎ করে বোঝা কাঁধে নেয়। মতিন সাহেবের তেমন হয়নি। বিয়ে করে উল্টো ফ্রি হয়ে গেছেন তিনি। আজ তিন ছেলের কেউ তার কাছে নেই। হোসনেআরা ঠিকই হালটা ধরে বসে আছে। হোসনেআরা নামটা আগে তেমন চালু ছিল না। ডাক নাম জবা বলে মতিন আদর করে জুবা বলে ডাকত। হোসনেআরাও কম ছিল না। সেও মতিনকে আহলাদ করে মানু ডাকত। বড়ই রঙীণ আর স্বপ্নমাখা দিন ছিল তখন। মেয়ে মহলে মতিনের তখন বিরাট চাহিদা। যেমন খেলোয়াড় তেমন হ্যান্ডসাম। বহু মেয়েই তার জন্য পথ চেয়ে ছিল। তিন চার জন ছাড়া বাকীদের তেমন একটা পাত্তাই দেয়নি মতিন। পরে কারো সঙ্গেই সম্পর্ক টিকেনি। কিন্তু হোসনেআরার ব্যাপারটা ছিল আলাদা। সে দম ধরে লেগে ছিল মতিনের সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত যা হবার তাই হল। বিয়ে করাটাকে মতিন সাহেব ঠিক ভুল ভাবেন না। কিন্তু ভুল যেটা হয়েছিল সেটা হল লেখাপড়াটা তিনি করতে পারেননি। একেবারে খারাপ ছাত্র ছিলেন না। কিন্তু খেলা তাকে এমনভাবে টেনে নিয়েছিল যে, ‘লেখাপড়া করে কী হবে’-এই ধারণাটাই শেষ পর্যন্ত টিকে গিয়েছিল। খেলার চেয়ে বড় কিছু আর হয় না। যে সময় মতিনকে নিয়ে এলাকার মানুষের জয় জয়কার সেসময় আজকে যারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাদের কারো কোন নাম-গন্ধও ছিল না। মতিন ঠিক আন্দাজ করতে পারেনি। দিনকে দিন জুনিয়র ছেলেপেলে খেলায় নামতে লাগল আর ওদিকে মতিনেরও দম ফুরোতে শুরু করল। তখন টের পেল কত মস্ত ভুল করে ফেলেছে সে। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। হোসনেআরা গর্ভবতী। বিছানাগত বাবার আজ যাই, কাল যাই অবস্থা। ক্রমেই দেশে ক্রিকেটের ক্রেজ ঢেকে দিতে লাগল ফুটবলকে। মতিনের নামটাও আগের মত জ্বলজ্বলে হয়ে থাকল না আর। আস্তে আস্তে ধুলো ময়লা জমে মতিন যেন পুরনো ডাকটিকিটের মত অস্পষ্ট হয়ে গেল। ফর্ম কোন মতেই আর খুঁজে পেল না সে। চুড়া থেকে যখন কোন মানুষ নামতে শুরু করে তার যে কত বেদনা হয় তা মতিনের চেয়ে আর কে ভালো বুঝবে। যারা এক সময় তাকে নিজেদের বলে গর্ব করত তারাও তখন অন্যকোন খেলোয়াড়ের কাছে গিয়ে নতুন করে আরেক মতিনকে খুঁজে পেল। কালের দূরবীনে দেখা পুরনো মতিন যেন দুর থেকে আরো দুরে যেতে লাগল। সবকিছু হারিয়ে সে পরিস্কার বুঝতে পারল যে, খেলাধুলা, সঙ্গীত কিংবা বাঁশি বাজানোর মত নান্দনিক ব্যাপারগুলো দর্শকশ্রোতা ততদিনই খায় যতদিন তাতে ধার থাকে। মানুষের রুচি পাল্টে গেলেই খেলোয়াড়ের কোন দাম থাকে না।

শুধু খেলা-খেলা করতে গিয়ে কোন কিছুই হয়নি মতিয়ারের। যারা একদিন এক বেঞ্চে বসে মতিনের খাতা দেখে লিখত তারাও কেউ কেউ সরকারি চাকুরে নয়ত ব্যাংকের ক্যাশিয়ার পর্যন্ত হয়ে গেছে। আর শেষ পর্যন্ত চেয়ে চিন্তে মতিন যা পেয়েছিল তা হল সুগার মিলের ট্রলির হেল্পার। তবুও বাপের ভাগ্যি যে, জিএম সাহেব তাকে বিশেষ ভালোবাসতেন। একবার মিলের হয়ে খেলতে গিয়ে দল জিতিয়ে আনাতে জিএম সাহেব যার পর নাই খুশি হয়েছিলেন। অতবড় অফিসার হলেও লোকটা দিলদরিয়া ছিল। ওরকম জাহাবাজ আমুদে লোক মতিন এর আগে একজনকেও দেখেনি। মাঠে নিজেই নেমে যেতেন তারপর পোলাপানের মত বিপক্ষদলের সঙ্গে মারামারিতে যোগ দিতেন। মনে আছে হাফ টাইমে মারামারি বাঁধলে জিএম সাহেব উত্তেজনায় বিপক্ষ দলকে কিল ঘুষি লাথি বসাতে শুরু করেছিলেন। যাহোক সেই বেলায়েত সাহেবের কারণেই আজ তিনি হেল্পার থেকে ফোরম্যান পর্যন্ত যেতে পেরেছেন।

চাকরি পাবার পর তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন যে তার ছেলেরা আর যাই হোক অন্ততঃ ফুটবল খেলবে না। মন দিয়ে শুধুই পড়াশুনা করবে। তারপর বেলায়েত সাহেবের মত বড় বড় অফিসার হবে। কিন্তু রক্ত বলে কথা! প্রাইমারি স্কুলে যাবার পর থেকেই ওরা বল ছাড়া কিছু বোঝে না। শেষ পর্যন্ত কাউকেই ঠিক বাগে আনতে পারেননি তিনি। বড় ছেলে অমতে এক মেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়ে কোট ম্যারেজ করল। মেয়ে বড় ব্যবসায়ীর একমাত্র কন্যা। আর যায় কোথায়! হামলা মামলা মাথায় নিয়ে গত দ্-ুতিন মাস বউ হাতে করে কাকের মত আজ ওখানে কাল সেখানে বন্ধুদের বাড়ি করে বেড়াল সে। এখন স্টেশনের পাশে গেট দোকান দিয়ে বসেছে। পানবিড়ি কসমেটিক ইত্যাদি বেচা বিক্রি করে মোটামুটি খারাপ চলে না। ছোট ছেলে সামান্য পড়াশুনা করেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এখন কিছুই করে না। তবে সে নেশা করে। একবার পুড়িয়াসহ ধরা পড়ে কিছুদিন হাজতেও ছিল। মতিন সাহেব শাসন কম করেন নি। এমনও হয়েছে যে মারতে মারতে গায়ে দাগা দাগা পর্যন্ত করে দিয়েছেন। কিন্তু ছেলেরাও তো একসময় সিয়ানা হয়ে যায়। তার উপর একই ট্রিটমেন্ট বার বার করতে গেলে ইঁচড়েপাকা হয়ে একসময় ভোতা আর গাণ্ডুমার্কা হয়ে যায়। কেবল মেজোটা খানিক ওর মায়ের মত হয়েছিল। শান্ত আর ধৈর্য্যশীল। মেট্রিক ফেল করার পর কি মনে করে সাইকেলের মেকারি শিখেছে। এখন ওই দিয়ে ভালই রোজগার করে। বাবা মাকে ভুলে গেছে। বউ নিয়ে বন্দরে বাসা ভাড়া করে থাকে। শ্বশুড় তাকে দিনকে দিন গুছিয়ে তুলছে।

তিন ছেলে মিলে মতিন সাহবের সমস্ত স্বপ্নকে তছনছ করে দিয়েছে। অগত্যা তিতে মন নিয়ে একা একা বাড়িতেই বন্দি হয়ে থাকেন তিনি। কিন্তু হোসনেআরার কোন পরিবর্তন নেই। বয়সটাই কেবল বেড়েছে। তার মনেও গভীর দুঃখ আছে, কিন্তু মনের দুঃখ কখনও মুখ পর্যন্ত উঠে আসে না। আজ পর্যন্ত সে বাপের বাড়িতে গিয়ে একরাত পর্যন্ত থাকেনি। মতিন সাহেব অনেক ঠেলাঠেলি করেছেন কিন্তু হোসনেআরাকে নড়াতে পারেননি। ঝগড়াঝাটি যে একেবারে হয়নি তা নয়। বিয়ের পরের বছর খুব হত। মান অভিমানের উঠানামায় কোন কোন রাতে অস্থির হয়ে যেত মতিন। তারপর আস্তে আস্তে দুজনেই যে যার মত থেমে গেছে তারা। এখন শরীরে যৌবনের উথালাপাতাল ঢেউ নেই, কিন্তু তারা দুজনেই জেনে গেছে একজন ছাড়া অন্যজনের কোন অস্তিত্ব নেই। সংসার নৌকায় মতিন নামে মাত্র হালদার, মূলত হাল ধরে থাকে হোসনেআরা। আজ যদি সে মতিন সাহেবের মত খেয়ালি হত তাহলে সংসারে যে আলোটুকু নিভু নিভু করে জ্বলছে তাও নিভে যেত। চারদিকে অন্ধকার নেমে আসত। হাবিজাবি ভাবনাগুলো মাথায় নিয়ে মতিন সাহেব উঠে যেতে চাইলেন কিন্তু তার আগেই হোসনেআরা ঘরে ঢুকল-কই তুমি তো দেখছি কিছুই করনি। চল ওঠো ওঠো। মতিন সাহেব হোসনেআরার দিকে একমনে তাকিয়ে থাকেন। ঘোর চোখে চেয়েই থাকেন। হোসনেআরা কি জানে আজ অন্যরকম সুন্দর লাগছে তাকে। হোসনেআরা কিছু বুঝতে পারে না। এবার সে হাত ধরে ঝাঁকুনি দেয়-কী হল, যাও রেডি হয়ে নাও। মতিন সাহেব হাত ইশারায় কাছে ডাকেন। তারপর হাতে হাত রাখেন-আজ আর মার্কেটে না যাই। তার চেয়ে চল আমতলায় যাই।

-আমতলায় মানে?

-আমতলায়, আমাদের আমতলায়, তোমার মনে নেই!

মতিন সাহেব উত্তরের অপেক্ষা করেন না। কথা চালিয়ে যান-মনে আছে? যখন তোমার কলেজ ছুটি হত আমি তো সাইকেল রেখে আমতলাতেই অপেক্ষা করতাম। কতদিনের কত জমানো কথা জমা পড়ে আছে আমতলায়। তোমার মনে নেই?

হোসনেআরা মুখ খোলে না বরং তার ভারি মুখটা অনেকদিন পর তরুণিদের মত লাল হয়ে যায়। মতিন সাহেব হাতটাকে আরও চেপে ধরেন। তারপর কানের কাছে ঠোঁট নামিয়ে গলা নিচু করেন-তুমি আছ বলেই তো আজও আমি কল্পনায় ফুটবল খেলে চলেছি। একমাত্র তুমি ছাড়া সকলেই আমাকে পাগল ভাবে। তুমি ছাড়া আমার কে আছে বলো...। বুক থেকে উঠে আসা আবেগটা পুরো তুলে আনতে পারেন না তিনি। তার আগেই তার গলাটা ভেজা ভেজা হয়ে জড়িয়ে যায়। হোসনেআরা কিছু একটা বলতে গিয়েও বলে না, কেবল ডান হাতটা টেনে এনে মতিন সাহেবের হাতের উপর জড়ো করে রাখে। তারপর এক ধরনের গুমোট নিরবতা নিয়ে বসে থাকে তারা। কিন্তু কতক্ষণ! হোসনেআরাই মুখ খোলে-মানু এবার চল, ওঠো মার্কেটে যেতে হবে।

ইত্তেফাক/আরএ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত