বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২০, ২২ আষাঢ় ১৪২৭
৩১ °সে

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের কবিতার ভাষা

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের কবিতার ভাষা
কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল।

হারানো হস্তশিল্পের মতো বিলুপ্ত হতে হচ্ছে আমাদের গৌরব! অনেক আগেই বিলুপ্ত বাউলের এই আক্ষেপ নিয়ে দুঃসময়ের হাহাকার শুনিয়েছিলেন কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল। সত্তর দশকের শেষপাদে তিনি তাঁর উজ্জ্বল আবির্ভাবকে নিশ্চিত করেছিলেন। ঐতিহ্যসন্ধানী এই কবি তাঁর সময় থেকেই চলমান। কবির এই চলমানতাই তাঁকে একটা অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়। তিনি এমনই এক কবি, যিনি নিজেকে কোনো দশকের আবর্তে আটকিয়ে না রেখে,সমকালে সমান সক্রিয় কবিতাচর্চায়।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জাতীয় জীবনের অস্থিরতা, মধ্যবিত্ত জীবনের ভাঙন, অসহায় ও আতঙ্কগ্রস্ত সমাজ সাইফুল্লাহ মাহমুদকে আক্রান্ত করলেও, তাঁর সময়ের শ্লোগানমুখরতা সত্তর দশকে ব্যক্তি মানসের যে বিপর্যয়, অনিশ্চিত যাত্রা তা তাঁর কবিতায় নেই। তাঁর সময়ের আত্মমুখিনতা থেকে তিনি সযত্নে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তবে সময়ের আবেগ ও যন্ত্রণার তীব্রতা, বিপন্নতা, স্বপ্নভঙ্গের হাহাকার সদর্থক ও প্রতিবাদী চেতনায় প্রতিভাত হয়েছে তাঁর কবিতায়। তিনি কবিতায় শুদ্ধ শিল্পময়তার চর্চায় বিশ্বাসী।

হার্বাট রিড বলেছেন, ‘শিল্পী ও তাঁর সমাজের মধ্যে নিহিত গভীর আন্তঃসম্পর্ককে অস্বীকার করা যায় না’। কবি সমাজেরই মানুষ। সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের কবিতায় আমাদের সমাজ, দেশ, ভাষা-সংস্কৃতি তাই প্রবলভাবে সংক্রমিত। 'বিপ্লব নেই, বাগান নেই, ফুল নেই, পাখি নেই, শুধু ভুলভ্রান্তি, শুধু ভাঙন, শুধু বিভাজন’--এহেন পরিস্থিতিতে তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত এক সত্যসন্ধানী কবি। মহান মুক্তিযুদ্ধ, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশ তাঁর কবিতার অনিবার্য অনুষঙ্গ। একই সঙ্গে স্বাদেশিক ও বৈশ্বিক চেতনা তাঁর কবিতায় প্রকটিত। জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রবাসে বসবাস করেও তিনি মুক্তির আলোয় উদ্ভাসিত তাঁর স্বদেশকে তুলে ধরেন বিশ্বের কাছে। জীবন সংলগ্নতায় সমৃদ্ধ স্বদেশ, প্রকৃতি আর বিশ্ববোধের এক নান্দনিক আবহে আবর্তিত তাঁর কবিতা।

'তৃষ্ণার্ত জলপরী' ( ১৯৮২) থেকে শুরু করে, 'তিন মিনিটের কবিতা' (২০২০) পর্যন্ত উনত্রিশটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের। প্রতিটি কাব্যগ্রন্থ বা তাঁর এনথোলজিতে (তিনি তাঁর কবিতাকে এনথোলজি হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত) ভিন্নভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন। নিজেকে বিষয় ও বৈচিত্র্যে অতিক্রম করেছেন বারবার। এখানেই একজন কবির শক্তিময়তা ও কুশলতার পরিচয় বিধৃত হয়।

তিনি এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর কবিতায় ব্যাপক পরীক্ষ-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। উত্তরাধুনিকতা নিয়ে যখন তাঁর চারপাশ উন্মাতাল, তখন তিনি লিখেছেন দক্ষিণাধুনিক কবিতা, ব্যাঙ্গার্থে ক্লিব কবিতা। যে কবিতার কখনও অনুবাদ হয় না। তিনি উচ্চারণ করেন, ‘নিজের কংকাল নিয়ে ভাষাহীন দক্ষিণাধুনিক ক্লিব কবিতা লিখি’। তাঁর এই কবিতাচিন্তাকে আমরা এন্টি পোয়েট্রি, ননসেন্স পোয়েট্রি যাই-ই বলি না কেন, এটা তাঁর প্রতিবাদ। এ প্রতিবাদটি হলো কবিতায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অস্তিত্বহীন, মৃতকবিতার বিরূদ্ধে; আরোপিত অকবিতার বিরুদ্ধে। তাঁর সময়ে 'নিজের কংকাল' নিয়ে কবিতা লেখার দুঃসাহস একমাত্র তাঁর ভেতরেই প্রত্যক্ষ করি। নিজের কংকাল মানেই তো তাঁর স্বদেশ, সমাজের অসারতা, নেতিবোধ।

কবিতা আলোচনা একটি দুরূহ কর্ম। আসলেই কবিতার কোনো আলোচনা হয় না। কবিতা নিজেই একটি আয়না। যে আয়নায় সে নিজই প্রতিবিম্বিত হয়। আর যেখানে 'কবিতাই কবিতা', সেখানে আলোচনার গুরুত্ব কতখানি! লিওনার্দো কোহেন বলেছেন, ‘জীবনের নিদর্শন হলো কবিতা। কবির জীবন যদিও জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়, তাহলে কবিতাকে বলবো শুধুই ভস্ম’। আমার মনে হয়েছে এই ভস্মের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে কবিতার অপার রহস্য। রহস্যকে উন্মোচন করা সহজসাধ্য নয়। আমি চেষ্টা করবো একজন অনুসন্ধিৎসু পাঠকের দৃষ্টিকোণ থেকে সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের ‘তিন মিনিটের কবিতা’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া জানানোর। এটা কোনোক্রমেই কোনো সমালোচকের সমালোচনা নয়, আলোচকের তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, আমার সাধারণ পাঠপ্রতিক্রিয়া মাত্র।

সব কবিতা সব পাঠকের জন্য নয়। আর এ কারণেই দুলালের কোনো কোনো কবিতা জটিল মনে হয় পাঠকের কাছে। প্রশ্ন উঠতে পারে,কবিতা যদি মানব মনের বিশেষ বিশেষ অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হয়, তবে কবিতা জটিল কেন? এই দায় বোধ ও মননের,সমাজ ও সময়ের। পাঠককেও আধুনিক কবিতা পাঠের জন্য তৈরি হতে হয়, দীক্ষা নিতে হয়।

আমি কোনো তাত্ত্বিক দৃষ্টকোণ থেকে সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের কবিতা ব্যাখা করছি না। তবে আমার মনে হয়েছে তিনি ইমেজিস্ট। কবিতায় যখন তিনি আমাদের চারপাশের অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনের ভাষা ব্যবহার করেন, পঞ্চোন্দ্রিয়ের অনুভূতি ছড়িয়ে দিয়ে কবিতায় একটি চিত্র এঁকে দেন, তখন তিনি আমার চোখে ইমেজিস্ট হয়ে ওঠেন। কখনও ফ্রয়েডিয় চেতনায় অবচেতন মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে দেখি। জানি না, তিনি এজরা পাউন্ডের ইমেজিস্ট ধারাকে কতখানি আত্মস্থ করেছেন! অথবা তিনি কতখানি ফ্রয়েডিয় চেতনায় নিয়ন্ত্রিত! কেননা তাঁর কবিতা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, যাকে নিজস্বতায় 'দুলালীয়' বলে চিহ্নিত করা যায়।

তাঁর কবিতায় রূপকল্প, চিত্রকল্পের সমাহারে সমৃদ্ধ। কোনো গৎবাঁধা ছন্দে তিনি তাঁর কবিতাকে ফ্রেমবন্দি করেননি। তবে আমাদের বাংলা কবিতার প্রধান প্রবণতা অক্ষরবৃত্তিয় আবহের বন্ধন, সেটা থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত নন। উপমা, উৎপ্রেক্ষার যথাযথ ব্যবহার করলেও খুব বেশি অলঙ্কারে ভারি করে তোলেন নি। কবিতাকে শব্দ ব্যবহারে তাঁর সমকাল মনস্কতা নিবিড় পাঠককে সচকিত করবেই। কোনো আভিধানিক শব্দ নেই, যে সব শব্দ নিয়ে কবিতার শরীর গড়ে উঠেছে, সে সব এই বিজ্ঞানমনস্ক সমাজের, এই জটিল সময়ের, এই যান্ত্রিক বিশ্বের। কবিতায় ব্যবহৃত ইংরেজি শব্দগুলোও যেন আমাদের কত চেনা! দুলালের কবিতায় তৎসম শব্দের বাহুল্য নেই। কোনো প্রাচীনতম শব্দ, শব্দের আদি শব্দ তিনি সাধারণত ব্যবহার করেন না। অথচ শূন্য দশকেরও কোনো কোনো কবির কবিতায় আদি শব্দের ব্যবহার, তৎসম শব্দের বাহুল্য, জটিল শব্দ, বাক্যের ব্যবহার দেখে বিস্মিত হই। শব্দ ব্যবহারের কুশলতাই প্রমাণ করে সেই কবি কতখানি আধুনিক বা উত্তরাধুনিক।

ইত্তেফাক/আরএ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত