বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
৩৪ °সে

হারুকি মুরাকামির গল্প

অ্যা উইন্ডো

হারুকি মুরাকামির গল্প
ছবি: সংগৃহীত

রিয়তমেষু,

শীত চলে গেল, না?

সূর্যের আলো কেমন উপচে পড়ছে! বসন্ত এল বলে। তুমি নিশ্চয়ই ভালো আছ?

তোমার শেষ চিঠিটা পড়ে আমার খুব ভালো লেগেছে, জানো? ঐ যে, যেটাতে হ্যামবার্গারের কথা লিখেছিলে। মসলার গুঁড়ো, জায়ফল, আর সস মিশিয়ে কী চমৎকার করে তুমি স্টেক বানিয়েছ। আমার জিভে যেন স্বাদটা টের পাচ্ছিলাম। ছোট ছোট নিখুঁত বর্ণনা তুমি দিয়েছ। আমি যেন দেখতে পাচ্ছিলাম, ছুরি দিয়ে কী নিখুঁতভাবে তুমি কুচি কুচি করে পেঁয়াজ কাটছ। তোমার রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা তাজা খাবারের গন্ধ পর্যন্ত পাচ্ছিলাম।

ধুর ছাই, তোমার চিঠিটা পড়া আমার উচিত হয়নি। ওটা পড়তে পড়তে আমার খুব হ্যামবার্গার খেতে ইচ্ছে হলো। সেই ইচ্ছেটা এত তীব্র ছিল যে, সে রাতেই আমি একটা রেস্টুরেন্টে গেলাম। খুব বেশি দূরে না। বাসার কাছেই।

তুমি জানো, ঐ রেস্টুরেন্টে না আট প্রকারের হ্যামবার্গার স্টেক ছিল! ওগুলোর গালভরা নাম দিয়েছিল ওরা। টেক্সাস স্টাইল, হাওয়াইয়ান স্টাইল, জাপানিজ এবং এ ধরনের আরো পাঁচ প্রকার হ্যামবার্গার। এর মধ্যে আকারে যেটা সবচেয়ে বড়ো, সেটা হচ্ছে টেক্সাস হ্যাম। ধরো, কোনো টেক্সাসের লোক পৃথিবী ঘুরে দেখতে বেরিয়েছে। ঘুরতে ঘুরতে জাপান চলে এল এবং দুর্ভাগ্যক্রমে ঐ রেস্টুরেন্টে খেতে বসল। সে টেক্সাস হ্যামবার্গারের দানবীয় আকার দেখে মূর্ছা যেতে পারে।

হাওয়াইয়ান স্টাইল যেটা, সেটা আরো বিচিত্র। ভেতরে আনারসের কুচি। ভাবতে পারো? অদ্ভুত, না? ক্যালিফোর্নিয়া স্টাইল… না এটা ভালো করে মনে নেই। জাপানিজ স্টাইলটা মনে আছে, কিন্তু মনে না থাকলেও তেমন ক্ষতি বৃদ্ধি ছিল না। রেস্টুরেন্টটা খুব সুন্দরভাবে সাজানো, পরিপাটি, ভেতরের দেয়ালগুলোতে পেইন্টিং, নিচু ভলিউমে মিউজিক বাজছিল। খাবার সার্ভ করছিল সুন্দর সুন্দর মেয়েরা। একটাও অসুন্দর মেয়ে খুঁজে পেলাম না। তাদের ইউনিফর্মের জবাব নেই! রেস্টুরেন্টের মালিকের বোধহয়, কাপড়চোপড়ে বেশ অনীহা। স্কার্টগুলো এমনভাবে তৈরি, যেন ওয়েট্রেসদের ফর্সা ঊরু তীব্রভাবে আকর্ষণ করে কাস্টমারকে।

উন্মুক্ত ফর্সা পা দেখতে আমি ওখানে যাইনি। গিয়েছিলাম, হ্যামবার্গার স্টেক খেতে। টেক্সাস বা হাওয়াইয়ান বা অন্য কোনো নামের ভারে ভারী হ্যামবার্গার না। আমার চাওয়া খুব সাধারণ ছিল। একটা সাদামাটা হ্যামবার্গার স্টেক, তোমার রান্নাঘরে যেমনটা তুমি বানাও।

সুন্দরী ওয়েট্রেসকে আমার চাহিদাটা বললাম।

তারচেয়েও সুন্দরভাবে সে জবাব দিল, ‘স্যার, আমি সত্যিই দুঃখিত, আপনি যেমনটা চাচ্ছেন, ঠিক সেরকম স্টেক আমাদের এখানে নেই। আমাদের এখানে এই আট ধরনের স্টেক আছে। আপনার এর মধ্যে যেকোনো একটাকে বেছে নিতে হবে।’

এরপর মেজাজটা কেমন হয়, একটু কল্পনা কর। মনে মনে গালিগালাজ করলাম কিছুক্ষণ। তারপর মনে হলো, কেন গালি দিচ্ছি? ওয়েটারকে দোষ দিয়ে তো লাভ নেই। খাবারের মেনুটা কীরকম হবে বা হ্যামবার্গার স্টেক কীভাবে তৈরি হবে সেটা নিশ্চয়ই তার সিদ্ধান্ত নয়। ঊরু প্রদর্শন করা পোশাকটাও সে নিজে ডিজাইন করেনি। সে একজন অতি সাধারণ কর্মচারী। নিতান্ত বাধ্য হয়ে মুখে একটু হাসি ফোটালাম। তারপর হাওয়াইয়ান হ্যামবার্গার স্টেক অর্ডার করলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই আবিষ্কার করলাম, একটু চেষ্টা করলেই এটাকে একটা সাধারণ স্টেকে পরিণত করা যাবে। এর জন্য তোমাকে বিশেষ কষ্ট করতে হবে না। শুধু আনারসের কুচিগুলোকে প্লেটের একদিকে সরিয়ে রাখলেই হবে।

দুনিয়াটা কত বিচিত্র, বল? আমি এই পৃথিবীর কাছে বিশেষ কিছু চাইনি। শুধু চেয়েছি, একটা অতি সাধারণ হ্যামবার্গার স্টেক- যেটা দেখতে বিদঘুটে হবে না, যেটার মধ্যে আনারস থাকবে না। তোমার চিঠিতে তুমি যেরকম লিখেছ, ঠিক সেরকম। অনেক প্রশংসা হয়ে গেল। আকাশে উড়ছ নিশ্চয়ই। এবার একটু ভুল ধরি তোমার। প্রস্তুত হও।

তোমাদের বাসার পাশে যে রেলস্টেশন, ওটার কথা লিখেছ। স্বয়ংক্রিয় টিকিট ব্যবস্থা চালু করেছে ওরা। এই ব্যবস্থায় তোমার যে সমস্যা হয়েছে, সেটা তুমি খুব সুন্দর করে লিখেছ। কিন্তু জানো তো, পাঠক যখন কোনো লেখা পড়ে, সেই লেখাটা চোখের সামনে দেখতে চায়। অনেকটা দৃশ্যকল্পের মতো। তুমি যখন লিখবে, সে দৃশ্যটা চোখের সামনে দেখতে পাবে। এই জায়গাটায় তোমাকে উন্নতি করতে হবে।

এবার তোমার নতুন চিঠিটার একটা মার্কিং করে ফেলি। তোমাকে সত্তর দেওয়া যেতে পারে একশ’র মধ্যে। ধীরে ধীরে তোমার লেখার উন্নতি হচ্ছে। আরো উন্নতি হবে। শুধু ধৈর্যটা হারিও না।চেষ্টা চালিয়ে যেও।

আমি কি তোমাকে বলেছি, আমি তোমার চিঠির অপেক্ষা করি? না বলে থাকলে এই বেলায়, বলে দিলাম। এখন আবার আকাশে উড়তে শুরু কোরো না যেন! তোমার পরবর্তী চিঠির অপেক্ষায় রইলাম।

বসন্ত আসছে ক’দিন পর, সাথে তোমার নতুন চিঠি। আহা!

পুনশ্চ: তুমি যে চকলেটগুলো পাঠিয়েছ, সেগুলো ভীষণ মজার। আমি খেয়ে শেষ করে ফেলেছি। একা খেয়েছি। কাউকে দেইনি। কিন্তু, একটা কথা কী জানো? তুমি বোধহয়, এবার আমার চাকরিটা খাবে। আমাদের এখানে ভীষণ কঠিন নিয়ম। শুধু চিঠি চালাচালি করা যাবে। অন্য কিছু না। না মন, না চকলেট। সুতরাং, তুমি যে আমাকে ভালোবেসে বিভিন্ন জিনিস পাঠাচ্ছ- এটা আর পাঠিয়ো না। একটু নির্দয় হও আমার প্রতি।

রাগ করলে? প্লিজ, রাগ কোরো না।

খুব অদ্ভুত শোনাবে।

তাও, আপনাদের সত্যটা বলি। চিঠি লেখাটা আমার পেশা। গত এক বছর ধরে আমি এই চিঠি লেখার চাকরিটা করছি। বাইশ বছরের এক তরুণের জন্য এটা খুবই অদ্ভুত পেশা, না?

প্রতিমাসে আমাকে ত্রিশটার মতো চিঠি লিখতে হয়। প্রতিটা চিঠির জন্য দুই হাজার ইয়েন করে পাই। আমাকে যারা চাকরি দিয়েছে, তাদের একটা গালভরা নাম আছে- ‘দ্যা পেন সোসাইটি’। পেন ফ্রেন্ড বা কলমবন্ধু এই জিনিসগুলো তো আপনারা পত্রিকার পাতায় দেখেছেন, দেখেননি? সেরকম একটা ব্যাপার। বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কার করছি আপনাদের কাছে।

‘পেনফ্রেন্ড সোসাইটি’ পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছিল।

‘আপনার লেখা চিঠিটাও হয়ে উঠতে পারে আশ্চর্য রকমের চিত্তাকর্ষক’... এটা ছিল বিজ্ঞাপনের ট্যাগ লাইন।

বিজ্ঞাপনটা দেখে অনেকে যোগাযোগ করত। তারা কিছু টাকা জমা দিত। এটা ছিল তাদের ফি। বিনিময়ে আমাদের কোম্পানি তাদের জন্য একজন করে চিঠি লেখার শিক্ষক নিয়োগ করত। প্রতি সদস্যকে মাসে চারটা করে চিঠি লিখতে হতো তাদের শিক্ষককে। শিক্ষকরাও প্রতিটা চিঠির উত্তর দিত। ওপরে যে চিঠিটা আমি আপনাদের পড়ে শোনালাম, সেটা ছিল এমনই একটা চিঠির উত্তর। আমাদেরকে ভুলভ্রান্তি ধরিয়ে দিতে হতো, যেন আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের লেখার ক্ষমতার উন্নতি হয়।

আমাদের কলেজের সাহিত্য বিভাগে একটা চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখে আমি ওদের সাথে যোগাযোগ করি। সে সময়ে আমার খুব বাজে অবস্থা। টাকা পয়সার বেশ টান ছিল। বাড়ি থেকে বাবা-মা বলে দিয়েছে, ‘যথেষ্ট বড়ো হয়েছ বাছা। এবার নিজেরটা করে খাও।’

জীবনে প্রথমবারের মতো আমাকে কাজ খুঁজতে হলো। বেঁচে থাকার জন্য কাজ। চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখে দেরি করলাম না। ওদের সাথে যোগাযোগ করলাম। ইন্টারভিউয়ের ডেট পড়ল। ভালোভাবে পাশ করে গেলাম।

এরপর ট্রেনিং দেবার পালা। আমাকে শেখানো হলো, আমার ছাত্রীদের লেখা চিঠিগুলো আমাকে কীভাবে সংশোধন করতে হবে। কীভাবে ওদের লেখার ক্ষমতা বাড়াতে হবে। খুব একটা জটিল বিষয় ছিল না।

‘ছাত্রীদের’- বলছি এ কারণে যে, শিক্ষক নিয়োগ দেবার ব্যাপারে একটা নিয়ম ছিল আমাদের কোম্পানির। ছেলেদের জন্য নিয়োগ দেওয়া হতো মেয়ে শিক্ষক। আর মেয়েদের জন্য ছেলে। আমার মোট চব্বিশ জন ছাত্রী ছিল। চৌদ্দ থেকে তেপ্পান্ন ছিল তাদের বয়স। বেশির ভাগেরই বয়স পঁচিশের বেশি। ওরা আমার থেকে বেশি বয়সী ছিল।

প্রথম মাসে, আমি বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। ভয় পাবার যুক্তিসঙ্গত কিছু কারণ আমার ছিল। প্রথমত, মেয়েরা ভালো লেখে। তারা ছোটবেলা থেকেই চিঠি লেখে। সুতরাং, তাদের লেখালেখির ক্ষমতা আমার থেকে ভালো হবার কথা। আমি জীবনে একটা চিঠি লিখেছি- এরকম আমার মনে পড়ে না। বেশ ভয়ে ভয়ে পার করলাম প্রথম মাসটা। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি কেউ আমার নামে অভিযোগ করবে। তাদের শিক্ষক পরিবর্তন করতে বলবে।

অবাক করা ব্যাপার, মাসটা দিব্যি কেটে গেল। কেউ কোনো অভিযোগ করল না। শুধু এটুকুই না, আমার বস একদিন আমাকে তার রুমে ডেকে বেশ প্রশংসা করলেন। উচ্চ প্রশংসা যাকে বলে! আমি নাকি আমার ছাত্রীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। আমার ঠিক বিশ্বাস হলো না। মনে হলো, আমাকে উৎসাহ দেবার জন্য বস এরকম বলছে।

কিন্তু, আরো দুটো মাস কেটে গেল। আমার নামে কোনো অভিযোগ এল না।

তখন ঠিক মাথায় খেলেনি, কিন্তু এখন বুঝি, আমাকে চিঠি লিখত যেসব মহিলা, তারা ছিল নিঃসঙ্গ, ভয়ংকর রকমের একা। তারা লিখতে চাইত। কিছু বলতে চাইত। নিজেদের কথাগুলো বলবার জন্য তারা অস্থির হয়ে ছিল। কিন্তু কাকে বলবে? সেই মানুষটা তাদের ছিল না। তাই, তারা বেছে নিয়েছিল এই খেলা- চিঠি লেখালেখি শেখা। আসলে চিঠি লেখার ছলে তারা নিজেদের প্রকাশ করত।

অবধারিতভাবে আমার বাইশ বছর বয়সটা ভরে গেল হৃদয়ে তাপ জাগানো অসংখ্য চিঠিতে।

কত বিচিত্র রকমের চিঠি! কিছু চিঠি ছিল খুব বিরক্তিকর, কিছু মজার আর কিছু চিঠি পড়ে হৃদয়ে ভয়াবহ শূন্যতা জাগত। তাদের ছোটো ছোটো অনুভূতিগুলো আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিত। জীবন কী বিচিত্র! মনে হতো, আমি বাস্তবে নেই। মাত্র বাইশ বছর বয়সেই আমি তালাক পেয়েছি। বাস্তব আমাকে তালাক দিয়েছে।

চিঠিগুলো আমার সংগ্রহে রাখতে পারলে বেশ হতো। কিন্তু, আমাদের কোম্পানির নিয়ম ছিল, কোনো চিঠিই নিজের কাছে রাখা যাবে না। জমা দিয়ে দিতে হবে।

অবশেষে, একদিন আমি চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। এই অদ্ভুত চাকরি নিশ্চয়ই আমি সারাজীবন করতে পারতাম না। মানুষ চিঠিতে খুব সততার সাথে তার মনের গভীর গোপন কোনো কথা বলে ফেলে। সেই কথাগুলোর ভার একজনের পক্ষে সারা জীবন বয়ে বেড়ানো সম্ভব নয়।

হ্যামবার্গার স্টেকের গল্পে ফেরত আসি।

যে মহিলা আমাকে হ্যামবার্গার স্টেক রান্না বিষয়ক চিঠিটা লিখেছিল, তার সাথে আমার একবার দেখা হয়ে গেল। ‘দেখা হয়ে গেল’ বলতে যেরকমটা বোঝায়- ঠিক সেরকম না। আসলে আমরা দুজন দেখা করলাম।

সে ছিল বত্রিশ বছরের। বাচ্চাকাচ্চা নেই। তার জামাই কাজ করত একটা বড়ো কোম্পানিতে। জাপানের প্রথম সারির পাঁচটা কোম্পানির মধ্যে একটা ছিল সেটা। তাকে আমি যখন চিঠিতে জানালাম, চাকরিটা এ মাসে ছেড়ে দেব- সে আমাকে দাওয়াত করল। দুপুরে একসাথে খাব। উঁহু, কোনো রেস্টুরেন্টে না। ওর বাসায়। ও আমাকে হ্যামবার্গার স্টেক বানিয়ে দেবে, ঠিক আমার পছন্দমতো।

আমার কোম্পানির নিষেধ ছিল, ব্যক্তিগত যোগাযোগের ব্যাপারে। কিন্তু মনে হলো, চাকরিটা তো ছেড়েই দিচ্ছি। একটা বাইশ বছরের হৃদয়ের কাছে, কোম্পানির নিয়ম-কানুন তুচ্ছ মনে হলো।

রেললাইনের ঠিক পাশেই তার অ্যাপার্টমেন্ট। কত সহস্রবার এই রেললাইন ধরে আমি শেষ ট্রেনে বাসায় ফিরেছি। ট্রেনের জানালা দিয়ে এরকম সারি সারি বিল্ডিং দেখেছি। ভাবতেই পারিনি, এর কোনো একটা বিল্ডিংয়ের ঠিকানায় আমি নিয়মিত চিঠি লিখি।

বাসাটা পরিপাটি। একটা বাসায় বাচ্চাকাচ্চা না থাকলে, ঠিক যতটুকু গোছানো থাকার কথা- ততটুকুই ছিল। আসবাবপত্র খুব একটা দামি না। ওর গায়ের সোয়েটারটাও আলাদাভাবে চোখে পড়ার মতো নয়- কিন্তু, সবকিছুই বেশ রুচির ছাপ বহন করে।

আমরা দুজনেই দুজনকে দেখে একটু চমকে উঠলাম। আমি ওর বয়সটা আরেকটু বেশি আশা করেছিলাম। আর ও ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি, আমার বয়স মাত্র বাইশ। আমাদের কোম্পানির নিয়ম ছিল- ছাত্র, শিক্ষক কারো বয়সই প্রকাশ করা যাবে না।

প্রথম দেখা হওয়া নিয়ে মনের মধ্যে একধরনের দুশ্চিন্তা কাজ করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটা কেটে গেল। আমরা হ্যামবার্গার স্টেক খেলাম, সাথে কফি।

ধরেন, একটা স্টেশনে অনেক যাত্রী দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেন ধরবে। ট্রেনটা এল। হুড়োহুড়ির মধ্যে, সবাই উঠে গেল। শুধু একটা ছেলে এবং একটা মেয়ে ট্রেনে জায়গা পেল না। তারা দাঁড়িয়ে রইল প্লাটফর্মে, বিষণ্ণ। আমাদের দুজনকে মনে হচ্ছিল, সেই ট্রেনের যাত্রী।

সেদিনের আবহাওয়া ছিল খুব চমৎকার। রোদ উঠেছিল ঝলমল করে। অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দা ভরে গিয়েছিল রোদে। মৃদু মিউজিক বাজছিল রেকর্ড প্লেয়ারে। হ্যামবার্গার স্টেকটা ছিল বিশুদ্ধ কবিতার মতো, কোথাও কোনো ছন্দপতন নেই। আমি ঠিক যেমনটা চেয়েছিলাম। গ্রিল করায় বাইরের অংশটা বাদামি রং ধারণ করেছিল, ভেতরটাও ছিল দারুণ। এর থেকে সুস্বাদু হ্যামবার্গার স্টেক আমি জীবনে কখনো খাইনি- এমনটা বললে ভুল বলা হবে। কিন্তু, এ কথা সত্যি যে, ওটা অনেক বছরের মধ্যে খাওয়া আমার সেরা স্টেক। আমি ওকে কথাটা বললাম। শুনে খুব খুশি হলো ও।

কফি খাবার পর আমরা দুজন গল্পে বসলাম। এ গল্প, সে গল্প, কত গল্প জমা হয়ে ছিল। আসলে আমার গল্প না। ওর গল্প। গল্প তৈরি হবার মতো জীবনের পথ আমি পাড়ি দিইনি, মাত্র বাইশ বছর বয়স ছিল আমার। কী গল্প তৈরি হবে? ও-ই কথা বলে যাচ্ছিল। আমি শুনছিলাম।

কলেজে থাকতে, ও লেখালেখি করতে চেয়েছিল। ওর ভালো লাগত ফ্রঁসোয়েজ স্যাগনের লেখা। ফ্রান্সের একজন জনপ্রিয় লেখিকা ছিলেন তিনি। জনপ্রিয় এবং সস্তা। স্যাগনের লেখা আমার খুব একটা অপছন্দ ছিল না। ঠিক ততটা সস্তা লাগত না, যতটা সবাই বলত। তাছাড়া, এমন কোনো আইন নেই যে উপন্যাস লিখতে গেলেই হেনরি মিলার বা জন জ্যানেট-এর মতো ক্লাসিকাল কিছু লিখতে হবে।

‘আমি চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু লিখতে পারিনি এক লাইনও,’ সে বলল।

‘শুরু করতে চাইলে যেকোনো সময় শুরু করা যায়। কখনোই দেরি হয়ে যায় না,’ আমি বললাম।

‘আমাকে মিছে উৎসাহ দিও না। আমি জানি, আমি লিখতে পারি না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি তোমার কাছ থেকেই জেনেছি- আমাকে দিয়ে লেখালেখিটা সম্ভব নয়,’ বলে সে মৃদু হাসল, ‘তোমাকে চিঠি লিখতে লিখতেই একদিন আমার মনে হলো, তুমি কত সুন্দর করে গুছিয়ে লেখ, সে তুলনায় আমার লেখাগুলো কোনো লেখা হয়ে উঠছে না। আসলে প্রতিভার অভাব থাকলে যা হয়।’

লজ্জায় লাল হয়ে গেলাম। বয়সটা ছিল বাইশ। লজ্জায় লাল, নীল, বেগুনি হবার বয়স।

তাকে সান্ত্বনা দেবার জন্য বললাম, ‘তুমি মনে করো না, তোমার লেখা খুব খারাপ। আর কিছু না থাকুক, তোমার লেখার মধ্যে এক আশ্চর্য সততা আছে। যেটা ভাবছ, সেটা বলতে তোমার বাঁধে না। লেখকের একটা খুব বড়ো গুণ হলো সততা।’

জবাব না দিয়ে সে হাসল। সে হয়তো বুঝতে পারছিল, আমি তাকে সুন্দর করে কিছু মিথ্যা কথা বলছি। তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছি।

বললাম, ‘তোমার একটা চিঠি পড়ে তো আমি হ্যামবার্গার স্টেক খেতে রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত ছুটে গেলাম। কি যাইনি, বল? তাহলে? তোমার লেখা যদি খারাপই হবে, তাহলে সেটা কী করে আমাকে টেনে নিয়ে গেল রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত?’

‘আমি বা আমার লেখা কোনোটাই তোমাকে টানেনি। আসলে টেনেছে তোমার ক্ষুধা। সেদিন তোমার পেটে খুব খিদে ছিল হয়তো।’

পাঁচটা বেজে গেল।

আমি বললাম, ‘আমার বোধহয় এখন ওঠা উচিত। তোমার হাজব্যান্ড বাড়িতে আসবে। তুমি নিশ্চয়ই তার জন্য রান্নাবান্না করবে, না?’

‘অসুবিধা নেই। অনেক দেরি করে আসে,’ ও বলল, ‘মাঝরাতের আগে তার বাড়ির কথা মনেই হয় না।’

‘ভয়ংকর ব্যস্ত মানুষ মনে হয়।’

সে হাসল। তারপর যেমন করে হেসে উঠেছিল, তেমন করেই চুপ হয়ে গেল। বলল, ‘তোমার মনে আছে, তোমাকে লেখা চিঠিতে আমি আমার সমস্যাগুলো শেয়ার করতাম। বিভিন্ন ধরনের সমস্যা, তোমার সাথে সেগুলো শেয়ার করতে কোথাও আমার নিজের মনের মধ্যে কোনো বাধা পেতাম না। কিন্তু জানো, ওর সাথে, মানে আমার হাজব্যান্ডের সাথে আমি আমার কোনো সমস্যার কথাই শেয়ার করতে পারি না। কী যেন একটা আমাদের দুজনের মাঝখানে এসে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমরা দুজন যেন দুজনের কথা বুঝতে পারি না। মনে হয়, আমরা আলাদা আলাদা কোনো ভাষায় কথা বলছি।’

আমি ঠিক জানতাম না তাকে কী বলা উচিত। আমি এটাও বুঝতে পারছিলাম না, কী করে একটা মানুষ আর একটা মানুষের সাথে জীবন কাটিয়ে দিতে পারে- যার সাথে নিজের ভেতরের কথা ভাগাভাগি করা যায় না।

‘তুমি এটা নিয়ে মন খারাপ কোরো না, ভেব না একেবারে। আমি এতে মানিয়ে নিয়েছি।’ বলল সে।

বাইরে দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। এরকম একটা ট্রেনেই আমি প্রতিদিন বাসায় ফিরি। হয়তো ঠিক সেই ট্রেনটাই। আমাদের মধ্যে যে নীরবতা, সে নীরবতাটুকু ঢাকবার জন্য হুইসেলটা খুব দরকার ছিল।

‘মাসের পর মাস তুমি আমাকে চিঠি লিখে গিয়েছ। আমার সব সমস্যা তুমি মন দিয়ে শুনেছ। আমি আমার অনুভূতিগুলো তোমার সাথে ভাগাভাগি করেছি। তোমাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেবো! আর তোমাকে লেখা আমার চিঠিগুলো? ওগুলো ছিল আমার মুক্তি, আঁধারের আলো।’

‘তোমার চিঠিও আমার খুব ভালো লাগত,’ আমি বললাম। যদিও আমি তার চিঠির একটা শব্দও আলাদা করে মনে করতে পারব কি না সন্দেহ। কিন্তু, এসব কথা বলতে হয়।

দেয়ালে ঘড়িটা ঝুলে ছিল। সময় বয়ে যাচ্ছিল। ও ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রইল। যেন পরীক্ষা করছিল, সময়ের স্রোত ঠিকমতো বইছে কি না।

‘গ্রাজুয়েশনের পরে কী করবে?’ ও জানতে চাইল।

বললাম, ‘এখনো কিছু ঠিক করিনি। আসলে বাস্তব জীবন সম্পর্কে আমার খুব বেশি ধারণা নেই।’

সে মৃদু হাসল। বলল, ‘তোমার এমন কিছু একটা করা উচিত, যে কাজটার মধ্যে আর কিছু না থাকুক- অন্তত লেখালেখি ব্যাপারটা থাকবে। তুমি খুব সুন্দর লেখ। জানো, আমি তোমার চিঠির অপেক্ষা করতাম। মাসে মাত্র চারটা চিঠি। কবে আসবে, আমি খুব আগ্রহ নিয়ে বসে থাকতাম। যদিও আমি জানতাম, এটা তোমার জন্য একটা চাকরি। প্রতি মাসে আমাকে তোমার চারটা চিঠি লিখতে হবে। বিনিময়ে তুমি কিছু টাকা পাবে। তবুও, আমি অপেক্ষা করতাম। তোমার চিঠিগুলো আমি খুব যত্ন করে জমিয়ে রেখেছি। আমার মাঝে মাঝে যখন খুব মন খারাপ হয়, আমি সেগুলো বের করি। তারপর আবার পড়তে শুরু করি।’

এরপর দশ বছর কেটে গেল।

ঐ রেললাইনের ওপর দিয়ে এখনো প্রায়ই সন্ধ্যায় ট্রেনে চেপে ঘরে ফিরি।

রেললাইনের পাশে উঁচু উঁচু বিল্ডিংয়ের দিকে তাকাই। সারি সারি জানালা। এর মধ্যে কোন জানালাটার ওপাশে সে হারিয়ে গেছে- সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। দশ বছর আগের সেই দিনটার ছবি মনের মধ্যে আঁকি।

হয়তবা, সে ঐ বাসায় আর থাকেনা। আর যদি থাকে, সে সম্ভবত সেই পুরনো মিউজিক শুনছে, সোফায় বসে। একইভাবে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জানালার দিকে।

আমার মনে হরেক রকম প্রশ্ন উঁকি দেয়। ও’র সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কি একটু অন্যরকম হতে পারত? আরেকটু বেশি ঘনিষ্ঠ? তাহলে কি আমি এই যে জীবনটা কাটাচ্ছি, সে জীবনে উল্লেখযোগ্য কোনও পরিবর্তন আসত? যদি আমি ও’র সঙ্গে বিছানায় যেতাম?

জানি না। আমি কিছু জানি না। কোনও কিছু সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা নেই। পৃথিবীতে এমন অনেক কিছুই আছে, যেগুলো তুমি কখনও জানতে পারবে না। তোমার বয়স বাড়বে, তুমি আরও বুড়ো হবে, কিন্তু সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর- তুমি কখনও পাবে না।

ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই।

সারি সারি বিল্ডিং।

এর মধ্যে ঠিক কোনটা ও’র বিল্ডিং, কোনটা ও’র জানালা- সেটাই খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। কোনও দিন প্রতিটা জানালাকেই মনে হয় ও’র জানালা। আবার কোনও দিন মনে হয়, কোনোটাই নয়।

ঈশ্বরের পৃথিবীতে অনেক খোলা জানালা।

জানালার ওপাশে না বলা কথা, অপেক্ষা করে আছে।

লেখক পরিচিতি:

হারুকি মুরাকামি একজন বিখ্যাত জাপানি ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প লেখক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক।

জন্ম ১২ জানুয়ারি, ১৯৪৯ সালে জাপানের কিয়োটোতে। দেশকালের সীমানার গণ্ডিতে তিনি আটকে নেই। সমগ্র দুনিয়াব্যাপী জনপ্রিয় তিনি। এটা সম্ভব হয়েছে তাঁর সরল গদ্যভাষা, বিষয়বস্তু, আর গল্প বলার জাদুকরি ঢংয়ের কারণে। পৃথিবীর সর্বাধিক বিক্রিত আর আলোচিত লেখকদের মধ্যে তাঁর নাম অগ্রগণ্য। আন্তর্জাতিকভাবে তাঁর লেখার চাহিদা এতটাই যে, ইতিমধ্যে বিশ্বের প্রায় ৫০টি ভাষায় তাঁর লেখা অনূদিত হয়েছে।

ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি অ্যাওয়ার্ড (২০০৬), ফ্রাঙ্ক ও’কনর আন্তর্জাতিক ছোটগল্প পুরস্কার (২০০৬), ফ্রানৎস কাফকা পুরস্কার (২০০৬), জেরুজালেম পুরস্কার (২০০৯) এসব তাঁর প্রাপ্তির সামান্য কিছু নমুনা। সাম্প্রতিক সময়ে নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের শর্ট লিস্টে তাঁর নাম বারবার এসেছে।

উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে- নরওয়েজিয়ান উড, কাফকা অন দ্যা শোর, দ্যা উইন্ড আপ বার্ড ক্রনিক্যাল, দ্যা এলিফ্যান্ট ভ্যানিশেস, এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ ইত্যাদি।

লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত