বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
৩২ °সে

শ্রদ্ধা

কামাল লোহানী আমাদের ইতিহাসের অংশ

কামাল লোহানী আমাদের ইতিহাসের অংশ
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কামাল লোাহানী

‘আমরা বিজয় অর্জন করেছি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে...।’ দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে পাক সেনাদের আত্মসমর্পণ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের যিনি প্রথম ঘোষণা দিয়ে সুখবরটি ইথারে ইথারে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তিনিই হচ্ছেন- কামাল লোহানী। কামাল লোহানী অন্যতম ইতিহাস নির্মাতা এবং আমাদের গর্বিত ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল অংশ।

তিনি সেই সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদ বিভাগের প্রধান ছিলেন এবং ঐতিহাসিক ‘জয়বাংলা’ পত্রিকার বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। শুধু একাত্তরেই নয়; তাঁর পুরো জীবনটাই বাংলাদেশ, বাংলা সংস্কৃতি এবং বাংলার মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

কামাল লোহানী একদিকে যেমন ছিলেন সমাজের শীর্ষ পর্যায়ের মানুষ, অপর দিকে তাঁর শেকড় ছিল অতি সাধারণ গণ-মানুষের মধ্যে প্রোথিত। আবার আমাদের মতো মিডিল ক্লাসদের সঙ্গেও ছিল অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক। ফলে তাঁর সঙ্গে আমার ‘ব্যক্তিগত আত্মীয়তা’ তৈরি হয়। তাঁর ছেলে সাগর লোহানী আমার বন্ধু হলেও বেশি খাতির ছিল লোহানী ভাইয়ের সঙ্গেই। তিনি আমার উপস্থাপিত বিটিভির ‘দৃষ্টি ও সৃষ্টি’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন, আমি জাপান-সিডেন-আমেরিকা প্রবাসীদের যে সব পত্রিকা বের করতাম সেগুলোতে কলাম লিখতেন। শাহবাগের আজিজ মার্কেটে এলেই কখনো ঢু মারতেন আমার ছোট্ট অফিসে। চা খেতেন, আড্ডা দিতেন। তিনি এলে আমি স্বাভাবিক ভাবেই উচ্ছ্বসিত হতাম। কারণ, তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং তারুণ্য দুটোই আমাকে উজ্জীবীত করত।

অনেকেই হয়তো তাঁর আসল নাম জানান না- আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। এই নামের সূত্র ধরেই তাঁর সঙ্গে আমার যোগসূত্র ঘটে। ঘটনা একটু খুলেই বলি। শেষ সত্তরে আমরা লেখালেখি শুরু করলে প্রথম দিকে উত্তরাধিকার এবং সাপ্তাহিক রোববারে রফিক আজাদ, ইত্তেফাকে আল মুজাহিদী এবং সাতভাই চম্পায় আফলাতুন আমাদের নামের শেষাংশ (মিলন, রিটন, দুলাল) ছাপতে বিরোধীতা করেন আর আমরাও হার মানতে রাজি না। তখন ‌‌‌'সচিত্র সন্ধানী'র দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদক বেলাল চৌধুরী আমাকে সাহস দেন এবং সহযোগিতা করেন। কবি বেলাল চৌধুরী 'সচিত্র সন্ধানী'তে একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন লেখান। যার শিরোনাম ছিল- ‘নামের নামাবলি’। এতে লেখক-শিল্পী-সাংবাদিকদের নামের পরিবর্তন, ছদ্মনাম, সংক্ষিপ্ত নাম, পেন-নেইম, প্রতীকী নাম অর্থাৎ নামের নানান কাহিনি নিয়ে দীর্ঘ প্রতিবেদন।

তখন দৈনিক পত্রিকায় কলামিস্টদের ছদ্মনাম এবং প্রকৃত নামের ব্যাপারে আমাকে তথ্য জানিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন লোহানী ভাই। এই বিশাল মাপের শাদা মনের সরল মানুষটি কি যে নিরহংকার এবং নির্লোভী ছিলেন, তা সবাই জানেন।

লোহানী ভাইয়ের স্ত্রী দীপ্তি ভাবীও তাঁর সহযোদ্ধা ছিলেন, ছিলেন মতিঝিল স্কুলের শিক্ষিকা। স্ত্রী, তিন সন্তান রেখে তিনি চলে যান কলকাতায়। ভাবী ঢাকায় থেকেও মুক্তিদের সহযোগিতা করেন। পরে এক পর্যায়ে কলকাতায় গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন। ভাবীর মৃত্যুর পর এক লেখায় লিখেছেনঃ

‘মতিঝিল কলোনীর ঐ ফ্লাটটি ‘বিচ্ছু বাহিনী’ একদল এসে উপস্থিত দীপ্তির কাছে, আশ্রয়ের তাগিদে। দীপ্তি বিচ্ছুদের আগে থেকেই চিনতেন। তাই তাদের থাকতে দিতে কোন দ্বিধা করলেন না। খুলে দিলেন ঘরের দুয়ার। ফ্লাটটি গেরিলাযোদ্ধাদের ‘অস্ত্রাগার’-এ রূপান্তরিত হলো।

... স্কুলে যেতেই সেদিন প্রধান শিক্ষিকা রওশন সালেহা বললেন, ‘দীপ্তি তুমি এক্ষুনি চলে যাও কোথাও। তোমাকে খুঁজতে আর্মি স্কুলে এসেছিল।' তাঁর পরামর্শ শুনে দীপ্তি মগবাজারে এক বাড়ীতে গোপন আশ্রয়ে চলে গেল।...

পরে আগরতলা হয়ে কলকাতায় যান।... সংসার জীবনে ছাড়তে হয়েছিল গান। এবার সেই কণ্ঠকে দীপ্তি কাজে লাগালেন মুক্তিযুদ্ধে মনস্তাত্বিক প্রচার প্রচারণায়। লিখলেন কথিকা। উল্লেখযোগ্য কথিকা হলো ‘ঢাকায় স্বাধীনতার সূর্য’। প্রচারিত হলো ১৬ই ডিসেম্বর সকালের অধিবেশনে। তারপরে আমরাতো বিজয়ী হলাম পাকিস্তানী হানাদার সেনাবাহিনীর সকল দর্প চূর্ণ করে। তিনি লিখলেন ‘নেতাকে ফিরিয়ে আনবই’।

দীপ্তি, মনে তোমার প্রবল প্রত্যাশা ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশটাকে সমৃদ্ধ দেখতে। কিন্তু আজ বড় দুঃখ বন্ধু, দেশে সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত বাষ্প সমাজে-রাষ্ট্রে ছড়িয়ে গেছে ব্যাপক হারে। ধর্মনিরপেক্ষতার শ্লোগানে অর্জিত বাংলাদেশে আজ কেন এই দূর্বিপাক তার অনুসন্ধানে নেই কোন রাজনৈতিক আন্দোলন, অভ্যূত্থান। দেশে দুর্নীতি, বাণিজ্যে দুর্বৃত্তায়ন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, শূন্যগর্ভ রাজনীতি, মৌলবাদী অপশক্তির আস্ফালন এতো চাওনি কোনদিন। তারপরও আমরা সকলে তোমাদের মতন আশাবাদী, দেশ পাল্টাবেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সাম্প্রদায়িকতা প্রত্যাখ্যান করে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ সামনেই গড়ে উঠবে। তাই তোমার মত আমরাও জনগণের বিশ্বাসে আস্থাবান হতে চাই’। [দ্রঃ লড়াইয়ের সহযোদ্ধা স্মরণে/ কামাল লোহানী। বাঙালীয়ানা ২০ নিভেম্বর ২০১৯]

লোহানী ভাইয়ের এই সামান্য স্মৃতিকথা থেকে অনেক কিছুই জানা যায়। পাওয়া যায় যুদ্ধ থেকে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের চিত্র।

ভাষা সৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, সংগঠক, নাট্যকর্মী, বাম ধারার রাজনীতিবিদ ইত্যাদি পরিচয় ছাড়াও লোহানী ভাইয়ের আরেকটি পরিচয়- তিনি একজন লেখক। তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহ হচ্ছে- আমরা হারবো না, সত্যি কথা বলতে কী, যেন ভুলে না যাই, মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার, রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন বাংলা বেতার, মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার, এ দেশ আমার গর্ব, আমাদের সংস্কৃতি ও সংগ্রাম, লড়াইয়ের গান, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নৃত্যশিল্পের বিস্তার, দ্রোহে প্রেমে কবিতার মত এবং শব্দের বিদ্রোহ। মুক্তধারা থেকে প্রকাশিত আমি তাঁর দু’টি বই আলোচনা করেছিলাম।

সচেতন পাঠক মাত্রই লক্ষ্য করে দেখবেন, কামাল লোহানী গ্রন্থের নামকরণ থেকেই তাঁর লেখালেখি এবং লেখক সত্ত্বার পরিচয় স্পষ্ট। মাটি, মানুষ, মুক্তিযুদ্ধ, লড়াই, সংগ্রাম, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা, দ্রোহ, বিদ্রোহই মূল বিষয়। তাঁর এই দ্রোহ এবং বিদ্রোহ বাইরে থেকে কখনোই টের পাওয়া যেতো না। অগ্নিগিরির মতো তাঁর অগ্নিলাভা ছিল ভেতরে, অন্তরে।

বাইরে তিনি একজন পরিপাটি মাটির মানুষ। কখনো সাহেবি পোশাক পরতে দেখা যায়নি। শীত-বসন্তে সব সময় শাদা পায়জামা আর সফেদ পাঞ্জাবির ওপর চিকন পাড়ের পশমি শাল পরতেন। চলনে-বলনে, স্বভাবে ছিলেন লেখকদের মতো, খাঁটি বাঙালির মতো।

গণনাট্যেও তাঁর অবদান অবস্মরণীয়। তিনি পল্লীকবি জসীম উদদীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ নৃত্যনাট্য তৈরি করে দেশে-বিদেশে মঞ্চস্থ করেন। এছাড়াও তাঁর সংগঠন ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’র নাটক ‘আলোর পথযাত্রী’, গীতি আলেখ্য ‘ধানের গুচ্ছে রক্ত জমেছে,’ এবং নৃত্যনাট্য ‘জ্বলছে আগুন ক্ষেত-খামারে’ গণমানুষের মুক্তির স্বপ্নকে নতুন আশা দিয়েছে, নতুন ভাষা দিয়েছে, ভালোবাসা দিয়েছে। এই ভালোবাসায় তিনিও হয়ে উঠেছিলেন অভিনেতা এবং এই অভিনয় নিজের নাটকের মধ্যেই সীমিত।

আর যে বলছিলাম, ‘দ্রোহ এবং বিদ্রোহে’র কথা। তিনি জীবন সংগ্রাম শুরু করেছিলেন ৭ বছর বয়সে মা’র মৃত্যুর পর থেকেই এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত জীবন সংগ্রা্ম করেছেন। অবশেষে হেরে গেলেন করোনার কাছে! মাঝখানে সকল আন্দোলনের সঙ্গে তিনি আদর্শ এবং নীতিগত কারণেই সম্পৃক্ত ছিলেন। ছাত্র আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, থেকে শুরু করে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপন, রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধকরণের প্রতিবাদ, ‘ছায়ানট’ প্রতিষ্ঠা, সমাজে বিরাজমান অন্যায়, অনিয়ম, সামরিক শাসন এবং দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সব সময় সরব ছিলেন কামাল লোহানী। সেজন্য বহু বার জেলে যেতে হয়েছে। এমন কি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেও জেল খেটেছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর ছিলো অগাধ শ্রদ্ধা।

আপোষহীন, দেশপ্রেম, মুক্তচিন্তা, মানবতা, অসাম্প্রদায়িতার এই সৎব্যক্তিটি আপাদমস্তক সংস্কৃতি জগতের খাঁটি বাঙালি ছিলেন; তাঁর কাছে বাংলার মানুষের ঋণের শেষ নেই।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত