আসল বিমল মিত্র বনাম নকল বিমল মিত্র সমাচার

আসল বিমল মিত্র বনাম নকল বিমল মিত্র সমাচার
বিমল মিত্র

কথাসাহিত্যিক বিমল মিত্র তখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'বেগম মেরি বিশ্বাস’, ’সাহেব বিবি গোলাম’, ’কড়ি দিয়ে কিনলাম’ তখন পাঠকের হাতে হাতে। ঠিক এই চিন্তাটাই করলেন কয়েকজন দুষ্ট প্রকাশক। এক গাই এর দুধ দিয়ে আর কত! বরং নকল কিছু বিমলমিত্র তৈরি করা যাক! যেই ভাবা সেই কাজ! রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী নামের এক লোককে পাওয়া গেল যিনি শুধু পাঠক হিসেবে বিমল মিত্রের ভক্তই ছিলেন না, তিনি বিমল মিত্রের মত করে লিখতেও পারতেন! আর যায় কোথায়! তিনি তখন প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছিলেন তার একটি বই প্রকাশ করার জন্যে। প্রকাশকরা ঠিক এই সুযোগটি নিলেন। রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে বললেন, 'ভাইরে, আপনার বই আমরা ছাপবো। কিন্তু নামটা একটু পরিবর্তন করতে হবে! রাজি আছেন?'

-নাম পরিবর্তন! কেন? আমার স্বনামে অসুবিধা কোথায়?

-ভাই, স্বনামে লিখলে আপনার বই চলবে না। এই সহজ কথাটা কেন বুঝেন না? আপনি কে? আর আমরাই বা আপনার বই ছাপবো কোন সাহসে?

-তাহলে কী ছদ্মনাম নিয়ে লিখতে বলছেন?

-দেখুন আপনার হাত কিন্তু অসাধারণ! মনে হয় যেন স্বাক্ষাৎ বিমল মিত্র। তো ভাই, ছদ্মনাম যদি নিতেই হয়, হয়ে যান আরেক বিমল মিত্র! সুবিধা হোক আমাদের দুপক্ষেরই।

-ভাই আপনি কি ক্ষেপেছেন? বিমল মিত্র প্রতিষ্ঠিত একজন সাহিত্যিক। তাঁর কত ভক্ত, কত পাঠক! আর আমি কোথাকার রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী?

-মশাই আপনি খেলাটাই বুঝলেন না। আপনিও হয়ে যাবেন বিমল মিত্রের আরেক আত্না। আপনি আপনার মত করে লিখে যাবেন। পাঠক ভাববে আপনি অরিজিনাল বিমল মিত্র। আপনি ভুলে যান আপনার আইডেনিটিটি।

এবার পুরো বিষয়টা রবীন্দ্রনাথ চক্রবতীর আর বুঝতে অসুবিধা হল না। তিনি রাতারাতি হয়ে গেলেন বিমল মিত্র। প্রথম উপন্যাস 'রক্তপলাশ'। লেখক বিমল মিত্র। রমরমা ব্যবসা। প্রকাশক বেজায় খুশি। নকল বিমল মিত্র দেখলেন বাহ! কোকিল হয়ে কাকের বাসায় ডিম পাড়ার আনন্দ তো খারাপ না! নকল বিমল মিত্র সত্যিকারের বিমল মিত্র সেজে বিভিন্ন পাড়া মহল্লার সাহিত্য সভায় বক্তৃতা দিতে লাগলেন। পাঠকতো দুজনের কারোই চেহারা মনে রাখে নাই। তাহলে? কিন্তু কথায় বলে চোরের দশদিন আর গেরস্থের একদিন। ধরা পরলেন জাল বিমল মিত্র।

শেষ পর্যন্ত ১৯৭৩ সালে 'চতুরঙ্গ' পত্রিকা প্রথম নকল বিমল মিত্রকে আলো-আঁধারের গলি থেকে আলোতে নিয়ে এলো। নকল বিমল মিত্রকে আদালতে তোলা হল। আদালতে নকল বিমল মিত্র এবং তার প্রকাশক যুক্তি দিল যে একই সময়ে একাধিক নামে বিমল মিত্র কি থাকতে পারে না? বিধাতা কি একজন বিমল মিত্র নাম দিয়েই ধরণীতে পাঠিয়েছেন? পাঠকই বিচার করবে কোনটা আসল বিমল মিত্র আর কোনটা নকল বিমল মিত্র। নাকি? যুক্তিটা বিচারকের বেশ মনে ধরল। মামালায় নকল বিমল মিত্রের জয় হল। কিন্তু ততদিনে বাজারে ‘কড়ির চেয়ে দামি’, 'বসন্ত মালতী’, 'মানস সুন্দরী’সহ অগণিত নকল বিমল মিত্রের বইয়ে সয়লাব! জানা যায় রবীন্দ্রনাথ চক্রবতী স্বয়ং ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত বিমল মিত্রের নাম নিয়ে প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

মামালায় হেরে গিয়ে এবার আসল বিমল মিত্র নিজেই ঠিক করলেন ব্যাপারটা। ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ বাদে সব বই সব তাঁর স্বাক্ষরসহ ছাপা হয়ে বের হবে। এই প্রসঙ্গে তাঁর স্বাক্ষরের পাশাপাশি একটি বিবৃতিও তিনি যুক্ত করে দিলেন।

বিশেষ বিজ্ঞপ্তি

আমার পাঠক–পাঠিকাবর্গের সতর্কতার জন্য জানাই যে সম্প্রতি অসংখ্য উপন্যাস ‘বিমল মিত্র’ নামযুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। পাঠক মহলে আমার জনপ্রিয়তার ফলেই এই দুর্ঘটনা সম্ভব হয়েছে। ও–নামে কোনও দ্বিতীয় লেখক নেই। পাঠক–পাঠিকাবর্গের প্রতি আমার বিনীত নিবেদন এই যে, সেগুলি সম্পূর্ণ জাল বই। একমাত্র ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ ছাড়া আমার লেখা প্রত্যেকটি গ্রন্থের প্রথম পৃষ্ঠায় আমার স্বাক্ষর মুদ্রিত আছে।

বিমল মিত্র

লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত