ধারাবাহিক থ্রিলার

সাইকোপ্যাথ (পর্ব ১০)

পর্ব ১০
সাইকোপ্যাথ (পর্ব ১০)
সাইকোপ্যাথ

টনির এক্স গার্লফ্রেন্ড লুসি এল না, কিন্তু ইন্সপেক্টর হুক এলেন। গলা খাঁকরে বললেন, তারপর মিস রিনি, নাককাটার কিছু হদিস পেলেন?

পেয়েছি তো। এই যে ডিটেকটিভ মিস্টার রয় আর তার জিএফ উর্বী ওর বাড়ি গিয়েছিলো। লোকটার নাম টনি। তার কাঁচা মাছের কারবার। ইয়ারা আর প্লেন্টি নদীতে সে মাছ ধরে। টনির নিজস্ব ফিশিং বোট আছে। যাকে বলে সে পুরোদস্তুর মৌসুমী জেলে।

বেশ, বুঝলাম। কিন্তু কে তার এমন শত্রু, যে কিনা রেগেমেগে টনির নাক কেটে নিল! ফের প্রশ্ন করলেন গ্রোভার হুক। তাকে বেশ বিমর্ষ দেখাচ্ছে। অর্থাৎ নাককাটার কেসটা নিয়ে কমিশনার অ্যাশটন তাকে চাপে রেখেছেন।

এই প্রশ্নের উত্তর কারো জানা নেই। উর্বীরা এখানে শ্রেফ অতিথি। তবে রিপোর্টার রিনি সেনের জানা থাকলেও থাকতে পারে। ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে হতাশার ভাব করে রিনি। তার মানে সেও নিশ্চিতভাবে কিছু জানে না।

তারপর ইন্সপেক্টর হুক এক অদ্ভুত কথা বললেন। আচ্ছা, টেড বান্ডির কথা নিশ্চয়ই তোমরা জানো। সে একটা জঘন্য সাইকোপ্যাথ ছিলো। বলা নেই কওয়া নেই, সে যাকে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে তার অঙ্গচ্ছেদ করতো। স্পেশালি মেয়েদের।

ইন্সপেক্টরের জ্ঞানের বহর দেখে উর্বী চমকে যায়। তার মানে এখানকার পুলিশ নিয়মিত পড়াশোনা করেন, আপডেটেড নলেজ রাখেন। নইলে কবেকার সেই মার্কিনি সিরিয়াল কিলার টেডের কথা তার জানা থাকবে কেন! একেই বলে সভ্যতা। বিচক্ষণ পুলিশ অফিসার। উর্দিটা শুধু তাদের ক্ষমতার তকমা নয়, বরং দায়িত্ববোধেরও পরিচয়।

তার মানে আপনি কী বলতে চান ইন্সপেক্টর হুক? রিনি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল! আপনার কি মনে হয় মেলবোর্নেও সেই টেডের মতো ভয়ংকর কারো আগমন ঘটেছে? তাহলে ভিক্টোরিয়া পুলিশ এতদিন ধরে কী করলো! আপনি নিশ্চয়ই জানেন মিস্টার হুক, নাককাটার কেস কিন্তু শহরে এই প্রথম নয়। আগেও এরকম একটা লাশ পাওয়া গেছে। টনির কপাল ভালো যে সে নাক হারালেও প্রাণ হারায়নি। জননেত্রীর ঢঙে বলল রিনি সেন। ওর কথা শুনে গা শিউরে ওঠে উর্বীর। একজন সিনিয়র পুলিশ অফিসারকে কটাক্ষ করে রিনি একথা বলতে পারল!

অলোকেশ কিছু বললেননি, তিনি শুধু শুনছেন। দেখি, বেলফিল্ড থানার ইন্সপেক্টর হুক এবার কী উত্তর দেন।

বাস্তবে গ্রোভার হুক কিছু না বলে কেসটা বরং চেপে গেলেন। কিছুটা কাঁচুমাচু ভাব নিয়ে বললেন, দেখুন মিস রিনি, এটা কিন্তু মোটেও ঝগড়ার সময় নয়। আমাদের নিজেদের শহর এই মেলবোর্ন। কলহ করে মিছে সময় নষ্ট না করে বরং চলুন আমরা সবাই মিলে লোকটাকে খুঁজে বের করি।

হুকের কথা শুনে উর্বী ও অলোকেশ- দুজনেরই হৃদয় জুড়িয়ে যায়। কী সুন্দর কথা! ইন্সপেক্টর হুক রিনির কথায় রিঅ্যাক্ট না করে উল্টো তার সাহায্য চাইলেন। নিজের অক্ষমতা বা ভুল স্বীকারে যে লজ্জার কিছু নেই, তা-ই বুঝিয়ে দিলেন মিস্টার হুক।

নাককাটা টনি আর তার প্রতিবেশী পিটারের বাড়ির ঠিকানা টুকে নিয়ে উঠে পড়লেন গ্রোভার হুক। কাল সবাইকে নিয়ে একবার বসবেন, এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বেরিয়ে যান। বাইরে গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ শোনা যায়। অর্থাৎ বেলফিল্ডের উদ্দেশে গাড়ি হাঁকালেন মিস্টার গ্রোভার।

খানিক বাদে উর্বী আর রিনি গিয়ে কিচেনে ঢুকল। ফলে বসার ঘরে একা পড়ে যান ডিটেকটিভ অলোকেশ। বেচারা টনি! মনে মনে ভাবছেন অলোকেশ। একটা মানুষ, তার নাক নেই। কেমন লাগে দেখতে! কিন্তু টনির কে এমন শত্রু, যে তার নাক কেটে এভাবে সবার সামনে তাকে নাকাল করল! টনির জন্যে সত্যি মায়া হয় অলোকের। হতে পারে সে মানুষ খারাপ, তাই বলে নাক কেটে নেওয়া! খুব খারাপ, একেবারে যাকে বলে ক্যানিবাল আচরণ।

টনির সেই লুসি কাবেরি এলে কিছু একটা আইডিয়া পাওয়া যেত। কিন্তু সে কথা দিয়েও এল না। এশিয়ান কালচার আর কি! টনির সঙ্গে সে সহবাস করত, তার মানে ওদের মাঝে প্রেম বেশ ভালোই জমেছিল। টনি ফ্রম হংকং, আর লুসি ইন্ডিয়ান। দুই দেশের দুই কালচারের মাঝে প্রেম হয়! হয় হয়তো। প্রেম এমন জিনিস, বোকাকে মহা বুদ্ধিমান, আর চালাককে বেকুব বানিয়ে দেয়।

স্মার্টফোন হাতে সার্ফিং করছেন অলোকেশ। ‘সিরিয়াল কিলার’লিখে সার্চ দিলেন। এবার একটা নতুন নাম পেলেন তিনি। আন্দ্রেই চিকাটিলো।

চিকাটিলো রাশিয়ান সিটিজেন। তার এক অদ্ভুত নেশা ছিল। সে মূলত মেয়েদের কিডন্যাপ করত। ছোটো-বড়ো কিছু মানতো না। মেয়েদের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপনই ছিল তার উদ্দেশ্য।

আপনি হয়তো বলবেন, এখানে আবার অদ্ভুত কী দেখলে! এমন তো অনেকেই করে। হুঁ! এখানেই সিরিয়াল কিলার আন্দ্রেই চিকাটিলো অন্যদের চেয়ে আলাদা। সে কোনো জীবিত মেয়ের সঙ্গে এসব করত না, আগে তাকে মেরে তারপর তার সঙ্গে যৌনসংসর্গ স্থাপন করত চিকা।

গুগল জানাচ্ছে এটা একরকম অসুখ। এই অসুখের নাম নেকরোফিলিয়া। আন্দ্রেই চিকাটিলোর বাড়ি ছিল রাশিয়ার রোস্তভ শহরে। তাই তাকে বলা হতো ‘রোস্তভের কসাই’। ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যেই সে অন্তত তিপ্পান্ন জন মেয়েকে খুন করেছে। চাকু দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে নারীদেহ ছিন্নভিন্ন করেই সে ব্যাপক আনন্দ পেত। শীর্ষসুখ, যাকে বলে অরগ্যাজম। ছি! মানুষ এমন নৃশংস হয়! বিকারগ্রস্ত চিকাটিলো।

বিচারে মৃত্যুদণ্ড হয় আন্দ্রেই চিকাটিলোর। ১৯৯৪ সালে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে গুলি করে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

এসব কাহিনি পড়তে গিয়ে বিবমিষা পায় অলোকের। মানে বমি বমি ভাব হয়। এই আন্দ্রেই চিকাটিলো দেখছি চিকার চেয়েও খারাপ! মৃত মেয়েদের সঙ্গে সে সেক্স করে! মানে হয়! ব্যাটা নেকরোফিল্ কোথাকার! রেগেমেগে ফোন সুইচড অফ করে ফেলেন ডিটেকটিভ অলোকেশ।

একটু পরে উর্বী এসে বলল, ডিনার রেডি। চাইলে তুমি এখন খেতে পারো। গরমাগরম কোর্মা।

কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখেন অলোকেশ। রাত মোটে সাড়ে ন’টা। হুঁ! এখন অবশ্য খাওয়া যায়। ডিনার একটু আগেভাগে খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। খেয়ে তারপর হালকা পায়চারি। তাতে বাড়তি ক্যালরি বার্ন হবার খানিক সুযোগ পায়। আর খেয়েই কাটা কলাগাছের মতো শুয়ে পড়া বড্ড বাজে অভ্যেস। তাতে শরীরে মেদ জমবেই।

উর্বী শুরুতেই বলল, আজ খাদ্যখানা সব রিনির ব্যবস্থাপনায় হয়েছে। প্রশংসা বা নিন্দা- দুটোই ওর প্রাপ্য। রিনি এখানকার লোকাল বাসিন্দা, তাই তার রেসিপি সব ভিক্টোরিয়ান স্টাইলে হবে।

চালাক মেয়ে, নাকি বুদ্ধিমতী! আগে থেকেই নিজের অবস্থান পরিষ্কার করল উর্বী। খেয়ে যদি ভালো না লাগে তো সব দোষ নন্দ ঘোষ ওই রিনির ওপর বর্তাবে।

শুরুতেই রুটি। ঠিক পাউরুটি নয়, বান টাইপ রুটি। ফার্মফ্রেশের মতোন আজকেই রুটিটা ফ্যাক্টরি থেকে এসেছে, এখনো গরম। রুটির সঙ্গে পিনাট বাটার। সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর।

বাটারের ডিব্বাটা তুলে দেখলেন অলোকেশ। সেখানে কোম্পানির নাম, ঠিকানা ও উপাদান সব স্পষ্ট অক্ষরে ছাপানো আছে। কোলস সুপারমার্কেট পিটিওআই লিমিটেড, ভিক্টোরিয়া। খেয়ে ভালো না লাগলে পুরো মূল্য ফেরতের জন্য একটা অফিসও বরাদ্দ আছে। ভাগ্যিস, এটা বাংলাদেশ না। তাহলে খদ্দেররা প্রায় পুরোটুক বাটার খেয়ে ডিব্বার তলায় একটুখানি রেখে তারপর বলত যে খেতে ভালো হয়নি, একেবারে বিস্বাদ। এবার আমাকে পুরো টাকা ফেরত দিন। ব্যস, দুদিনেই কোম্পানির মালিক রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করা শুরু করত।

রুটি-বাটারের পর মিক্সড ভেজিটেবলস। রিনি জানে, এশিয়ান মানেই গুচ্ছের শাকসবজি খায়। কিন্তু এখানে সবজির বাজার চড়া। তাতে কী, নিত্য তো আর হয় না। মাঝেমধ্যে একটু সবজি খেলে এমন কী ক্ষতি!

রিনির রান্নার হাত ভালো। স্পিনাচ টাইপ একরকম শাক রান্না করেছে, সাথে মুগডাল। বেশ লাগছে। কাঁচা লঙ্কা নেই তাতে কী হয়েছে, শুকনো তো আছে। একটু বেশি ভাজা ভাজা পোড়ামরিচ শাকে বেশ মানিয়ে যায়।

ভেড়ার মাংসের কিমা করেছে, সঙ্গে চেরি টোমেটোর সালাদ, সসেজ আর ইওগার্ট। এখানে ‘অজি বার-বিকিউ’বলে একটা জিনিস আছে। রিনি বলল, নেক্সট দিন সে মাটনের ‘অজি-বারবিকিউ’করে খাওয়াবে। স্বাদে ভিন্নতা আছে, উপাদেয়ও।

নাও, এটা একটু টেস্ট করো মিস্টার ডিটেকটিভ। খেয়ে বলবে হোয়াট ইজ ইট মেড অব! আদুরে গলায় বলল রিনি সেন। ওর চাহনিতে মিটিমিটি হাসি।

তাতে আবার উর্বী খানিক ধাক্কা খায়। রিনি কি অলোককে একটু বেশিই প্যাম্পার করছে! নেহাতই ভদ্রতা করে নয়, বরং অলোককে খুশি করার একটা প্রয়াস লক্ষ করা যাচ্ছে!

একেই বলে নারীর মন। এরা একটু বেশিই বোঝে, আর যেন বনহরিণীর মতো সতর্ক। বাস্তবে রিনিকে সন্দেহ করতে পারে না উর্বী। শি’জ টু গুড টু বি টেকেন আদারওয়াইজ!

রিনি কেকমতোন দেখতে একরকম খাবার এনে রাখল অলোকের সামনে। কেকের ওপর আবার ছড়িয়ে দিয়েছে নানারকম ফলের টুকরো। স্ট্রবেরি, গুজবেরি, আপেল, কুর‌্যান্ট, পিচফল ইত্যাদি। লন্ডনে পড়াশোনা করেছেন অলোকেশ, তাই কিছু কিছু পাশ্চাত্যের খাবারের নাম তিনি জানেন।

খেতে সুস্বাদু। অমনি সার্টিফিকেট দিলেন অলোকেশ।

টেস্টি সে তো বুঝলাম, কিন্তু তুমি বলো এটা কী? নাম বলো অলোকেশ। রিনি চোখের কোনায় হাসি মেখে বলল। এটা অলোকের বেশ লাগে। মানে নেত্রাঘাত। যেসব মেয়েরা মেপে হাসে আর চেপে খেলে, তাদের তিনি একদম দেখতে পারেন না। একটাই জীবন, অত মাপজোখ করে কী হবে! হাত খুলে খেললেই হয়!

অলোক বললেন, ল্যামিংটন। একরকম বাটারকেক।

প্রায় কাছাকাছি এসেছিলে ডিটেকটিভ, কিন্তু হলো না। কমলাকে কাউফল বললে তো চলে না, তা-ই না!

উর্বীরও খুব কৌতূহল হচ্ছে। কেকটা খেতে দারুণ। প্রচুর ফলের সমাহার আছে, আর আছে মুরিং-টপ। অর্থাৎ ডিমের সাদা অংশ দিয়ে বানানো কুড়মুড়ে চিপস। খাবারের কত বাহার দেখ!

রহস্য না করে রিনি শেষে বলেই দিল কেকের নামটা। বলল, এটা তামাম অস্ট্রেলিয়ায় খুব পপুলার ডেজার্ট। এর নাম পাভলোভা। একরকম কেক। কেকের রেসিপি এসেছে মূলত রাশান ব্যালে নর্তকী আনা পাভলোভার নাম থেকে। ইমপেরিয়াল ব্যালে, রাশিয়ার একসময়কার সাড়াজাগানো নাচনেওয়ালি ছিলেন পাভলোভা। তার নৃত্যকলায় মুগ্ধ হয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিল নাকি তাকে প্রায় প্রোপোজ করেই বসেছিলেন। বোঝো ঠেলা! তাতে আবার বাগড়া দেন ক্ষমতাসীন রাশান ‘জার’। তাই নর্তকী পাভলোভাকে আর শেষঅব্দি চার্চিলের বিয়েটা করা হয়নি।

সেই নৃত্যপটিয়সীর নামে যে কেক, তা তো খেতে সুস্বাদু হবেই। মাথা নাড়ল উর্বী।

কিন্তু রিনি, তুমি কেক বানানোর এসব রসদ কোথায় পেলে? আমি তো বাজার করিনি। অলোক বললেন।

আমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম হে গোয়েন্দাপ্রবর। তোমার চোখের সামনে দিয়ে হেঁসেলে ঢুকলাম, অথচ তুমি দেখতে পাওনি। কীসের ডিটেকটিভ তুমি অলোকেশ! হা হা হা!

(চলবে)

লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত