ভ্রমণ

সুদর্শনকে গ্রাস করে দক্ষিণের রানী

সুদর্শনকে গ্রাস করে দক্ষিণের রানী
যোগজাকার্তার সমুদ্রতীর

ঢাকা ছাড়ার আগে উজ্বল সবুজ রংয়ের একটি প্রিন্টের শার্ট কিনেছিলাম। তখনই ভেবে রেখেছিলাম, সাগর পাড়ে যাওয়ার সুযোগ পেলে এই শার্ট পড়বো, কিছুটা হাওয়াই ধরনের। আজ সকাল থেকেই শার্টটি পড়ে ঘুরছি।

জানুয়ারিতেও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় কড়া রোদ। গত দুই দিন ধরে ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণের এই যোগজাকার্তা শহরে ঘুরে এটুকু বোঝা হয়েছে, বৈচিত্র্য আর সংস্কৃতিতে এটা এক তীর্থস্থান। সকাল থেকে প্রামবানান মন্দির আর চান্ডি কালাসান মন্দির ঘুরে দুপুর গড়িয়ে যায়। দ্রুত হোটেল থেকে চেক আউট হয়ে এখানকার বিখ্যাত খাবার ছাগলের মাংস দিয়ে তৈরি গুডগার স্বাদ নিই। উদ্দেশ্য ভারত মহাসাগর দেখতে যাব। মনে মনে থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ার সাগর পারের মতো নীল পানি আর অল্প প্রস্থের সাগর তীরের কল্পনা করে নিলাম।

গাড়িতে চাবি ঘুরাতেই আমার দিকে তাকিয়ে হতাশার হাসি ছুড়লেন দামার। বললেন, ‘দুঃখিত এই সবুজ শার্ট গায়ে দিয়ে এই সাগর পারে যেতে পারবে না। সুস্থ্যভাবে তোমার বাংলাদেশে ফেরা নিশ্চিত করতে চাই আমি।’

ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলাম, আবার কি হলো?

ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা পোস্টের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক দামার হারসানতো। ২০১৭ সালে সিঙ্গাপুরে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের এশিয়ান জার্নালিজম ফেলোশিপ প্রোগ্রামে আমরা ফ্ল্যাটমেট ছিলাম। দামার যা বললেন, তাতে বাকরুদ্ধ আমি।

বললাম, তুমি এসব বিশ্বাস করো? বললেন, পুরো যোগজাকার্তার মানুষ বিশ্বাস করে। আমি কিন্তু এখানকারই ছেলে। আর সবুজ কাপড় পড়া মানে সমুদ্রের রানীর খুনে দৃষ্টিতে পড়া! এসব শুনে আর সাহস করলাম না। খুলে ফেলতে হলো সবুজ শার্ট। কারণ সমুদ্রের রানী সবুজ রংয়ের পোশাক পড়া যুবকদের প্রেমে পড়েন এবং তাকে সাগরে টেনে নিয়ে যায়।

জাভানিজ পুরাণে ‘নিয়াই লোরো কিদুল’ হচ্ছে সমুদ্রের দেবী। আর তিনিই দক্ষিণ সাগর বা ভারত মহাসাগরের রানী। জাভানিজ বিশ্বাস মতে তিনি মাতারাম এবং যুগজাকার্তার সুলতানদের আধ্যাত্মিক সঙ্গীও বটে।

পুরাণ, অঞ্চল, সময় ভেদে নিয়াই লোরোর অনেকগুলো নাম রয়েছে। যেমন, রাতু লাট সোলাতান, গুষ্টি কানজেং রাতু কিদুল বা কানজেং রাতু আয়ু কেনচোনো সারি। অনেক জাভানিজ বিশ্বাস করেন রানীর নামের পূর্বে নিয়াই, কানজেং বা গুষ্টির মতো সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার অপরিহার্য। পুরনো জাভানিজ শব্দে লারা মানে সুন্দরী বা কুমারী কণ্যা। তবে এক সময় লারা শব্দটি লোরোতে উচ্চারিত হওয়া শুরু হয়, যার মতে অসুস্থ বা হৃদয়ভাঙা কন্যা। যোগজাকার্তা শহর থেকে পূর্ব দিকে যেতে শুরু করলো আমাদের গাড়ি। এই শহরে দামারের শৈশব কেমন কেটেছিল সেই গল্পগুলোই বলতে থাকে।

কল্পনায় নিয়াই লোরো কিদুল দেখতে কেমন? অবশ্যই মৎস কুমারীর মতো। যার উপরের অংশ এক সুন্দরী নারী এবং নিচের অংশ মাছের। পুরাণ মতে দেবী যার জীবন নিতে চায়, তাকে কেউ আর ফেরাতে পারে না। দক্ষিণ জাভার উপকূলীয় গ্রামগুলোতে এই বিশ্বাস প্রচলতি রয়েছে যে, রানী প্রায়শই জেলে এবং পর্যটকরা পানিতে নামলে জীবন নিয়ে যায়। বিশেষত সুদর্শন পুরুষ হলে তো কথাই নেই।

আমি আর দামার একজন আরেকজনের দিকে তাকালাম। নাহ্। নিজেরাই নিজেদের বললাম, আমরা কেউই এতো সুদর্শন নই যে, রানী আমাদের নিয়ে যেতে চাইবে।

দামার জানালেন, জাভানিজ লোকগল্প এবং সাহিত্যে এক বিশেষ স্থান দখল করে রেখেছে নিয়াই লোরো কিদুল। এছাড়া একই দিনে তার আধ্যাত্মিক দক্ষতার পরিবর্তনের গল্পও মানুষের মুখে মুখে। আর যোগজাকার্তার এগারোতম হাবেংকুবুওনো সুলতান তার অভিজ্ঞতায় এই সমুদ্রের রানীকে নিয়ন্ত্রনের ঘটনাও লিখে গিয়েছেন। রানী অন্য সময় বৃদ্ধা থাকলেও পূর্ণিমায় এক সুন্দরী যুবতীতে রুপ নেন।

লোক কথায় বিশ্বাস করা হয়, মাঝ সাগরেই বাস লোরো কিদুলের। ভারত মহাসাগরের ঝড় এবং রাক্ষুসে সব স্রোতকে সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রণ করে সে। আবার সুরাকার্তা বা যোগজাকার্তা সুলতানের আধ্যাত্মিক স্ত্রী হিসেবেও লোক কথায় স্থান করে নিয়েছে।

রানীর প্রভাব রয়েছে মেরাপি আগ্নেয়গিরি থেকে শুরু করে ক্রাতন হয়ে দক্ষিণ সাগর পর্যন্ত। এর মাঝে সোলো এবং যোগজাকার্তা সাম্রাজ্যও পড়েছে বলে জানালো দামার।

লোককথার অনেক জায়গাতেই উল্লেখ রয়েছে রানী সামুদ্রিক সবুজাভ রংয়ের বা এই রংয়ের কাপড় পড়তো। ষোড়শ শতকের জাভানিজ মাতারাম সাম্রাজ্য এবং পাজাজারানের সুন্দানিজ সাম্রাজ্যের লোকগাথাগুলোতেই বেশি পাওয়া যায় সমুদ্রের রানীর কথা। যাই হোক জাভানিজ ও সুন্দানিজ নৃবিজ্ঞানে জাভার এই দক্ষিণ সাগরের রানীকে হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মের পূর্বের নারী দেবতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই সাগর উত্তাল। এর আগে আন্দামানকে দেখা সাগরের যে রূপ সেটা আর এখানে থাকলো না। বদলে গেলো। আমি দামারকে বললাম, এতো দেখি বঙ্গোপসাগরের চেয়েও বেশি গর্জন। কেমন জানি একটু বিরক্ত হলো আমার এই মন্তব্যে। উত্তরে বললেন, এটাতো সাগর না, মহাসাগর। আহম্, ঢোক গিললাম আমি।

দামার বললেন, প্রতি এপ্রিলে যোগজাকার্তার মানুষ হেঁটে এখানে আসেন প্রার্থনা করতে। প্রচুর ফল এবং অন্যান্য উপহার উৎসর্গ করা হয় রানীর উদ্দেশ্যে। যেন রানী শান্ত থাকে।

কক্সবাজার বা পুরির সাগর সৈকতের মতো এখানেও ঘোড়া রয়েছে পর্যটকদের জন্য। ঘুরতে আসা মানুষের ঘোড়ায় আরোহন করেন, ছবি তুলেন। এছাড়াও রয়েছে বীচ কার। চার চাকার এই গাড়িগুলোর চাকা মোটা। খেলনা গাড়ির মতো, তবে স্টার্ট দিতে হয় মোটর সাইকেলের মতো কিক দিয়ে। দুই জনে দুটি গাড়ি নিয়ে মেতে। আধঘন্টা ঘুরলাম বালুর ওপর। তবে পানির খুব কাছে যেতে সাহস হলো না। সাগরের পাড়ে হাত ধরে হাঁটছে এক যুগল। ইন্দোনেশিয়ায় পর্যটক কেন্দ্রগুলোতে বাংলাদেশের মতোই একটা বিষয় চোখে পড়ল, সেটা হচ্ছে লুকিয়ে প্রেম করতে আসা যুগলদের ভীড়। এই যুগল হেঁটে বেড়ালেও এই সমুদ্র পাড়কে কিন্তু মোটেও রোমান্টিক বলা যাবে না। বরং কেমন যেন ভয়ে ভয়ে একটু হাত ধরে আবার ছেড়ে দেয়। যেন এক্ষুণি সাগরের সব পানিকে সুনামি বানিয়ে লোরো কিদুল আঁছড়ে পড়বে লোকালয়ে। গ্রাস করে নিবে এই নির্জন জনপদকে।

লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত