বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
৩৪ °সে

শ্রদ্ধা

ক্ষণজন্মা এন্ড্রু কিশোর

ক্ষণজন্মা এন্ড্রু কিশোর
এন্ড্রু কিশোর, ৪ নভেম্বর ১৯৫৫-৬ জুলাই ২০২০

আপনজনের বাইরে সাধারণত কারো মৃত্যু হলে বড়োজোর দুঃখভারাক্রান্ত লাগে। রক্তের বন্ধন ছাড়া খুব কম মানুষ চিরতরে চলে গেলে চোখ ভিজে ওঠে। এন্ড্রু কিশোরের প্রস্থানে সেভাবেই মন কেমন হয়ে উঠল। দৃষ্টি কিছুটা ঝাপসা হলো জলে। কিংবদন্তি শিল্পীকে হারিয়ে বাংলা সুরের ক্যানভাসে এখন কান্নার রং। একজীবন গানে গানে কাটিয়ে দেওয়া কিংবদন্তির মহাপ্রস্থানে চারদিকে শূন্যতা।

সাংবাদিকতার সুবাদে এন্ড্রু কিশোরের সঙ্গে যোগাযোগ হতো মাঝে মধ্যে। যদিও পরিচয়টা হয়েছিল কৈশোরে! আমার বেড়ে ওঠার সঙ্গী ছিল তাঁর মায়াবী কণ্ঠে নানান রঙের হৃদয় নিংড়ানো গান। প্রেম-বিরহ, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আধ্যাত্মিক; কতরকমের কাব্যকথা শুনেছি। দুপুরে স্নানের পর ভাতঘুমের আগে রেডিওতে অনুরোধের আসরে তাঁর গায়কি বাজতে শুনেছি বেশি। তখন তো চলচ্চিত্রের গানে তিনি ছিলেন অপরিহার্য ব্যাপার। তাঁর জনপ্রিয়তা এমন ছিল যে, বড়ো পর্দার জন্য পুরুষ কণ্ঠ দরকার তো ডাকো এন্ড্রু কিশোরকে! প্লেব্যাক বললেই সবার আগে চলে আসত তাঁর কথা। তাই নামের পাশে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ উপাধি। সংগীতজীবনে বছরের পর বছর শ্রোতাপ্রিয় বহু গান উপহার দিয়েছেন।

পাঁচ দশক ধরে দেশীয় চলচ্চিত্রের গান আর এন্ড্রু কিশোরের নাম ছিল সমার্থক। এমন অর্জনের পেছনে ছিল না কোনো তেলবাজি। সংগীতে তুমুল ব্যস্ততাকে হাতের মুঠোয় আনতে শুধু গান করে গেছেন তিনি। এটাই ছিল ধ্যানজ্ঞান। কারো সঙ্গে আলগা সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা ছিল না। আত্মবিশ্বাসী থেকেছেন শিল্পীসত্তার ওপর। তিনি মনে করতেন, সততার সঙ্গে পরিশ্রম করলে তাঁর গায়কি মানুষকে কাছে টানবেই। শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়েছে। চিরসবুজ গায়কির জন্য শ্রোতারা সবসময় তাঁকে গ্রহণ করেছেন সাদরে। ২০১৭ সালে কলকাতার নন্দীগ্রামে একটি কনসার্টে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এত দীর্ঘ সময় রাজত্ব করার রহস্য কী? সেখানেও তাঁর উত্তর ছিল, ‘রহস্য-টহস্য কিছুই না। আমি গান ছাড়া কিছুই পারি না। গান গাই। আমার সামনে যে গান আসে চেষ্টা করি যতটুকু ভালো করে গাওয়া যায়। তবে একটা কথা বলি আমরা— যেকোনো কাজের পেছনে যদি ত্যাগ থাকে, তাহলে ফল আসে। ত্যাগ না থাকলে হয় না। হয়তো আমার কিছু ত্যাগ আছে সেজন্য এতদূর আসতে পেরেছি।’

সত্যিই গান গাওয়া ছাড়া কোনোদিকে মনোযোগ দেননি। গানই ছিল তাঁর পেশা ও নেশা। শুধু গানের জন্যই সৃষ্টিকর্তা বুঝি তাঁকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন। এমন নিবেদিত পেশাদার গায়ক বিরল। তবে প্রায় ১৫ হাজার গানে কণ্ঠ দেওয়ার মাঝেও আক্ষেপ ছিল। আরেকটি কনসার্টে তিনি নিজেই সেটা বলেছিলেন। এই লেখার সময় ইউটিউবে তাঁর কথাগুলো শুনছিলাম, ‘আমি যেহেতু চলচ্চিত্রের গান গাই, এটা দিয়ে জীবন শুরু আমার। তো চলচ্চিত্রে যারা গায়, তাদের কিন্তু নিজস্ব কোনো চাহিদা থাকে না। আমরা (স্টুডিওতে) আসি ডাকে। যে গান শেখানো হয়, যে গান শোনানো হয়, সেটি গাইতে হয়। আমাদের নিজস্ব কোনো পছন্দ থাকে না। কিন্তু আমরাও তো শিল্পী, গান গাই, (ব্যক্তিগতভাবে) কিছু পছন্দ তো থাকেই। সেরকম একটি গান আমাদের দেশের কোনো গীতিকার নন তিনি, কবি একজন। তিনি লিখে গানটা আমাকে দেখিয়েছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, ‘বস, গানটা কেমন হয়েছে দেখেন তো, আমি তো গীতিকার না, কবি মানুষ।’ আমি দেখলাম গানটা অসাধারণ। কিন্তু আমার দুঃখ, গানটা গাওয়ার কোনো জায়গা বা সুযোগ আমার ছিল না। কারণ তখন ক্যাসেটের যুগ ছিল না। ক্যাসেটের কোনো মিডিয়া ছিল না। যা-ই হোক, গানটা কোনোরকম ব্যান্ডের ছেলেরা গাইলো, লোকে শুনলো। কিন্তু আমার আক্ষেপটা থেকে গেল—গানটা লেখার পর প্রথম আমি দেখলাম, পছন্দ হলো, কিন্তু গাইতে পারলাম না। সেজন্য বিভিন্ন সময় প্রযোজক ও পরিচালকদের উদ্বুদ্ধ করেছিলাম, তাদের ছবিতে যেন গানটি ব্যবহার করা হয়। সেই অনুরোধ থেকে সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে ছবিতে দিয়ে দিচ্ছি তোর যখন পছন্দ গানটা।’

সেই গান হলো ‘আমার ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্তরে’। এটি লিখেছিলেন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ । সেই গীতিকবিতা ‘তোমাকে চাই’ ছবিতে সালমান শাহের ঠোঁটে আমরা শুনেছি ‘ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লেখো’। এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠের দ্যুতি চেনার জন্য এই গান উদাহরণ হতে পারে। তাঁর ছিল বাউল মন। গানের টানে বাউলের মতো স্টুডিও থেকে স্টুডিওতে ছুটেছিলেন। শ্রোতাদের হৃদয়ের বন্দরে ছিল তার নিবিড় চলা।

সাহিত্যের প্রতি এন্ড্রু কিশোরের মধ্যে আলাদা একটা ভালোলাগা কাজ করত। ‘আমি চিরকাল প্রেমেরও কাঙাল’ গানের মতোই। সৈয়দ শামসুল হকের লেখা কয়েকটি গান গেয়েছেন তিনি। সবই জনপ্রিয়। ১৯৮২ সালে ‘বড় ভালো লোক ছিলো’ ছবির চিত্রনাট্য ও সংলাপের সঙ্গে সব গান লিখেছিলেন সব্যসাচী লেখক। এর মধ্যে ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস দম ফুরাইলে ঠুস’ আজো শ্রোতাদের মুখে মুখে ফেরে। এজন্য জীবনের প্রথম জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন এন্ড্রু কিশোর। একই ছবির ‘তোরা দ্যাখ দ্যাখ দ্যাখরে চাহিয়া’ ও ‘আমি চক্ষু দিয়া দেখতাছিলাম জগৎ রঙ্গিলা’ গান দুটিও গেয়েছিলেন।

‘মান সম্মান’ ছবির জন্য সৈয়দ হকের লেখা ‘কারে বলে ভালোবাসা কারে বলে প্রেম, মিলনে বিরহে আমি জানলেম, লোকে বলে ভালোবাসা আমি বলি ভাঙ্গাবাসা, তাকে হারালেম সবই হারালেম’ এন্ড্রু কিশোরের আরেক কালজয়ী গান। ‘আশীর্বাদ’ ছবির জন্য সৈয়দ হকের কথায় রুনা লায়লার সঙ্গে গাওয়া ‘চাঁদের সাথে আমি দেবো না তোমার তুলনা’ চিরসবুজ প্রেমের গান।

ওপরের সব গানই আলম খানের সুর করা। সৈয়দ শামসুল হক প্রয়াণের দুই দিন আগে এন্ড্রু কিশোরকে নিজের অপ্রকাশিত কিছু গান দিয়ে আলম খানকে দিয়ে সুর করার জন্য বলে যান। এর মধ্যে একটির কথা এমন—‘ফুলের গন্ধের মতো থেকে যাব তোমার রুমালে’।

এন্ড্রু কিশোরের চলচ্চিত্রে অভিষেক সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলম খানের হাত ধরে। ১৯৭৭ সালে আলম খানের সুরে ‘মেইল ট্রেন’ ছবির ‘অচিনপুরের রাজকুমারী নেই যে তার কেউ’ এই জুটির প্রথম গান। ‘প্রতিজ্ঞা’ (১৯৭৯) ছবির গান ‘এক চোর যায় চলে’ জনপ্রিয়তা পেলে আর পেছনে তাকাতে হয়নি এন্ড্রু কিশোরকে। আলম খানের সুরে তাঁর অসংখ্য জনপ্রিয় গান আছে। ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’, ‘সবারে আমি করলাম পার’, ‘তুমি যেখানে আমি সেখানে’, ‘আমি একদিন তোমায় না দেখিলে’, ‘তুমি আজ কথা দিয়েছো’, ‘তুমি আমার কত চেনা’, ‘এখানে দুজনে নির্জনে’, ‘এ জীবনে যারে চেয়েছি’, ‘সবার জীবনে প্রেম আসে’ ইত্যাদি।

এন্ড্রু কিশোর যেসব গান গেয়ে আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন, সেগুলোর তিনটিরই সুরকার আলম খান। বাকি দুটি হলো ‘সারেন্ডার’ (১৯৮৭) ছবির ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’ ও ‘কি জাদু করিলা’র (২০০৮) শিরোনাম গান। কাকতালীয় ব্যাপার, প্রথম ও শেষ জাতীয় পুরস্কার দুটোই আলম খানের সুরে গেয়ে! যদিও তাঁর কাছে বড়ো পুরস্কার ছিল শ্রোতার ভালোবাসা। এছাড়া আর কিছুই চাননি। পুরস্কার প্রাপ্তি কখনো তাঁকে আকর্ষণ করেনি।

গুণী সুরস্রষ্টা আলম খানকে গুরুর মতো শ্রদ্ধা করতেন এন্ড্রু কিশোর। অনেক বছর আগে গুরু-শিষ্য বিষয়ক একটি ফিচার লেখার জন্য ঢাকার মোহাম্মদপুরে আলম খানের বাসায় তাঁদের সঙ্গে অনেকক্ষণ আড্ডা দিয়েছিলাম। সেদিন এন্ড্রু কিশোরের বিনয় দেখে অবাক হয়েছি। মনে হচ্ছিল, আলম খানের কাছে তিনি তুচ্ছ! বড়োমাপের শিল্পী হলেও খুব বিনয়ী ছিলেন। আলম খানের পরিবারের সদস্যের মতোই ছিলেন এন্ড্রু কিশোর। কথা বলতে গিয়ে তাঁদের চমৎকার সম্পর্ক বুঝেছি। সেদিনের আড্ডায় জানতে চেয়েছিলাম, আশির দশকে ‘মেইল ট্রেন’ বা ‘প্রতিজ্ঞা’র সময় এন্ড্রু কিশোরকে আলাদা মনে হয়েছিল কেন? আলম খান বলেছিলেন, ‘তাঁর কণ্ঠে অনন্য একটা ব্যাপার আছে, কারুকাজ বলি যাকে। ছেলেটা অসাধারণভাবে সব ধরনের গান গাইতে পারে।’

আড্ডা শেষে আলম খানের বাসা থেকে বেরোনোর পর এন্ড্রু কিশোর গাড়িতে ওঠার জন্য করমর্দন করে বললেন, ‘ফোন দিস।’ তাঁকে বললাম, একটা কথা জানার ছিল। আপনি তো তারকা, বিশাল মাপের শিল্পী, আলম খানকে তো মানুষ তেমন চেনে না, তাঁর সামনে এমন কাঁচুমাচু করছিলেন কেন? উত্তরটা এখনো স্পষ্ট মনে আছে, ‘মুরব্বিদের সামনে আপনাআপনি এমন হয়ে যাই। মন থেকে তাঁদের সম্মান করি।’

ক্যানসারের কাছে হেরে গত ৬ জুলাই এন্ড্রু কিশোরের চলে যাওয়ার দিন টিভিতে তাঁকে নিয়ে সংগীতাঙ্গনের কয়েকজন বিশিষ্ট শিল্পীর স্মৃতিচারণ দেখছিলাম। শুভ্রদেব একটা কথা বললেন, ‘সংগীতশিল্পী অনেকের মধ্যে বিভাজন থাকে। এ কারণে একজন অন্যের বিষোদ্গার করে। কিন্তু এন্ড্রু কিশোরের মুখে কখনো কারো নামে একটি কটু শব্দও শোনা যায়নি।’

এন্ড্রু কিশোর ছিলেন প্রচারবিমুখ একজন উঁচুমানের কণ্ঠশিল্পী। নিজেকে মনে করতেন কণ্ঠশ্রমিক। ফোন করলেই রিসিভ করে বলতেন, ‘বল’। ওই বলার মধ্যে একটা সুর খুঁজে পেতাম। বেশি সাক্ষাৎকার দিতে চাইতেন না। তিনি বলতেন, ‘আমি অন্তরালের মানুষ, অন্তরালেই থাকতে দে!’ তারকা অনেক থাকে। সাংবাদিকতার অংশ হিসেবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। কিন্তু এন্ড্রু কিশোর আমাকে চেনেন, এটা ভেবে ভালো লাগত! এ অনুভূতি সব তারকার ক্ষেত্রে হয় না। সামনাসামনি দেখা হলে হাসিমুখে থাকতেন। বেইলি রোডে ডিজিটোন রেকর্ডিং স্টুডিওর নিচে এক রাতে দেখা হয়েছিল ক্ষণিকের জন্য। বহু বছর পর ইস্কাটনের ড্রিমডেস্ক স্টুডিওতে আলম খানের সুরে ‘এবাদত’ ছবিতে গাওয়া ‘তুমি আঁধার থেকে আলোর শহরে’ গানের রেকর্ডিংয়ে ছিলাম।

মৌলিক গান নিয়ে এন্ড্রু কিশোরের প্রথম অ্যালবাম ‘ভুল সবই ভুল’ যেদিন বাজারে আসে, সেদিনই কিনেছিলাম। প্রতিদিনই ঘুরেফিরে ক্যাসেটটি শুনতাম ঘরে। সেইসব দিনের কথা খুব মনে পড়ছে। তাঁর প্রথম অ্যালবাম ‘ফিরে ফিরে আসি’ কিনেছিলাম। এতে নিজের জনপ্রিয় কিছু গান নতুন সংগীতায়োজনে গেয়ে আলোচিত হয়েছিলেন। তিনি গানে গানে কয়েক প্রজন্মের কৈশোর রাঙিয়ে গেছেন। তাই আমরা শ্রোতারা বারবার তাঁর গানের কাছে ফিরে আসি। তাই তিনি শ্রোতা তৈরি করতে পেরেছিলেন। তাঁর গায়কিতে মুগ্ধ হয়ে অনেকে গান শোনা শিখেছে। এদেশের সংগীতানুরাগীদের মোহাবিষ্ট করে রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন গণমানুষের শিল্পী। শুধু স্ত্রী বা সন্তানদের নন, বরং দেশের মানুষের একটা অংশ ছিলেন। আমরা অনেক বড়ো একটা সম্পদ হারালাম।

সবসময় শ্রোতাকে নিজের কণ্ঠ চিনিয়েছেন এন্ড্রু কিশোর। সমসাময়িক গায়কদের মতো প্রচারের আলোয় ছিলেন না। টিভিতে কখনো রাতজাগা লাইভ অনুষ্ঠানে আসেননি। এসবে মোটেও আগ্রহ ছিল না। ক্যামেরার সামনে ছিলেন অনিয়মিত। কেবল ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র মাধ্যমে নিয়মিত টেলিভিশনে পাওয়া যেত তাঁকে। কৈশোরে রেডিওতে তাঁর গান বাজলে কণ্ঠ শুনেই বুঝে ফেলতাম। তখন সেভাবে চেহারায় চিনতাম না তাঁকে। শুধু কণ্ঠ শুনিয়ে আপন হয়ে গেছেন তিনি। গায়কিই তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে।

নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিজের গায়কি অনুকরণ করা এবং নতুন সংগীতায়োজনে গান গাওয়ার খোঁজখবর রাখতেন এন্ড্রু কিশোর। সেজন্যই মৃত্যু আসন্ন জানতে পেরে ২ জুলাই রাতে ফেসবুক পেজে তিনি লিখেছেন, ‘আমি আমার প্রিয় ভক্ত-শ্রোতাদের অনুরোধ করছি, আমার গান ভালোবেসে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। আমার গাওয়া গানকে স্বাভাবিক ও সাবলীল রেখে এবং বিকৃত না করে যত্ন করে রাখবেন।’

এন্ড্রু কিশোরের গান শ্রোতাদের বুকের মধ্যেখানে যতনে থাকবে। তাঁর মহাপ্রস্থান বাংলা সংগীতভুবনের জন্য বিষাদময়। এ ক্ষতি অপূরণীয়। নন-হজকিন লিম্ফোমা নামের ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। জন্মস্থান রাজশাহী থেকেই পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিলেন। এই শহরে সাধারণভাবে বেড়ে উঠে পরবর্তী সময়ে হয়েছেন অসাধারণ গায়ক। ২০১১ সাল থেকে রাজশাহীতে নিয়মিত যেতেন। যার কাছে গান শিখেছেন, তাঁর নামে রাজশাহীতে ‘ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চু স্মৃতি সংসদ’ গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর হৃদয়জুড়ে ছিল এই শহর। নিজের দেশে মরতে চেয়েছেন। দেশপ্রেমিক বলে রাহুল দেব বর্মণের সুরে গান গাওয়ার পর মুম্বাই থেকে যাওয়ার লোভে ভাসেননি। ফিরে এসেছেন বাংলাদেশের শ্রোতাদের কাছে। কিন্তু এবার যেখানে গেলেন, সেখান থেকে ফেরে না কেউ!

২০১৬ সালের ১ নভেম্বর গুলশানে রেডিও আম্বারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের দিন দেখা হতেই বললেন, ‘তুই তো মোটা হয়ে যাচ্ছিস!’ এরপর সেলফি তুললাম। কে জানত তাঁর জীবনের গল্প, গানের মতোই বাকি আছে অল্প! বিভিন্ন চলচ্চিত্রে এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে মৃত্যু নিয়ে অনেক গান শুনেছি। ‘জীবনের গল্প/ আছে বাকি অল্প’, ‘হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’, ‘এই আছি এই নাই’ প্রভৃতি। সবই জনপ্রিয়। প্রেম-ভালোবাসার বাইরেও যে গান তুমুল জনপ্রিয় হতে পারে, তার কালজয়ী উদাহরণ এগুলো।

জীবনের গল্পটা শেষ করে অপার অসীমে পাড়ি জমিয়েছেন বাংলাদেশের সংগীতের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র। গানের মাঝে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকবেন এই ক্ষণজন্মা। তাঁর কণ্ঠ বেজে যাবে শ্রোতার হৃদয়ে। তাঁকে আমরা মিস করতে বাধ্য। এমন কণ্ঠ পৃথিবীতে বারবার পাঠায় না সৃষ্টিকর্তা। দ্বিতীয় এন্ড্রু কিশোর আর পাওয়া হবে না আমাদের। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প ও শ্রোতারা তাঁর কাছে ঋণী থাকবে চিরকাল। তিনি অমর হয়ে থাকবেন।

লেখক: গীতিকার, সাংবাদিক

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত