ধারাবাহিক থ্রিলার

সাইকোপ্যাথ (পর্ব ১১)

পর্ব ১১
সাইকোপ্যাথ (পর্ব ১১)
সাইকোপ্যাথ

আট.

লুসিকে অবশেষে পাওয়া গেল। লুসি কাবেরি, নাককাটা টনির এক্স-গার্লফ্রেন্ড।

সেইরাতে সে আসতে পারেনি, কারণ তার বস লোকটা খুব খেপচুরিয়াস। বস তাকে একঘণ্টা আগেও ছাড়েনি। পুরো সময় কাজ করিয়ে নিয়ে তবেই তার ছুটি। ততক্ষণে বেশ রাত হয়ে গেছে। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট কমে গিয়েছিল।

লুসির সঙ্গে কথা হচ্ছিল ফেডারেশন স্কয়ারের কাছে যে সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল, তার ঠিক উল্টো দিকে একটা ক্যাফে আছে, ‘হট এন কোল্ড মোক্কা’, সেখানেই।

সময়টা বিকেল, বাইরে কনকনে ঠাণ্ডা। উর্বী গায়ে গোটাদুই র্যাপার জড়িয়ে, উলেন মোজা উইদ লেডিস মোকাসিন পায়ে গলিয়ে যাকে বলে ফুল প্যাকেট। অলোকেশও বড্ড শীতকাতুরে। গরমে তিনি কম ঘামেন, কিন্তু শীত এলে তার বারোটা বেজে যায়। তখন তার গোসলে আপত্তি, অথচ শরীর সুস্থ রাখার জন্যে বাথরুম না গেলে নয়।

তোমার প্রবলেমটা বুঝলাম। কিন্তু লুসি, তোমার বসটা কে শুনি? এমন নিষ্ঠুর কেউ হয়! মানুষের কি সুবিধা-অসুবিধা থাকতে পারে না! সখেদে রিনি বলল। ওর রিপোর্টার পরিচয় পেয়ে লুসি একটু নড়েচড়ে বসলো। না জানি বসের নামে উল্টাপাল্টা আবার কী লিখে দেয়।

ডা. কেইন স্টুয়ার্ট আমার বস। তিনি এই শহরের একজন নামি মেডিসিন স্পেশালিস্ট।

হুঁ। আই হার্ড হিজ নেম। রিনি বলল।

লুসি মজা করে তাকে স্টু বলে ডাকে। কখনও চিকেন স্টু, আবার কখনও কোয়ালা-স্টু। লোকটা বেশ রাশভারি, মায়াদয়া বলে কিছু নেই, শুধু কাজ চেনে, কাজ।

হুঁ। এবার বলো লুসি, টনি লোকটা কেমন ছিল?

কেমন আবার! টনি একটা জাত খচ্চর। মুখ বিকৃত করে বলল লুসি কাবেরি।

ছি! এমন করে বলো না লুসি। মুচকি হেসে রিনি বলল। সে তোমার বয়ফ্রেন্ড ছিল!

কে বলল এসব কথা! সব মিছে। ওর সঙ্গে আমার কোনোদিন ভাবই হয়নি। ও একটা জুলুমবাজ, লোফার, জোচ্চোর। আমার সঙ্গে ও চিট করেছে। সখেদে বলল লুসি। বোঝা যায়, টনির প্রতি তার অনেক রাগ।

তুমি কি জানো লুসি, ওর নাককাটা গেছে? এবার বললেন অলোকেশ। একে দিয়ে যত বেশি কথা বলানো যাবে ততই ভালো। টনিকে তাহলে চিনতে সুবিধা হবে। অলোকের কেবলই মনে হয় টনি ইচ্ছে করে স্মৃতিবিভ্রমের ভান ধরেছে। যে ওর নাক কেটেছে, হয়তো সে বুঝেশুনেই কেটেছে। টনি মানুষটা ভালো নয়।

জানবো না কেন, এই নিয়ে পুরো শহরে ঢি ঢি পড়ে গেছে। টনির নাক কেটেছে, বেশ হয়েছে। লুসি বলল।

উর্বী ওর কথা শুনছিল। লুসির বয়স বেশি নয়। খুব জোর পঁচিশ। সে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। এক ব্রিটিশ সাহেব কেরালায় বেড়াতে গিয়ে তার মাকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছিল। কিছুদিন বেশ ছিল। লুসির জন্ম হল। তারপর যা হবার তাই হল। ক্রসকালচারের বিয়ে কি আর টেকে! ওর বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ি হল, দুজনার দুটি পথ দুই দিকে গেলো বেঁকে। মাঝখান থেকে বেচারি লুসি পড়ল বিপদে। ক্যানবেরার এক যাজক তার দায়িত্ব নিলেন। কিন্তু অত বিধি-নিষেধের জীবন ওর ভালো লাগে না। তাই সে একদিন পালিয়ে বাঁচলো।

তারপর, টনিকে তুমি পেলে কীভাবে লুসি? রিনি প্রশ্ন করে।

কীভাবে আবার! ছুঁচোটা একদিন আমাকে তার ঘরদোর ঝাড়পোচ ও দেখাশোনা করার জন্য ডাকলো। ঘণ্টাপ্রতি দশ ডলার। পরপর চারদিন কাজ করলাম, কিন্তু সে তো আর মজুরি দেয় না। টনি পরে বলল, চলো আমরা বন্ধু হই। আমি তোমার দেখভাল করবো। নদীতে আমার মাছধরার ট্রলার আছে। একা তো সব কাজ কুলিয়ে উঠতে পারি না। তুমি থাকলে বেশ হয়। চাইলে তুমি আমার পার্টনারও হতে পারো।

আর অমনি তুমি রাজি হয়ে গেলে? চোখ কপালে তুলে বলল রিনি সেন।

না হয়ে উপায় কী! ওর বন্ধু পিটারও বলল, লেগে পড়ো লুসি। ভালো খেতে-পরতে পাবে। টনির কাঁচা মাছের কারবার। কাঁচা পয়সা। আর যাই হোক, ও তোমাকে না খাইয়ে রাখবে না। সরল মনে বলল লুসি কাবেরি। উর্বী মনে মনে ভাবছে, মেয়েটা দেখতে যতটা সাবালক, বাস্তবে তা নয়। লুসি এক্কেবারে ছেলেমানুষ এখনও।

তারপর কী হলো? সম্পর্কটা ভাঙলো কী করে? উর্বী জানতে চায়। প্রতিবেশী দেশের মেয়ে। ওর খুব মায়া লাগছে লুসির জন্য।

ও একটা মিথ্যুক, বুঝলে! কথা রাখেনি টনি। মাসমাইনে তো দিতোই না, পেটিকোট মানিও না। ও শুধু আমাকে খাটিয়ে মারতো। দিনভর মাছধরার ট্রলারে নিয়ে ঘুরতো। তাতে টনির মেলা কামাই হত, আর আমার বেলায় স্রেফ লবডঙ্কা।

কেস ক্লিয়ার। মাথা নাড়লেন ডিটেকটিভ অলোকেশ। লুসির ইতিহাস এক প্রবঞ্চনার ইতিহাস। পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকেই যা হয়ে এসেছে। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার, দাসপ্রথা, মাত্স্যন্যায় ইত্যাদি। তিনি আরো বললেন, এক্ষেত্রে লুসিকে কিছু দোষ দেয়া যায় না। কাউকে বিশ্বাস করা তো অপরাধ নয়।

কিন্তু হঠাত্ একটা অদ্ভুত কথা বলল রিপোর্টার রিনি সেন। বলল, রাগের বশে তুমিই আবার কাজটা করোনি তো লুসি?

কোন কাজ? কী কাজ করেছি আমি? লুসি রেগেমেগে রিনির দিকে তাকালো। ও আসলে রিনির ইঙ্গিতটা ধরতে পারেনি।

মানে টনির নাক কাটা? ওর প্রতি তোমার অনেক ক্ষোভ জমা আছে জানি। রিনি ধরিয়ে দিলো।

তাতে বিরক্ত হন অলোকেশ। রিনির এ কেমন প্রশ্ন! এমন সহজ সরল একটা মেয়ে কারো নাকে ক্ষুর চালিয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাবে! ইটস জাস্ট ইমপসিবল। হতেই পারে না। তাছাড়া ভুলে গেলে চলবে না, টনির নাকটা খুব শার্প কিছু দিয়ে কাটা হয়েছে। হতে পারে সার্জিক্যাল নাইফ।

লুসির জীবনের করুণ ইতিহাস ওদের সবাইকে আবিষ্ট করেছে। বেচারা লুসি! জন্মের পর থেকেই সে যেনো দুর্ভাগ্যের সঙ্গে লড়ছে। একের পর এক মানুষ ওকে চিট করছে। ব্যবহার করেছে শুধু। ওর মা’টাই বা কেমন! ডিভোর্স হয়ে গেলে নিজের সন্তানকেও বুঝি অস্বীকার করতে হয়! নিষ্ঠুর মা একটা!

(চলবে)

লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত